সৌদি আরব থেকে সুদান: আরব বিশ্বে কি সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারবে পাকিস্তান?
মেগা অস্ত্রচুক্তির মানদণ্ডে দেখলে, সুদানের সেনাবাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবিত ১৫০ কোটি ডলারের চুক্তিটি পাকিস্তানের কাছে খুব বড় নয়।
তবে রয়টার্স জানায়, জানুয়ারির শুরুতে চূড়ান্ত হওয়ার কাছাকাছি থাকা এই চুক্তি সুদানে প্রায় তিন বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে চলমান এই সংঘাতে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও লাখ লাখ সুদানি। আরএসএফের বিরুদ্ধে এমনকি ছোট শিশুদের ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ উঠেছে।
এই চুক্তিটি পাকিস্তানের সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নেওয়া একাধিক পদক্ষেপের সর্বশেষ উদাহরণ, যা আরব বিশ্বে দেশটির সামরিক হার্ডওয়্যার ও প্রভাব বিস্তারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তুলে ধরছে।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তান এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশে যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে এবং আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের সামরিক ভূমিকা ঐতিহ্যগতভাবে মূলত আরব মিত্রদের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ধারাবাহিক চুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তান কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সরবরাহকারীতে পরিণত হতে পারে, আবার কিছু সংঘাতে শক্তির সূক্ষ্ম ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করতে পারে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, আরব বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে পাকিস্তানকে অত্যন্ত সতর্কভাবে পথ চলতে হবে। তা না হলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি
আরব বিশ্বে পাকিস্তানের সামরিক প্রভাব বৃদ্ধির এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সৌদি আরবের সঙ্গে গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএমডিএ)। কাতারে ইসরায়েলের বোমা হামলার কয়েক সপ্তাহ পর এই চুক্তি হয়।
ওই হামলার ঘটনা গোটা অঞ্চলে উদ্বেগ তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। কারণ, কাতার, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা গ্যারান্টর যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের প্রধান সমর্থক। কাতারের ওপর হামলা ঠেকাতেও ওয়াশিংটনের ভূমিকা নির্বিকারই ছিল।
এরপর রয়টার্স জানায়, পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানে আগ্রহ প্রকাশ করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবও রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ সৌদি আরবের রয়েছে একটি বড় ও অত্যাধুনিক বিমানবাহিনী, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানে সজ্জিত। দেশটি বর্তমানে অন্তত ৪৮টি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত।
তাহলে জেএফ-১৭ কেনার আগ্রহ কেন রিয়াদের? পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার কমডোর আদিল সুলতান বলেন, পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সৌদি আরব হয়তো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তান সৌদি আরবের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। যদি সৌদি আরব জেএফ-১৭ কেনে, তাহলে দুই দেশের বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং তা উভয়ের জন্যই লাভজনক হবে।"
টেক্সাসভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিশ্লেষক আমির হুসাইনও একমত পোষণ করেন।
তিনি বলেন, "পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে এসএমডিএ (পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি) থাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় একটি মাত্রার অভিন্নতা থাকা খুবই যৌক্তিক।"
হুসাইন আরও বলেন, "সৌদি আরব লিবিয়া, সোমালিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোতে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করছে। জেএফ-১৭ এবং এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে রয়্যাল সৌদি এয়ার ফোর্সের পরিচিতি সেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে।"
জেএফ-১৭-এর প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ যেকারণে
সৌদি আরব ছাড়াও ইরাক জেএফ-১৭ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
জেএফ-১৭ থান্ডার একটি হালকা, সব আবহাওয়ায় কার্যকর, বহুমুখী যুদ্ধবিমান, যা পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স ও চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশনের যৌথভাবে উৎপাদিত।
উৎপাদনকাজের ৫৮ শতাংশ হয় পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ চীনে। বিমানটির কাঠামো তৈরি হয় পাকিস্তানে, আর চীন সরবরাহ করে অ্যাভিওনিকস।
সর্বশেষ সংস্করণ ব্লক-৩ ভ্যারিয়েন্টকে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে আকাশ থেকে আকাশ ও আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার সক্ষমতা, উন্নত অ্যাভিওনিকস, অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এএইসএ বা এসা) রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং দৃষ্টিসীমার বাইরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা রয়েছে।
