গত ৫০ বছরে ইরানে যত বিক্ষোভ; এক নজরে দেশটির আন্দোলনের ইতিহাস
গত ৫০ বছরে ধারাবাহিক নানা বিক্ষোভে বারবার কেঁপে উঠেছে ইরান। ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এসব বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানে শিক্ষার্থী, তেলশ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নামেন। এসব আন্দোলনের চাপেই তৎকালীন স্বৈরশাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি, যিনি সেসময় মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন, দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লব সফল হয় এবং তার সর্বময় কর্তৃত্বে একটি কঠোর শিয়া ধর্মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সরকার হাজারো মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের রক্তক্ষয় এবং কঠোর দমননীতির কারণে দীর্ঘদিন বড় ধরনের বিক্ষোভ থেমে যায়।
১৯৯৯ সালের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
১৯৯৯ সালে 'চেইন মার্ডার' নামে পরিচিত একাধিক হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযান আরও বড় আকারের আন্দোলনের জন্ম দেয়। এসব বিক্ষোভে অন্তত তিনজন নিহত হন এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে আটক করা হয়।
২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট
২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে সংস্কারপন্থী বিরোধীরা। পরবর্তী কয়েক মাসে দেশজুড়ে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন, যা 'গ্রিন মুভমেন্ট' নামে পরিচিতি পায়। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন অভিযানে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন এবং হাজারো বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হন।
২০১৭-২০১৮ সালের বিক্ষোভ
২০১৭-১৮ সালে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তা কমানোর সরকারি পরিকল্পনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। মাশহাদ শহর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এতে ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং শতাধিক বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হন।
২০১৯ সালের পেট্রোল বিক্ষোভ
২০১৯ সালে ভর্তুকিপ্রাপ্ত পেট্রোলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় ইরান সরকার। এর জেরে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, সেসময় বিক্ষোভকারীরা পেট্রোলপাম্প, ব্যাংক ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং সরকার সাময়িকভাবে দেশটির ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়।
২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদ
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। হিজাব সঠিকভাবে না পরার অভিযোগে নৈতিকতা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাহসার মৃত্যু হয়।
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা মাহসার মৃত্যুর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে 'শারীরিক সহিংসতা'র অভিযোগ তোলে। কয়েক মাসব্যাপী নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং ২২ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। এরপরও আজ পর্যন্ত দেশটির অনেক নারী হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।
২০২৪-২০২৫ সালের রিয়াল বিক্ষোভ
২০২৪-২৫ সালে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়। এর প্রভাবে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের ভয়াবহ দরপতন ঘটে এবং এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর দাঁড়ায় ১৪ লাখ। এই পরিস্থিতির পরপরই দেশজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়।
