মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে আমাকে অভিশংসিত হতে হবে: রিপাবলিকানদের ট্রাম্প
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে দল যদি প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে অভিশংসনের মুখে পড়তে হবে বলে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আজ বুধবার ওয়াশিংটন ডিসিতে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের এক সমাবেশে এসব কথা বলেন ট্রাম্প। প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য । তাই ট্রাম্প আইনপ্রণেতাদের প্রতি এই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
সমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, 'আপনাদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিততেই হবে। কারণ, আমরা যদি জিততে না পারি, তাহলে পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে। ওরা (ডেমোক্র্যাটরা) আমাকে অভিশংসিত করার কোনো না কোনো কারণ খুঁজে বের করবেই।'
এরপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, 'আমি অভিশংসিত হব।'
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে 'রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ গ্রহণ কিংবা বড় ধরনের অপরাধ ও অসদাচরণ'-এর জন্য প্রেসিডেন্ট বা অন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অভিশংসন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে প্রতিনিধি পরিষদকে।
প্রতিনিধি পরিষদে কেউ অভিশংসিত হলে এরপর সিনেটে তার বিচার হয়। সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে দোষী সাব্যস্ত হলে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়।
আগামী নভেম্বরে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ৩৩টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে নির্ধারিত নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে সিনেটররা নির্বাচিত হন গোটা রাজ্যজুড়ে হওয়া ভোটের মাধ্যমে।
নির্বাচনে সুবিধা পেতে রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যগুলোতে কংগ্রেসনাল নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে নির্ধারণের জন্য চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প।
এই কৌশলটি রাজনীতিতে 'জেরিম্যান্ডারিং' নামে পরিচিত, যা নিজের দলের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমানা ঠিক করাকে বোঝায়। সমালোচকরা এই পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক বলে অভিহিত করে থাকেন।
ইতোমধ্যে টেক্সাস, মিসৌরি ও নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের সুবিধা দিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শেষ হয়েছে। এর জবাবে ডেমোক্র্যাটরাও বসে নেই। ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটের মাধ্যমে গণরায়ের ভিত্তিতে তারাও নিজেদের সুবিধামতো জেরিম্যান্ডারিংয়ের অনুমোদন করিয়ে নিয়েছে।
বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, বর্তমানে ট্রাম্পে র গ্রহণযোগ্যতার হার ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে। এই জনপ্রিয়তা নিয়েই তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাঠে নামছেন।
তবে নির্বাচনের আগে দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতার আভাস মিলছে। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানটিও দেশে খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। এই অসন্তোষকে পুঁজি করে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এত কিছুর পরও গত মঙ্গলবার ট্রাম্পকে বেশ আশাবাদী দেখা গেছে। তিনি বলেন, 'আমরা ইতিহাস গড়ব এবং এক মহাকাব্যিক জয় পেয়ে সব রেকর্ড ভেঙে দেব।'
তবে রিপাবলিকানদের প্রতি জনগণের সমর্থন আরও বেশি কেন নয়, তা নিয়ে নিজের বিস্ময় ও হতাশা গোপন করেননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, 'জনগণের মনে কী চলছে, তা যদি কেউ আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারতেন! আমাদের নীতিগুলো সঠিক, কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের নীতিগুলো জঘন্য। তারপরও ওরা ঐক্যবদ্ধ, ওরা সহিংস এবং বিদ্বেষপরায়ণ।'
গত এক বছর ধরে কিছু ডেমোক্র্যাট নেতা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অসদাচরণের অভিযোগ এনে তাকে অভিশংসনের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিশেষ করে গত জুনে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই ইরানে সামরিক হামলার ঘটনাকে সামনে আনা হচ্ছে। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যালঘু হওয়ায় কোনো প্রস্তাবই আলোর মুখ দেখেনি।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে দুইবার অভিশংসিত হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তখন অভিযোগ ছিল, তিনি ইউক্রেনকে দেওয়া মার্কিন সহায়তা আটকে রেখে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে চাপ দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়বার ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় তাকে আবারও অভিশংসন করা হয়। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নিয়ে সমর্থকদের উসকে দেওয়া ও বিদ্রোহে প্ররোচনার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
তবে দুইবারই সিনেটে খালাস পান ট্রাম্প। ২০২১ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর ৫৭ জন সিনেটর তাকে দোষী সাব্যস্ত করলেও দুই-তৃতীয়াংশ (৬৭ ভোট) সমর্থন না পাওয়ায় তিনি বেঁচে যান। ওই সময় দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারাতেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে সিনেট ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়নি। ১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জেরে অভিশংসন ভোটের আগেই পদত্যাগ করেছিলেন রিচার্ড নিক্সন।
এ ছাড়া ১৯৯৮ সালে হোয়াইট হাউসের ইন্টার্নের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ায় বিল ক্লিনটন অভিশংসিত হলেও সিনেটে খালাস পেয়েছিলেন।
