মুদ্রার রেকর্ড দরপতনে গণবিক্ষোভ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ ইরানের
ইরানের মুদ্রার মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বুধবার ইরান সরকার নতুন একজনকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মন্ত্রিসভা সাবেক অর্থমন্ত্রী আবদুল নাসের হেমতিকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান-এর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
হেমতি স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন মোহাম্মদ রেজা ফারজিনের। রেজা ফারজিন গত সোমবার পদত্যাগ করেন। ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রতিবাদে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ শুরু হওয়ার ঠিক একদিন পরেই ফারজিন পদত্যাগ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৪০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির হার জনমনে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সালে যখন ফারজিন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন মার্কিন ডলার প্রতি রিয়ালের মান ছিল চার লাখ ৩০ হাজার। গত বুধবার এ মান এক দশমিক ৩৮ মিলিয়নে (১৩ লাখ ৮০ হাজার) গিয়ে ঠেকেছে। গত রোববার অনেক ব্যবসায়ী ও দোকানদার তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন এবং প্রতিবাদ জানাতে তেহরানসহ অন্যান্য শহরের রাস্তায় নেমে আসেন।
গভর্নর হেমতির কার্যসূচির মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রা শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনা দূর করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ এক পোস্টে এই তথ্য জানিয়েছেন।
৬৮ বছর বয়সী হেমতি এর আগে পেজেশকিয়ানের অধীনে অর্থনীতি ও অর্থ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত মার্চ মাসে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এবং তার নীতিমালার কারণে শক্তিশালী মুদ্রার বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগে সংসদ তাকে বরখাস্ত করেছিল।
মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপের সমন্বয়ে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এটি সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আগে থেকেই চাপের মুখে ছিল।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জ্বালানি তেলের দামে পরিবর্তনের ফলে মুদ্রাস্ফীতি আরও খারাপ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মিজান অনলাইন সংবাদ সংস্থার তথ্যমতে, প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ বুধবার বলেছেন, 'অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে চলা বিক্ষোভকে নিরাপত্তাহীনতায় রূপ দেওয়ার কোনো চেষ্টা, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা বা বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হলে তা কঠোর প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হবে।'
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময় ইরানের মুদ্রার মান ছিল প্রতি ডলারের বিপরীতে ৩২ হাজার রিয়াল; ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে পড়ে।
মিজান অনলাইন জানিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ ইরানের একজন স্থানীয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা হামিদ ওস্তেভার বিক্ষোভের সময় এক যুবক নিহত হওয়ার খবর অস্বীকার করেছেন।
দক্ষিণ ইরানের ফাসা শহরের বিচার বিভাগের প্রধান ওস্তেভার বলেন, বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের কার্যালয়ে ঢুকে পড়লে এবং তিনজন পুলিশ সদস্যকে আহত করলে বিক্ষোভটি সহিংসতায় রূপ নেয়। তিনি জানান, এই ঘটনায় চারজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বুধবার জানিয়েছেন, তেহরানের প্রধান বাজারগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ ইরানের শিরাজ এবং পশ্চিমের শহর কেরমানশাহের ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন।
