বিশ্বের দীর্ঘতম ভোটার তালিকা সংশোধন চলছে ভারতে; ৭ সপ্তাহে অর্ধশত কোটি ভোটারের তথ্য যাচাই
বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ভোটার তালিকা হালনাগাদে ভারতে শুরু হয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০০ কোটি মানুষের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নাগরিকদের এই যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে।
সারা দেশজুড়ে হাজারো সরকারি কর্মচারী এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে। প্রযুক্তির এই যুগেও অনেক এলাকায় হাতে লিখে ভোটারদের তথ্য ডাটাবেজে তোলা হচ্ছে।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে সময়সীমা ঘনিয়ে এসেছে। কর্তৃপক্ষ সেখানে ৩১ ডিসেম্বর, অর্থাৎ নতুন বছর শুরুর আগেই ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে।
সর্বশেষ ভোটার তালিকাটি ছিল ২০০৩ সালের। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এত বছরে জমা হওয়া 'জঞ্জাল' পরিষ্কার করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। গ্রাম থেকে জীবিকার সন্ধানে শহরে আসা মানুষের স্রোত, মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া আর অবৈধভাবে তালিকায় ঢুকে পড়াদের ছাঁটাই—সব মিলিয়ে তালিকাটি সংশোধনের করার কাজ চলছে জোরেশোরে।
নভেম্বরের শুরু থেকেই ভারতের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। এসব অঞ্চলে মোট প্রায় ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করেন। আগামী নির্বাচনে কারা ভোট দিতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যুক্ত আছেন লাখো সরকারি কর্মচারী। তাদের একজন প্রেম লতা, পেশায় স্কুলশিক্ষক। তার মতো প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি কর্মীকে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। নভেম্বরের শুরু থেকে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় তার কাজ শুরু হয়, অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত তা চলতে থাকে।
বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে তারা মাসে পান মাত্র এক হাজার রুপি। নয়াদিল্লিতে নিজের স্কুলকেই এখন অস্থায়ী অফিস হিসেবে ব্যবহার করছেন প্রেম লতা।
কাজের ফাঁকে তিনি বলেন, 'প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে, অথচ হাতে সময় নেই একদম।' কণ্ঠে ক্লান্তির ছাপ রেখে তিনি যোগ করেন, 'সারা দিন তো কাজ চলেই, রাত ১২টা-১টা পর্যন্তও বসে থাকতে হয়। শরীর তো আর মেশিন নয়; আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ, ব্যথা তো হবেই।'
ভারতের আমলাতন্ত্র এমনিতেই জটিল। তার ওপর ভোটার তালিকা হালনাগাদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ২০০৩ সালের পর থেকে দেশের সামাজিক বাস্তবতায় এসেছে বড় পরিবর্তন। জীবিকার তাগিদে অসংখ্য মানুষ এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে, কখনো শত শত মাইল দূরে চলে গেছেন। বিয়ের পর স্বামীর পদবি গ্রহণ করায় বদলে গেছে বহু নারীর নামও।
বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। তাদের একটি বড় অংশই এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নয়। নাম যাচাইয়ের জন্য সরকার নির্ধারিত ১২ ধরনের নথির কথা বলা হলেও, অনেকের কাছেই তার একটিও নেই।
ভারতের রাজনীতি বরাবরই উত্তাল ও কোলাহলমুখর। সেখানে ভোটার তালিকায় সামান্য পরিবর্তন হলেই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তুঙ্গে। সমালোচকদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার সংখ্যালঘুদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কৌশল হিসেবে এই যাচাই-বাছাই ব্যবহার করছে। তবে সরকার এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগও কম গুরুতর নয়। তাদের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় জীবিত স্থানীয় কাউন্সিলরদেরও 