ট্রাম্পকে হস্তক্ষেপের অজুহাত পাইয়ে দিতেই বিক্ষোভকারীরা ‘সহিংস' হয়ে ওঠে: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেশটির ওপর সামরিক হস্তক্ষেপ করার একটি 'অজুহাত তৈরি করে দিতেই' দেশব্যাপী বিক্ষোভগুলো 'সহিংস ও রক্তাক্ত' রূপ নিয়েছে।
সোমবার তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের আরাগচি বলেন যে, সপ্তাহান্তে সহিংসতার মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করলেও 'পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে'।
আরাগচি বলেন, বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার যে হুঁশিয়ারি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা মূলত 'সন্ত্রাসীদের' বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে উৎসাহিত করেছে, যাতে তারা বিদেশি হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে। তিনি আরও বলেন, 'আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, আবার আলোচনার জন্যও প্রস্তুত।'
আরাগচি আরও বলেন, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণের ভিডিও ফুটেজ ইরানের কাছে রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ শীঘ্রই আটককৃতদের স্বীকারোক্তি প্রকাশ করবে।
তার ভাষ্য, এই বিক্ষোভগুলো বিদেশি শক্তির মাধ্যমে 'উস্কে দেওয়া ও ইন্ধন দেওয়া' হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী এর জন্য দায়ীদের 'খুঁজে বের করবে'।
দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির মধ্যে ইরানে চলমান বিক্ষোভ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে।
বিক্ষোভে নিহতদের 'শহীদ' আখ্যা দিয়ে—যাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন—তাদের স্মরণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ইরানের সরকার।
আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থা রোববার জানিয়েছে, বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ১০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কতজন বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন সেই সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি, তবে দেশের বাইরে অবস্থানরত বিরোধী কর্মীরা বলছেন, নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং এর মধ্যে শত শত বিক্ষোভকারী রয়েছেন।
আল জাজিরা স্বাধীনভাবে কোনো পক্ষের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
প্রাথমিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষোভ থেকে শুরু হলেও, এই বিক্ষোভগুলো এখন দেশব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং এটি ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা সরকারের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, রোববার রাতে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় সীমিত আকারে বিক্ষোভ হয়েছে।
ফার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের নবাব ও সাদাত আবাদ এলাকা, চাহারমহল ও বখতিয়ারি প্রদেশের জুনকান ও হাফশেজান এবং মাশহাদের তায়বাদে সীমিত পরিসরে 'দাঙ্গা' হয়েছিল, যা নিরাপত্তা বাহিনী ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
সংস্থাটি জানিয়েছে যে, গত রাতে দেশের অন্যান্য শহর ও অঞ্চলগুলো সাধারণত শান্ত ছিল এবং কোথাও 'দাঙ্গার খবর পাওয়া যায়নি।
সোমবার ইরানি গণমাধ্যমগুলো তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে বিভিন্ন শহরে সরকারপন্থি সমাবেশের ভিডিও প্রকাশ করে। এসবের মধ্যে তেহরানের একটি বিশাল সমাবেশে হাজারো মানুষকে অংশ নিতে দেখা যায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমগুলো তেহরানের ওই সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতির ভিডিওও প্রচার করেছে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির শেয়ার করা ফুটেজে প্রেসিডেন্টকে পতাকাবাহী নাগরিকদের সাথে মিছিলে হাঁটতে এবং তাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা গেছে।
এদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাজধানীতে সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় পরিস্থিতির বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপকে 'সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' বলে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, ইরান একটি 'চতুর্মুখী যুদ্ধের' বিরুদ্ধে লড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে 'সামরিক যুদ্ধ' এবং 'বর্তমানে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'।
জাতীয় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট
বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরান জুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা এখনও বন্ধ রয়েছে এবং তারা এই পরিস্থিতিকে একটি 'জাতীয় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নেটব্লকসের তথ্যমতে, দেশটিতে সর্বশেষ স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ থাকার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তবে তারা উল্লেখ করেছে, কিছু ইরানি এই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় বের করতে পেরেছেন।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিক্ষোভের ভিডিও আসার পরিমাণ কমে গেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শুক্রবার সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, এটি 'বিক্ষোভকারীদের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন' আড়াল করার একটি উপায়।
