ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির মুখে ডলারের দরপতন, নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে বিনিয়োগকারীরা
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের হুমকিতে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ায় সোমবার ডলারের মান কমে গেছে। বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যে তারা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে জাপানি ইয়েন এবং সুইস ফ্রাঙ্কের দিকে ঝুঁকেছেন।
ট্রাম্প গত সপ্তাহের শেষে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কিনতে দেওয়ার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত তিনি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড এবং ব্রিটেনের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করবেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান রাষ্ট্রগুলো রোববার গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক আরোপের হুমকিকে 'ব্ল্যাকমেইল' হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এর জবাবে ফ্রান্স এমন কিছু অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করেছে যা আগে কখনো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে, এশীয় বাণিজ্যের শুরুতেই ইউরো এবং পাউন্ড বিক্রির তাৎক্ষণিক হিড়িক পড়ে যায়। এর ফলে ইউরো তার সাত সপ্তাহের সর্বনিম্ন এক দশমিক ১৫৭২ ডলার এবং পাউন্ড এক মাসের সর্বনিম্ন এক দশমিক ৩৩২১ ডলারে নেমে আসে।
তবে, এই দুই মুদ্রা তাদের সর্বনিম্ন অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং লেনদেনের দিনটি শুরু হতেই ডলার চাপের মুখে পড়ে। কারণ বিনিয়োগকারীরা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের সর্বশেষ পদক্ষেপের ফলে ডলারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো মূল্যায়ন করতে শুরু করেন।
এর ফলে ইউরো ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ০.২১ শতাংশ বেড়ে এক দশমিক ১৬২৩ ডলারে লেনদেন হয়। একইভাবে ব্রিটিশ পাউন্ডও ০.১১ শতাংশ ঘুরে দাঁড়িয়ে এক দশমিক ৩৩৯০ ডলারে পৌঁছায়।
এএনজেড-এর এশিয়া রিসার্চ প্রধান খুন গোহ বলেন, 'সাধারণত আপনি ভাববেন যে শুল্কের হুমকির ফলে ইউরো দুর্বল হবে, কিন্তু গত বছরও আমরা যেমনটা দেখেছি—যখন লিবারেশন ডে শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছিল—এফএক্স মার্কেটে এর প্রভাব আসলে ডলারের দুর্বলতার দিকেই বেশি গিয়েছে। যখনই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এমন নীতিগত অনিশ্চয়তা বাড়ে, প্রতিবারই এমনটা ঘটে।'
গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প যখন তথাকথিত 'লিবারেশন ডে' ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, তখন বিনিয়োগকারীরা ডলার বিক্রি শুরু করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়।
সোমবারও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে ডলার ০.৩৬ শতাংশ কমে ০.৭৯৯৩-এ নেমে আসে এবং জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ০.২৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৫৭.৭৪ ইয়েনে। ডলার সূচকও সামান্য কমে ৯৯.১৮-এ নেমে আসে।
খুন গোহ বলেন, 'শুল্ক আরোপের হুমকি ইউরোপের জন্য ক্ষতিকর—এমন যুক্তি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে ডলারের ওপরই। কারণ বাজারে মনে করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রিমিয়াম বেড়ে যাচ্ছে।'
ঝুঁকির মনোভাব পরিমাপের একটি সূচক হিসেবে ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোও বড় ধরনের বিক্রির চাপের মুখে পড়েছে।
বিটকয়েন ৩ শতাংশের বেশি কমে ৯২ হাজার ৪৭৭ দশমিক ৫৪ ডলারে নেমে আসে, আর ইথার প্রায় চার শতাংশ পড়ে গিয়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ২০৩ দশমিক ১৩ ডলারে।
এশিয়ায় সোমবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগের তুলনায় চতুর্থ প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি চার দশমিক পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা বেশি এবং সরকারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তথ্যটি প্রকাশের পর ডলারের বিপরীতে অনশোর (অভ্যন্তরীণ) ইউয়ানের মানে তেমন পরিবর্তন হয়নি এবং তা ছয় দশকি ৯৬৪৭ ডলারে স্থির ছিল; অন্যদিকে অফশোর (আন্তর্জাতিক) ইউয়ান কিছুটা শক্তিশালী হয়ে ছয় দশমিক ৯৬০৮ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
চীনের ইউয়ানের একটি তরল বিকল্প সূচক হিসেবে প্রায়ই ব্যবহৃত অস্ট্রেলিয়ান ডলারও ওই তথ্যের প্রতিক্রিয়ায় তেমন কোনো পরিবর্তন দেখায়নি। সামগ্রিক ঝুঁকি-এড়ানোর প্রবণতার কারণে মুদ্রাটি চাপের মধ্যেই ছিল এবং সর্বশেষ ০.০৯ শতাংশ কমে ০.৬৬৮৫ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ড ডলার ০.২৫ শতাংশ বেড়ে ০.৫৭৬৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
