ইংল্যান্ডের রাস্তায় ঘোরা সেই ‘নেকড়ে-কুকুরের’ ডিএনএ রহস্যের সমাধান
হ্যালোউইনের ঠিক আগের দিন ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের রাস্তায় তিনটি বিশাল আকারের নেকড়ে সদৃশ কুকুরকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। দেখতে নেকড়ের মতো হওয়ায় এগুলো মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। শেষমেশ একটি উদ্ধারকারী কেন্দ্র ডিএনএ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছে যে, এগুলো আসলে 'উলফ-ডগ' বা নেকড়ে-কুকুর সংকর।
২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর প্রিস্টন শহরে কুকুরগুলোকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রিস্টন সিটি কাউন্সিল প্রথমে বলেছিল এগুলো জার্মান শেফার্ড জাতের কুকুর।
লিটল টিমি, বু এবং ব্রুক নামের এই তিন ভাই-বোনকে প্রথমে একটি উদ্ধারকারী কেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে তাদের 'উলভস অফ উইল্টশায়ার' নামের বিশেষায়িত কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানেই বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন যে তারা আসলে নেকড়ে-কুকুর প্রজাতির।
ওই চ্যারিটির ট্রাস্টি ওলি ব্যারিংটন জানান, উদ্ধারের সময় কুকুরগুলো খুব রুগ্ন ছিল। তবে এখন তারা 'নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশে সেরে উঠছে'।
কাউন্সিল জানায়, তাদের ক্যানেল ঠিকাদার বলেছিল এগুলো 'জার্মান শেফার্ড টাইপ'। কাউন্সিলের এক মুখপাত্র বলেন, কুকুরগুলো অল্প সময়ের জন্য তাদের জিম্মায় ছিল। তিনি আরও বলেন, 'আমরা ডিএনএ পরীক্ষা করি না, তাই তখন যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল তার ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে।'
টিকটকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় এই কুকুরগুলোর ভিডিও এবং ডিএনএ টেস্টের ফলাফল দেখেছেন লাখ লাখ মানুষ।
ব্যারিংটন বলেন, উলভস অফ উইল্টশায়ারে তাদের মূল লক্ষ্য 'প্রাণীদের কল্যাণ ও সুখ'। এদের পুনর্বাসন করে পোষা প্রাণী হিসেবে গড়ে তোলার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, 'ওরা এখানে যেমন খুশি তেমন থাকবে। যদি মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলতে চায়, তবে তা-ই হবে।'
উলফ-ডগ আসলে কী?
উলফ-ডগ বা নেকড়ে-কুকুর হলো গৃহপালিত কুকুর ও নেকড়ের শংকর। পিডিএসএ-এর তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যে মূল নেকড়ে থেকে তিন প্রজন্ম পার হলে এমন কুকুর পোষা বৈধ। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের হলে বিশেষ লাইসেন্স লাগে এবং এদের 'এক্সোটিক' বা বন্য প্রাণী হিসেবে ধরা হয়।
ব্যারিংটন জানান, উলভস অফ উইল্টশায়ারের কাছে বিশেষ লাইসেন্স আছে যা দিয়ে তারা এসব প্রাণীর যত্ন নিতে পারে। কারণ এগুলো 'অজানা প্রজাতির ছিল এবং বিপজ্জনক প্রাণীর লাইসেন্সের প্রয়োজন হতে পারত'।
'এমবার্ক' কোম্পানির করা ডিএনএ টেস্টে দেখা গেছে, টিমি, ব্রুক ও বু-এর শরীরে ৪৯.১ শতাংশ ধূসর নেকড়ে বা গ্রে উলফ এবং ৫০.৯ শতাংশ চেকোস্লোভাকিয়ান উলচাকের জিন রয়েছে। এই পরীক্ষাটি করিয়েছিল '৮ বিলো হাস্কি রেসকিউ' নামের কেন্দ্র, যারা প্রথমে প্রাণীগুলোকে কাউন্সিলের কাছ থেকে নিয়েছিল।
ব্যারিংটন মনে করেন, আইনটিতে 'একটু সমস্যা' আছে। কারণ এখানে নেকড়ের ডিএনএ-এর শতাংশের চেয়ে কত প্রজন্ম পার হয়েছে, তা দেখা হয়। এর সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্রিডার বেশি নেকড়ে ডিএনএ সম্পন্ন প্রাণী তৈরি করছে, যা 'কাগজে-কলমে বৈধ'।
তিনি বলেন, 'এমন শংকর প্রাণী পোষার মতো উপযুক্ত পরিবেশ খুব কম মানুষেরই আছে। এর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয়।'
আরএসপিসিএ-এর এক মুখপাত্র বলেন, 'এরা বিশাল এবং সামলানো বেশ কঠিন। এদের জন্য এমন অভিজ্ঞ লোকের দরকার, যারা শুধু কুকুর নয়, নেকড়ে নিয়েও কাজ করেছেন এবং তাদের চাহিদা বোঝেন।'
তারা আরও জানায়, এগুলো পরিবারের পোষা প্রাণী হিসেবে উপযুক্ত নয়। মানুষের উচিত উলফ-ডগ হাইব্রিড পোষার আইনি জটিলতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
তবে উলফ-ডগ কমিউনিটির অনেকেই মনে করেন, তারা এদের সঠিক যত্ন নিতে সক্ষম। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের লরা ম্যাকেঞ্জি-হকিন্সের চারটি উলফ-ডগ এবং একটি বেলজিয়ান ম্যালিনয়েস আছে। তিনি এগুলো একটি ফ্ল্যাটে থাকা তরুণ দম্পতির কাছ থেকে উদ্ধার করেছিলেন।
লরা জানান, তিনি আগেভাগে অবসর নিয়েছেন এবং 'দিনরাত ২৪ ঘণ্টা' কুকুরগুলোর সঙ্গে থাকেন। এদের জন্য বড় বাগান ও ৬ ফুট উঁচু (১.৮২ মিটার) বেড়া দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, 'যেকোনো কুকুরের মতো এদেরও নিরাপদে রাখা মালিকের দায়িত্ব। প্রিস্টনের ওই তিনটির মতো এদের দেখতে নেকড়ের মতো হওয়ায় বাইরে ঘুরতে দেখলে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়।'
তিনি জানান, এই প্রাণীগুলো যাতে নিরাপদ আশ্রয় পায়, সে জন্য মানুষকে সচেতন করতে তারা অনেক সময় ব্যয় করেন। 'এদের পালা মোটেও সহজ নয়,' যোগ করেন তিনি।
