দক্ষিণ ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান, সেনা সংকটে কোণঠাসা কিয়েভ বাহিনী
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে রুশ বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের মুখে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী। পর্যাপ্ত রসদ ও জনবলের অভাবে সেখানে অবস্থানরত ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলো রুশ ব্রিগেডের তুলনায় সংখ্যার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে ওই অঞ্চলে কয়েকশ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে রুশ সেনারা।
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ জাপোরিঝঝিয়ার বিস্তীর্ণ গ্রামীন এলাকায় রুশ বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। গত বুধবার ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ-এর একজন কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানান, জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত 'উত্তেজনাপূর্ণ'।
'বানকির' ছদ্মনামধারী ওই কর্মকর্তা বলেন, 'শত্রুপক্ষ আরও এলাকা দখল করার মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।' তিনি আরও জানান, রুশরা ছোট ছোট পদাতিক দল ব্যবহার করে যেকোনো উপায়ে বা যেকোনো পথে ইউক্রেনীয়দের সবচেয়ে দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যুহগুলো ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হুলিয়াইপোলে শহরটি। আঞ্চলিক রাজধানী জাপোরিঝঝিয়া থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই শহরটিতে যুদ্ধের আগে প্রায় ৭ লাখ মানুষের বসবাস ছিল।
গত রোববার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক বৈঠকে এই অঞ্চলের রুশ কমান্ডার কর্নেল জেনারেল আন্দ্রেই ইভানায়েভ দাবি করেছেন, শহরটি তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ইভানায়েভ পুতিনকে জানান, ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে দিনিপ্রোপেত্রভস্ক এবং জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে তার বাহিনী ২১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে। এটি ক্রেমলিনের সেই লক্ষ্যকেই সমর্থন করছে যে, রাশিয়া শেষ পর্যন্ত পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল পুরোপুরি দখল করতে চায়।
তবে ইউক্রেনীয় যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা 'ডিপস্টেট' গত সোমবার জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় সেনারা এখনো হুলিয়াইপোলের কিছু অংশ ধরে রেখেছে। তবে শহরটি এখন একটি 'গ্রে জোন' বা অনির্ধারিত এলাকায় পরিণত হয়েছে, যেখানে রুশদের জনবল ইউক্রেনীয়দের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ডিপস্টেট আরও জানায়, শহরটি নিচু এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় সেখানে পুনরায় শক্তি বৃদ্ধি করা ইউক্রেনীয়দের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
যেসব এলাকায় পদাতিক সেনার অভাব রয়েছে, সেখানে ইউক্রেনীয়রা ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে। বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে রুশ সেনাদের ঠেকাতে ড্রোন কার্যকর হলেও পরিত্যক্ত ভবন ও বেজমেন্ট রয়েছে এমন জনবহুল এলাকায় রুশ সেনারা সহজেই আড়াল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, রুশ বাহিনী হুলিয়াইপোলে একটি ইউক্রেনীয় কমান্ড পোস্ট দখল করে নিয়েছে এবং সেখান থেকে ফেলে যাওয়া ল্যাপটপ ও ফাইল পরীক্ষা করছে।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ডার ওলেক্সান্দর সিরস্কি 'দুর্বল প্রতিরক্ষার' কারণে ওই কমান্ড পোস্টটি হাতছাড়া হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। সিরস্কি বলেন, 'একটি আঞ্চলিক ব্রিগেড যুদ্ধের সময় শত্রুর চাপ সহ্য করতে পারেনি এবং ধীরে ধীরে পিছু হটেছে।' তবে গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য ফেলে আসার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নের সমালোচনা করেন।
অন্য একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থা 'কনফ্লিক্ট ইন্টেলিজেন্স টিম' জানিয়েছে, 'ইউক্রেনীয় বাহিনী সম্ভবত এখন কেবল হুলিয়াইপোলের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছে। এই পরিস্থিতিতে শহরটি কার্যত পোখরভস্কের মতোই রুশদের দখলে চলে গেছে বলা যায়।' সংস্থাটি আরও যোগ করেছে, 'এই সেনারা দীর্ঘকাল ধরে তাদের অবস্থান ধরে রেখেছিল এবং গত কয়েক মাসে চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে, অথচ বিশ্রামের জন্য তাদের সরানো হয়নি।'
হুলিয়াইপোলে যা ঘটেছে, তা ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর মূল সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্রন্ট লাইনের অনেক জায়গায় ইউক্রেনীয়রা সংখ্যার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে এবং জনবলের ক্ষতি পোষাতে নতুন সেনা মোতায়েন করতে হিমশিম খাচ্ছে।
গত বুধবার বিশ্লেষক ডেভিড অ্যাক্স লিখেছেন, 'কমান্ডারদের এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—কোথায় আক্রমণ করতে হবে, কোথায় রক্ষা করতে হবে এবং কোথায় আশা করতে হবে যে রুশরা ফাঁকা জায়গাগুলোর সুযোগ নেবে না।' তিনি আরও বলেন, 'অল্প কিছু আঞ্চলিক ব্যাটালিয়নের পক্ষে একটি রুশ মোটর রাইফেল ব্রিগেডকে থামানো সম্ভব নয়, বিশেষ করে যদি তাদের পাশে গোলন্দাজ বাহিনী বা ড্রোন ইউনিটের শক্তিশালী সমর্থন না থাকে।'
দক্ষিণাঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর সমন্বিত কমান্ডের অভাব এবং পোখরভস্ক ও কুপিয়ানস্কের মতো এলাকাগুলোকে রক্ষার অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তও দক্ষিণে পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইউক্রেনীয় কমান্ড হুলিয়াইপোলে কয়েকটি অভিজাত ইউনিট পাঠিয়েছিল, কিন্তু ডেভিড অ্যাক্সের মতে, 'শহরটি বাঁচানোর জন্য তা ছিল খুব সামান্য এবং অনেক দেরি।'
