দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্ব ছাপিয়ে যেভাবে স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল সৌদি আরব ও আরব আমিরাত
গেল মঙ্গলবার ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি অস্ত্রের চালানে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব। রিয়াদের দাবি, ওই অস্ত্রগুলো আমিরাত থেকে ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য আনা হয়েছিল। যদিও আরব আমিরাতের দাবি, ইয়েমেনে তাদের যে চালানে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে, তাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ওই মালামাল ইয়েমেনের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং আমিরাতি বাহিনীর ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় উত্তেজনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার প্রধান দুই স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এই দুই প্রভাবশালী দেশের মধ্যে এখন তেলের বাজার থেকে শুরু করে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব—সবক্ষেত্রেই স্বার্থের সংঘাত ও মতপার্থক্য প্রকট হয়ে উঠছে।
ইয়েমেনের বহুমুখী গৃহযুদ্ধে নিজেদের প্রভাব ও সুবিধা বজায় রাখতে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত—উভয় দেশই দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এই দুই প্রভাবশালী দেশের সম্পর্কের বিবর্তনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
২০১১
আরব বসন্তের ঢেউ ছড়িয়ে পড়লে ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেয় এই দুই দেশ। বাহরাইনের গণ-অভ্যুত্থান দমনে তারা যৌথ বাহিনী মোতায়েন করে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে মিসরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রেও দেশ দুটি সমন্বিতভাবে সমর্থন দেয়।
২০১৫, মার্চ
ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত ইয়েমেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে দুই দেশ। এই যুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাত স্থল অভিযানের নেতৃত্ব দেয় এবং সৌদি আরব আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করে।
২০১৭, জুন
সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগে কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের নেতৃত্ব দেয় এই দুই মিত্র দেশ। কাতার অবশ্য বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের মধ্যকার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা আরও মজবুত হয়।
২০১৯
ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তারা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখে। ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পুরো ভার এককভাবে সৌদি আরবের ওপর এসে পড়ে।
২০২০, সেপ্টেম্বর
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে ইসলাম ধর্মের দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম সৌদি আরব ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের শর্তে অনড় থেকে এই পথে হাঁটেনি। এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আবুধাবির সরাসরি ও বিশেষ কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ তৈরি হয়।
২০২১, জানুয়ারি
কাতারের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে সৌদি আরবের আল-উলা শহরে একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই চুক্তিতে সই করে এবং দোহার প্রতি তাদের শীতল মনোভাব বজায় থাকে।
২০২১, ফেব্রুয়ারি
দুবাইয়ের বাণিজ্যিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায় রিয়াদ। তারা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সাফ জানিয়ে দেয়, ২০২৪ সালের মধ্যে আঞ্চলিক সদর দপ্তর সৌদি আরবে স্থানান্তর না করলে তারা সরকারি কোনো কাজ পাবে না।
২০২১, জুলাই
দুই দেশের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়ে। মুক্ত অঞ্চল থেকে আসা পণ্যের ওপর শুল্ক সুবিধা বাতিল করে রিয়াদ, যা আমিরাতের বাণিজ্যিক মডেলে বড় আঘাত দেয়। একই সময়ে তেলের উৎপাদন নিয়ে ওপেকের (ওপেক প্লাস) বৈঠকে সৌদি আরবের প্রস্তাব আটকে দেয় আমিরাত। তারা নিজেদের জন্য তেল উৎপাদনের উচ্চতর সীমা নির্ধারণের দাবি জানায়।
২০২৩, এপ্রিল
সুদানের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব দেশটির সেনাবাহিনীর সমর্থনে যুদ্ধবিরতি আলোচনার আয়োজন করে। অন্যদিকে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটির বিদ্রোহী পক্ষ 'র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস'-কে (আরএসএফ) অস্ত্র দিচ্ছে। যদিও আবুধাবি এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
২০২৫, ৮ ডিসেম্বর
ইয়েমেনে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত এসটিসি হাজরামাউতের তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে নেয়। রিয়াদ একে তাদের জন্য 'রেড লাইন' বা চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন হিসেবে ঘোষণা করে।
২০২৫, ৩০ ডিসেম্বর
ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে একটি জাহাজে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান। সৌদি জোটের দাবি, জাহাজটি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য ভারী অস্ত্র নিয়ে আসছিল। দীর্ঘদিনের দুই মিত্রের স্বার্থের দ্বন্দ্বে এটিই প্রথম সরাসরি সামরিক সংঘাত।