এসা রাডারের মাধ্যমে জেএফ-১৭ একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও দীর্ঘ দূরত্বে হুমকি চিহ্নিত করতে পারে, যদিও এতে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের মতো স্টেলথ বৈশিষ্ট্য নেই। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, বিমানটির পূর্ণাঙ্গ সংযোজন পাকিস্তানেই হয় এবং পাঞ্জাবের কামরার উৎপাদন লাইনে বছরে ২০ থেকে ২৫টি যুদ্ধবিমান তৈরি করা সম্ভব।
পাকিস্তান কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে জেএফ-১৭ এর বাজার প্রচারণা চালিয়ে আসছে। আজারবাইজান, নাইজেরিয়া ও মিয়ানমার বর্তমানে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তীব্র সামরিক সংঘর্ষের পর বিমানটির প্রতি সম্ভাব্য ক্রেতা দেশগুলোর আগ্রহ আরও বেড়েছে।
ভারতশাসিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ বেসামরিক নাগরিক নিহত হলে পাকিস্তানে হামলার সিদ্ধান্ত নেয় মোদি সরকার। চার দিনের ওই সংঘাতে দুই দেশই একে অপরের ভূখণ্ড ও সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলা চালায়।
৭ মে সংঘর্ষের প্রথম রাতেই পাকিস্তান দাবি করে, তারা চীনে তৈরি জে-১০ 'ভিগোরাস ড্রাগন' যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতের একাধিক বিমান ভূপাতিত করেছে।
সংক্ষিপ্ত অথচ সুদূরপ্রসারী ওই আকাশযুদ্ধে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ৪২টি যুদ্ধবিমানের একটি বহর মোতায়েন করে, যার মধ্যে আরও ছিল জেএফ-১৭ ও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন। বিপরীতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ৭২টি যুদ্ধবিমান আক্রমণে নামে। পাকিস্তানের বিমানগুলো নিজ আকাশসীমায় অবস্থান করেই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে অন্তত ৭টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। শুরুতে ভারত কোনো ক্ষতির কথা অস্বীকার করলেও পরে "কিছু" বিমান হারানোর কথা স্বীকার করে।
এদিকে প্রতিটি জেএফ-১৭ এর দাম তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ডলার। ফলে জেএফ-১৭ দীর্ঘদিন ধরেই ব্যয়-সাশ্রয়ী সমাধান খুঁজছে এমন বিমানবাহিনীগুলোর কাছে আকর্ষণীয় ছিল। এটি পশ্চিমা নির্মাতাদের সমমানের ফাইটার জেটের তুলনায় অনেক সস্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ অভিজ্ঞতা বিমানটির আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে, কারণ বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত সক্ষমতা অনেক সময় দামের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়।
আল জাজিরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে নিশ্চিতকরণ ও বিস্তারিত জানতে আইএসপিআর ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কাছে প্রশ্ন পাঠালেও কোনো জবাব পায়নি।
সৌদি আরব ও ইরাক ছাড়াও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুদানের সঙ্গে আসন্ন চুক্তিতেও জেএফ-১৭ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাকিস্তান লিবিয়ার বিদ্রোহীদের কাছেও এই যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনা করছিল। আরব বিশ্বের বাইরে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়াও জেএফ-১৭ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে।
টানটান ভারসাম্য রেখে চলার কূটনৈতিক বাস্তবতা
তবে সামরিক গ্রাহক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানকে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সুদানে পাকিস্তানের অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান যাবে দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে, যাদের সৌদি আরবও সমর্থন দেয়। অন্যদিকে সুদান অভিযোগ করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে অর্থ ও অস্ত্র দিচ্ছে—যা আমিরাত বারবার অস্বীকার করেছে।
লিবিয়ায় পাকিস্তান গত ডিসেম্বরে বিদ্রোহী নেতা খলিফা হাফতারের সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। হাফতারের বাহিনী দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
পাকিস্তান যাদের অস্ত্র দিতে যাচ্ছে, সেই সুদানের সেনাবাহিনী আগে অভিযোগ করেছে, হাফতার আরএসএফকে সহায়তা করেছেন। এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়েমেনে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, একই ধরনের অস্ত্র ব্যবস্থা পরস্পর বিরোধী পক্ষগুলোর কাছে বিক্রি করা পাকিস্তানের জন্য সহজ হবে না বলে আল জাজিরাকে জানান রিয়াদভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের সহযোগী গবেষক উমর করিম।
করিম বলেন, সৌদি আরব যে জেএফ-১৭-এ আগ্রহ দেখাচ্ছে, সেগুলো সম্ভবত সুদানের সেনাবাহিনীর জন্যও ব্যবহৃত হবে।
তবে পাকিস্তানি প্ল্যাটফর্ম—বিশেষ করে জেএফ-১৭—সুদানের সেনাবাহিনী ও লিবিয়ার বিদ্রোহীদের জন্য অন্য সুবিধাও দেয় বলে মনে করেন সাবেক পিএএফ কর্মকর্তা আদিল সুলতান। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদিত হওয়ায় বিমানটির আলাদা ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, "এই দেশগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী কম সংখ্যক বিমান কিনতে পারে, কিন্তু চীনের শক্তিশালী সমর্থনের কারণে পাকিস্তানকে তারা নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দেখতে পারে।"
পশ্চিমা অস্ত্রের তুলনায় জেএফ-১৭-এর মতো যুদ্ধবিমানগুলো 'বৈশ্বিক দক্ষিণ'-এর সামরিক বাহিনীগুলোর কাছে আকর্ষণীয়, কারণ এগুলো টেকসই, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম, পরিচালনা সহজ এবং দ্রুত কার্যকর করা যায়—বলেন আরেক সাবেক পিএএফ কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের অস্ত্র রপ্তানি