আরাগচি জানিয়েছেন, শীঘ্রই ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরুদ্ধার করা হবে এবং এ বিষয়ে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করছে। তিনি আরও জানান, দূতাবাস এবং সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোতেও সংযোগ পুনরায় স্থাপন করা হবে।
কাতারস্থ জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ইরান বিশ্লেষক মেহরান কামরাভা আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের নেতৃত্ব বিশ্বকে দেখাতে চায় যে দেশের পরিস্থিতি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে; আর ঠিক সেই কারণেই ইন্টারনেট পুনরায় চালু করা হচ্ছে।
মেহরান কামরাভা আরও বলেন, আরাগচি 'নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে চান না', তবে আমরা দেখছি যে এই বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতা বন্ধ করতে ইরান একটি 'বহুমুখী কৌশল' গ্রহণ করেছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার তৌহিদ আসাদি জানিয়েছেন যে, আরাগচির এসব মন্তব্য 'ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে আমরা যে ধরনের বক্তব্য শুনে আসছি, তারই অংশ'।
তিনি বলেন, 'মূলত, এই বিশেষ বক্তব্যের ক্ষেত্রে আমাদের তিনটি উপাদানের কথা মাথায় রাখতে হবে।'
আসাদি বলেন, প্রথমত, ইরানি কর্মকর্তারা এই মত প্রকাশ করে আসছেন যে—জনগণ যেসব অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে 'শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার অধিকার' তাদের রয়েছে বলে তারা স্বীকার করেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি বলেন, তারা (কর্মকর্তারা) বলছেন, দেশটিতে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের কিছু অংশ 'সহিংসতায় রূপ নিয়েছে', যার ফলে মৃত্যুর ঘটনা, আহত ও গ্রেপ্তার হয়েছে, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যু বিশেষভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
আল জাজিরার প্রতিনিধি বলেন, তৃতীয় উপাদানটি যা পরিস্থিতিকে 'আরও বেশি জটিল' করে তুলেছে তা হলো—'বিদেশি হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ'।
আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু বিকল্প খতিয়ে দেখছি
নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন সত্ত্বেও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায়, ট্রাম্প রোববার বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপসহ 'শক্তিশালী বিকল্পগুলো' বিবেচনা করছে।
এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। সামরিক বাহিনী এটি খতিয়ে দেখছে এবং আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু বিকল্প বিবেচনা করছি। আমরা একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।" তিনি আরও বলেন, তার সামরিক পদক্ষেপের হুমকির পর ইরানের নেতারা 'আলোচনা করার' আহ্বান জানিয়েছেন এবং একটি 'বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে'।
এর আগে রোববার পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে 'ভুল হিসাব' না করার জন্য সতর্ক করেছিলেন।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার গালিবাফ বলেন, 'আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করা যাক, ইরানে হামলা হলে অধিকৃত অঞ্চলগুলো [ইসরায়েল] এবং সেই সাথে সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজ হবে আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু।'
গত বছর ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান একটি ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। জুনে ইসরায়েলের হামলার পর ওয়াশিংটন ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়।
এই যুদ্ধে শত শত বেসামরিক মানুষ, সামরিক কমান্ডার ও বিজ্ঞানী নিহত হন। তেহরান এর জবাবে ইসরায়েলে শত শত ব্যালেস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে, যার ফলে ২৮ জন নিহত হন।
বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অর্থনীতির জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে 'উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা' এবং 'দাঙ্গা' পরিচালনার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। তিনি ইরানিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, 'দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীদের' কাছ থেকে দূরে থাকতে।
১২ দিনের যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শাসনের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন একটি মসজিদসহ বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নিহতদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দৃশ্য সম্প্রচার করা হয়েছে।
