মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভে ইরানে নিহত অন্তত ১৬: অধিকার গোষ্ঠী
ইরানে এক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছে বলে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো রবিবার জানিয়েছে। আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ক্রমেই বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সপ্তাহজুড়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো নিহত ও গ্রেপ্তারের তথ্য দিলেও, উভয় পক্ষের পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা গেছে। রয়টার্স এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
গত তিন বছরের মধ্যে এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ বলে মনে করা হচ্ছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে এমন এক নাজুক সময়ে এই আন্দোলন শুরু হওয়ায়, আগের বিক্ষোভগুলোর তুলনায় এবার দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা নমনীয় সুর লক্ষ্য করা গেছে।
দেশটির সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, ইরান শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবে না
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত মন্তব্যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিক্ষোভকারীদের প্রতি 'দয়ালু ও দায়িত্বশীল' দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'জোরপূর্বক কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাজকে শান্ত বা আশ্বস্ত করা সম্ভব নয়।'
ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সমঝোতামূলক ভাষা। চলতি সপ্তাহে তারা অর্থনৈতিক কষ্টের বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং সংলাপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এর মধ্যেও রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীরা সহিংসতার শিকার হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট না করে তিনি বলেন, 'আমরা প্রস্তুত আছি।'
এই বক্তব্যের পর ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ওপর পাল্টা আঘাতের হুমকি দেন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেন, ইরান 'শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবে না'।
কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা 'হেনগাও' জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার কর্মীদের নেটওয়ার্ক 'এইচআরএএনএ' জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৬ এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৮২ জনকে।
ইরানের পুলিশপ্রধান আহমদ-রেজা রাদান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী গত দুই দিন ধরে বিক্ষোভের নেতাদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, 'ভার্চুয়াল জগতের বিপুলসংখ্যক নেতাকে আটক করা হয়েছে।'
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানী তেহরানেই জনমত বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে বিক্ষোভ নিয়ে 'ভুয়া পোস্ট' দেওয়ার অভিযোগে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে তেহরানসহ মধ্যাঞ্চল এবং দক্ষিণের বেলুচিস্তান প্রদেশেও বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার গভীর রাতে রক্ষণশীল ধর্মীয় কেন্দ্র কোম-এর গভর্নর জানান, সেখানে বিক্ষোভে দুইজন নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, নিহতদের একজনের নিজের তৈরি বিস্ফোরক যন্ত্র অকালে বিস্ফোরিত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
এইচআরএএনএ এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, বিক্ষোভের ডাক দেওয়া অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলোর অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদেরও আটক করেছে কর্তৃপক্ষ।
মুদ্রার মানের প্রায় অর্ধেক পতন
এক সপ্তাহ আগে বাজারের ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা ইরানে এই বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রাদেশিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিক্ষোভে কিছু অংশগ্রহণকারী ইরানের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
মার্চে নতুন অর্থবছর শুরুর পর থেকে ইরানে মুদ্রাস্ফীতি ৩৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের মান প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে সরকার সারা বছর দেশজুড়ে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ব আর্থিক সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
শনিবার খামেনি বলেন, কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলবে। তবে তিনি যোগ করেন, 'দাঙ্গাবাজদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে।'
রবিবার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদরেজা আরেফ বলেন, দেশ যে কিছু ত্রুটির সম্মুখীন হচ্ছে, তা সরকার স্বীকার করে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, কিছু মানুষ এই বিক্ষোভকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে আরেফ বলেন, 'আমরা আশা করি, যুবসমাজ শত্রুদের ফাঁদে পা দেবে না।'
