৫ আরোহী নিয়ে ইরাকে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন অভিযানের মধ্যে ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার বা জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় অন্তত পাঁচজন ক্রু সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে এই দুর্ঘটনার কথা জানায় এবং একই সঙ্গে সেখানে উদ্ধার অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়।
বিমানের আরোহীদের মধ্যে কেউ বেঁচে আছেন কি না বা কতজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড একটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান হারানোর বিষয়ে অবগত আছে।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'অপারেশন এপিক ফিউরি' (ইরানের বিরুদ্ধে পেন্টাগনের পরিচালিত অভিযানের নাম) চলাকালীন বন্ধুপ্রতীম দেশের আকাশসীমায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। বর্তমানে দুর্ঘটনাকবলিত বিমানের ক্রুদের উদ্ধারে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে ক্রুরা আহত হয়েছেন নাকি নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলটি মূলত জনবিরল এবং মরুভূমি প্রধান এলাকা। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর এবং নিখোঁজ সেনাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের পর আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
কেসি-১৩৫ বিমানগুলো সাধারণত মাঝআকাশে অন্য যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। এতে সাধারণত পাইলট, কো-পাইলট এবং বুম অপারেটরসহ ৩ থেকে ৪ জন সদস্য থাকে। তবে বিশেষ মিশনে সদস্য সংখ্যা বেশি হতে পারে। এই বিমানগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর অন্যতম পুরনো মডেলের আকাশযান, যা বোয়িং ৭০৭ প্যাসেঞ্জার জেটের আদলে তৈরি।
এই বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের চলমান অভিযানে সাতজন সেনা সদস্যের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিল। এ ছাড়া সব মিলিয়ে আরও ১৪০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরু হওয়ার পর এটিই মার্কিন বাহিনীর সর্বশেষ বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা। এর আগে গত ১ মার্চ যুদ্ধের প্রথম দিনে কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুল গোলাবর্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। তবে সেই ঘটনায় পাইলটরা নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
এদিকে ইরানে এই সামরিক অভিযানের বিষয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। গত ৯ মার্চ প্রকাশিত কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ ভোটার এই যুদ্ধের বিরোধী। এ ছাড়া, ৭৪ শতাংশ মানুষ ইরানে সরাসরি স্থল সেনা মোতায়েন বা স্থল অভিযানের বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে এমনকি খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। কট্টর রক্ষণশীল ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের মাধ্যমে বিভ্রান্ত হতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টাকার কার্লসন এই যুদ্ধকে 'সম্পূর্ণ জঘন্য ও অশুভ' বলে অভিহিত করেন। এর জবাবে ট্রাম্প কার্লসনের সমালোচনা করে বলেন, 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' (আমেরিকাকে আবার মহান করো-'মাগা') আন্দোলনের আদর্শের সঙ্গে কার্লসনের কোনো মিল নেই। তিনি বলেন, 'মাগা মানেই হলো আগে আমেরিকা (আমেরিকা ফার্স্ট), আর টাকার কার্লসন মোটেও তেমন কেউ নন।'
তবে এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। যুদ্ধের পক্ষে তারা একেক সময় একেক যুক্তি দিচ্ছে। একবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানকে এখনই না থামালে বিশ্ব একটি 'পারমাণবিক যুদ্ধের' মুখে পড়ত। আবার কখনও দাবি করছেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা ফলহীন ছিল। যদিও তার প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আগে জানিয়েছিলেন, একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পথে ছিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি মাসের শুরুর দিকে বলেছিলেন, ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাতে যাচ্ছে—এমন তথ্য আগে থেকেই জানার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। তবে পরে তিনি তার এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন।
যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনা সদস্য ছাড়াও প্রায় ১,৩৪৮ জন ইরানি ও ১৫ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও ১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