'মৃত' দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে দিন শেষে এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন মূলত মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। কাজে অবহেলার অভিযোগে ডজন ডজন মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে বুথ লেভেল অফিসারদের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় পার্লামেন্টে দেওয়া একটি তথ্যে। সেখানে জানানো হয়েছে, কাজের অসহনীয় চাপে পিষ্ট হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন এক ডজনেরও বেশি নির্বাচনকর্মী।
নয়াদিল্লির ঠিক লাগোয়া শহর নয়ডা। এখানকারই একটি স্কুলে বসে কাজ করছেন লতা ও তার মতো আরও সাতজন বুথ লেভেল অফিসার। ভোটার তালিকার শেষ নামগুলোর খোঁজে অবিরাম ফোন করে যাচ্ছেন তারা। শিক্ষকেরা যখন ফোনে ব্যস্ত, ছাত্রছাত্রীরা তখন স্কুলের মাঠে রোদে বসে অলস সময় পার করছে, খাতায় আঁকিবুঁকি কাটছে। স্কুল খোলা থাকলেও কার্যত অঘোষিত ছুটির মতো পরিবেশ।
ফোনের ওপাশ থেকে হয়তো কেউ প্রয়োজনীয় কাগজ দিতে গড়িমসি করছেন। লতার গলায় তাই চরম হুঁশিয়ারি, 'হোয়াটসঅ্যাপে জলদি তথ্য পাঠান, নইলে নাম কাটা যাবে।' ফোনের ওই প্রান্তের মানুষটিকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, 'আজই কিন্তু শেষ দিন। পরে কেন নাম বাদ পড়ল, সেই কৈফিয়ত চাইতে আসবেন না।'
লতার ওপর দায়িত্ব ছিল ৯৪৫ জন ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে তিনি বলেন, 'কেউ মারা গেছেন, কেউ বাসা বদলে অন্য জায়গায় চলে গেছেন, আর অনেকের কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না।'
আরেক বুথ লেভেল কর্মকর্তা রুবি বর্মা জানান, সমস্যাটা শুধু গড়িমসির নয়—অনেকেই সহযোগিতা করতে চান না। তাঁদের কাছে এই হালনাগাদের প্রয়োজনীয়তাই পরিষ্কার নয়।
রুবির ভাষায়, 'অনেকে বলেন, আমি তো আগেই ভোটার, আবার এসব তথ্য কেন দিতে হবে? যাচাইয়ের বিষয়টা তাঁরা বুঝতে চান না।' দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি যোগ করেন, 'সত্যি বলতে এটা একটা ধন্যবাদহীন কাজ। দিন শেষে কোনো প্রাপ্তির অনুভূতিই থাকে না।'
১৯৪৭ সালে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এ পর্যন্ত মোট আটবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছে ভারত। সর্বশেষ ২০০৩ সালে যখন সারা দেশে এই তালিকা তৈরির কাজ করা হয়েছিল, তখন ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ কোটি। আর সেই কাজ শেষ করতে সময় লেগেছিল পাক্কা ছয় মাস।
অথচ এবার ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রায় ৫০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ে প্রাথমিকভাবে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল মাত্র এক মাস। হুলুস্থুল পড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ রাজ্যে সময়সীমা দুবার বাড়ানো হয়েছে। আর ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে সময় বেড়েছে চারবার।
লতাদের মতো কর্মকর্তারা যেমন ভোটার খুঁজে পাচ্ছেন না, তেমনি সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করতে গিয়ে পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। সময়ের চাপ আর কাগজপত্রের জটিলতায় অনেকেই দিশেহারা।
লতার স্কুলে এই দৃশ্য এখন প্রতিদিনের। ভোটার তালিকায় নাম যাচাই করতে যারা আসছেন, তাদের বড় একটি অংশই ভিনরাজ্য থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিক। জীবিকার তাগিদে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে আসা এসব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তার ওপর মা–বাবার পুরোনো তথ্য খুঁজে বের করা তাদের কাছে হয়ে উঠছে জটিল এক গোলকধাঁধা।