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের বৃহত্তর অস্ত্র রপ্তানি উদ্যোগের চালিকাশক্তি হচ্ছে জেএফ-১৭।
করাচিভিত্তিক ব্রোকারেজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কে-ট্রেডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা রপ্তানির মধ্যে শুধু যুদ্ধবিমান নয়, ট্যাংক, ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌযান ব্যবস্থা ও হালকা অস্ত্রও রয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) জানায়, পাকিস্তান এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক, যার বেশিরভাগই আসে চীন থেকে। বিপরীতে দেশটির বার্ষিক অস্ত্র রপ্তানি ৫ কোটি ডলারেরও কম।
তবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রপ্তানি হঠাৎ করেই ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৪০০ মিলিয়ন (৪০ কোটি) ডলারের বেশি হয়।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি, তবে এই বৃদ্ধির পেছনে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইরত ইউক্রেনকে পাকিস্তানের গোলাবারুদ সরবরাহকে দায়ী করা হয়।
জেএফ-১৭ বিক্রির সম্ভাব্য খবর এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পাকিস্তান অর্থনীতি স্থিতিশীল করা ও কূটনৈতিক গতি ফেরাতে চেষ্টা করছে। ইসলামাবাদ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছে এবং একই সঙ্গে চীন, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার করছে।
বর্তমানে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৭০০ কোটি ডলারের ২৫তম কর্মসূচির আওতায় রয়েছে, যা ৩৭ মাস মেয়াদি। ফলে ইসলামাবাদের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।
সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ইঙ্গিত দেন, অস্ত্র রপ্তানি আইএমএফের কর্মসূচির ওপর নির্ভরতাকে কমাতে পারে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "আমাদের যুদ্ধবিমানগুলো পরীক্ষিত। এত অর্ডার আসছে যে ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের আইএমএফের প্রয়োজন নাও হতে পারে।"
কে-ট্রেডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আজারবাইজানের সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলারের চুক্তি এবং সৌদি আরব, লিবিয়া ও সুদানে সম্ভাব্য বিক্রিসহ বিদ্যমান ও সম্ভাব্য জেএফ-১৭ চুক্তিগুলো থেকে মোট ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার আয় হতে পারে, যা পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম।
তবে উমর করিম এ বিষয়ে সন্দিহান। তিনি বলেন, অতীতে যুদ্ধবিমানটি বাজারজাত করার চেষ্টা বড় চুক্তিতে রূপ নেয়নি।
তিনি বলেন, "হঠাৎ করে, তেমন কোনো জোরালো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছাড়াই, এতগুলো জেএফ-১৭ চুক্তির আলোচনা হওয়াটা কিছুটা অদ্ভুত। এ মুহূর্তে বলা যায়, এগুলো মূলত পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্প ও নিজস্ব অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা তুলে ধরার একটি বয়ান তৈরির অংশ।"
সুলতান মনে করেন, ভারতের সঙ্গে গত বছরের সংঘর্ষ থেকে নেওয়া শিক্ষাই নতুন করে আগ্রহ বাড়িয়েছে—"যেখানে চীন থেকে সংগৃহীত অস্ত্রব্যবস্থা উন্নত পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।"
বহুমুখী অস্ত্রবাজার
পাকিস্তানের অস্ত্র ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা এমন এক সময়ে চলছে, যখন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে এবং বহু দেশ ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে তাদের প্রতিরক্ষা সংগ্রহ কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে।
সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক, যার দখলে ছিল বৈশ্বিক বাজারের ৪৩ শতাংশ। মাত্র ৬ শতাংশ বাজারহিস্যা নিয়ে চীন চতুর্থ অবস্থানে, বেইজিংয়ের রপ্তানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কেনে পাকিস্তান।
নাম না প্রকাশের শর্তে কথা বলা পাকিস্তান বিমানবাহিনীর (পিএএফ) সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, জেএফ-১৭ বিক্রিকে ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং কৌশলগত বৈচিত্র্য হিসেবে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, "এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন—যেখানে সক্ষমতা, যুদ্ধক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা, ব্যয় ও সার্বভৌমত্ব পুরোনো জোটের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আমির হুসাইনও একমত। তিনি বলেন, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে না।"জেএফ-১৭ একটি অসাধারণ বিমান, এবং অনেক বিমানবাহিনীর বহরে উভয় ধরনের প্ল্যাটফর্মের জন্যই জায়গা আছে," বলেন তিনি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ভূরাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য এশিয়া গ্রুপের অংশীদার উজাইর ইউনুসও বলেন, এই বৈচিত্র্য আনার পেছনে বড় কারণ হলো পশ্চিমা প্রতিরক্ষা সরবরাহ চেইন আগামী দিনে চাপে থাকবে—এমন উপলব্ধি।
তিনি বলেন, "অন্তত যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ওয়াশিংটন এসব উন্নয়নকে নেতিবাচকভাবে দেখবে বলে আমি মনে করি না। সৌদি আরবের মতো দেশগুলো পশ্চিম থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনবে, আর জেএফ-১৭-এর মতো প্ল্যাটফর্ম তাদের সেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনে সক্ষমতা বাড়াবে—যা যুক্তরাষ্ট্র নিজেও চায়।"