ভোটার তালিকা হালনাগাদের এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে। সরকারের সমালোচকদের অভিযোগ, যাচাই–বাছাইয়ের নামে মূলত বিরোধী দলের সমর্থকদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে জোরদারভাবে চলছে তথ্য যাচাই। গত ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকায় দেখা গেছে, রাজ্যটি থেকে ৫৮ লাখেরও বেশি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেককেই 'মৃত' হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। মোদি সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলটির দাবি, তাদের এক স্থানীয় কাউন্সিলর জীবিত থাকা সত্ত্বেও তালিকায় তাঁকে 'মৃত' হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় দেখা গেছে, এসব রাজ্যেও লাখ লাখ ভোটারের নাম গায়েব হয়ে গেছে।
তবে বিরোধী দল ও সমাজকর্মীদের উদ্বেগের জায়গাটি আরও গভীরে। তাদের প্রশ্ন, বিদ্যমান ভোটার কার্ড থাকার পরও কেন নতুন করে নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে? আর যেসব নথি চাওয়া হচ্ছে, সেগুলো তো সাধারণত নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য ব্যবহৃত হয়। কেবল ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য নাগরিকত্ব প্রমাণের দলিলের আবশ্যকতা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
নানা সমালোচনা থাকলেও এই পুরো প্রক্রিয়ার পক্ষেই সাফাই গাইলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদের এই কাজ 'বৈধ ভোটারদের যাচাই-বাছাই ছাড়া আর কিছুই নয়'। বিরোধীদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, 'একজন ব্যক্তি কি একাধিক জায়গায় ভোট দেবেন? কিংবা যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের নামও কি তালিকায় থাকা উচিত?'
তবে ওপরতলার এই যুক্তিতর্ক লতাদের মতো মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আতঙ্ক কমাতে পারছে না। লতার রাজ্য উত্তর প্রদেশে ইতিমধ্যে কাজে 'অবহেলার' অভিযোগে কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযোগ (কমপ্লেইন) দায়ের করা হয়েছে।
লতা বলেন, '২০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। এখন যদি শুনি এত বছর পর চাকরিটা চলে যাবে, ভয় তো লাগবেই। তবু আমরা আমাদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ, আমরা চাই না আমাদের ভুলের কারণে কোনো মানুষ তার ভোটাধিকার হারাক।'
কাজের চাপ আর সময়সীমার খড়্গ—এর মধ্যেও মাঝেমধ্যে এমন সব পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা লতা ও তার সহকর্মীদের হাসির খোরাক জোগায়। কিছুটা সময়ের জন্য হলেও তাঁরা ভুলে যান ক্লান্তি।
ধরা যাক, পাশাপাশি দুই প্রতিবেশী। দুজনের নামই সুরাজ চৌহান, কাকতালীয়ভাবে তাদের বাবাদের নামও এক! আবার আটটি ভিন্ন এলাকার আটজন ভিন্ন ব্যক্তি, অথচ কাগজে-কলমে দেখাচ্ছে তাদের সবার বাবার নাম একই! এমন সব অদ্ভুত তথ্যের জট খুলতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় কর্মীদের।
লতার মনে হয়, এই কাজের যেন কোনো শেষ নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, 'বিরামহীন কাজ চলছে, এখনো সব ভোটারের তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি। সময়সীমা বাড়ানো হলে ভালো হতো। আর না হলে, যতটুকু কাজ হয়েছে, ততটুকুই জমা দিয়ে দিতে হবে। এর বেশি আর কীই-বা করার আছে!'
ভারতের বাকি রাজ্যগুলোতে কবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য স্পষ্ট—২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই সারা দেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শেষ করা।
রাজ্যজুড়ে নতুন ভোটার তালিকা জমা পড়লেও লতাদের জন্য আপাতত বিশ্রামের সুযোগ নেই। লতা জানেন, এই কাজের যেন কোনো শেষ নেই। যাচাই-বাছাই শেষ হলেই শুরু হবে নতুন ভোটার নিবন্ধনের প্রক্রিয়া। তার পরই যে কোনো সময় শুরু হতে পারে নির্বাচনী প্রস্তুতি।
সব শেষে লতার কণ্ঠে ঝরে পড়ল আক্ষেপ আর সামান্য আশার রেশ, 'সব চুকিয়ে তবেই হয়তো আমরা আমাদের আসল কাজে ফিরতে পারব। যে কাজের জন্য সরকার আমাদের বেতন দেয়—শ্রেণিকক্ষে বাচ্চাদের পড়ানো।'
