অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ; যে সাউন্ডট্র্যাক তৈরিতে সময় লেগেছে ৭ বছর
'অ্যাভাটার' সিনেমা মানেই প্রযুক্তির এক বিশাল চমক। এর সিনেমাটোগ্রাফি, অ্যানিমেশন বা অভিনয়ের কারিগরি—সবকিছুতেই থাকে নতুনত্বের ছোঁয়া। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, এই সিনেমার সংগীত বা মিউজিকের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা প্রযোজ্য।
সুরকার সাইমন ফ্র্যাংলেন জানিয়েছেন, সিরিজের তৃতীয় ছবি 'অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ'-এর কাজ শেষ করতে তার দীর্ঘ সাত বছর সময় লেগেছে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি ১,৯০৭ পাতার অর্কেস্ট্রা স্কোর বা স্বরলিপি লিখেছেন। এমনকি ভিনগ্রহের কাল্পনিক জগত 'প্যান্ডোরা'র বাসিন্দাদের বাজানোর জন্য তিনি সম্পূর্ণ নতুন বাদ্যযন্ত্রও আবিষ্কার করেছেন।
পরিচালক জেমস ক্যামেরন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিনেমার দৃশ্য ঘষামাজা করেছেন। তাই ছবি প্রিন্ট হওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে ব্রিটিশ এই সুরকার তার শেষ মিউজিকটি জমা দিতে পেরেছেন।
সাইমন জানান, সাধারণ যেকোনো হলিউড সিনেমার চেয়ে 'অ্যাভাটার'-এ চার গুণ বেশি মিউজিক থাকে। ১৯৫ মিনিটের এই সিনেমার প্রায় পুরোটাতেই মিউজিক দিতে হয়েছে। তিনি হেসে বলেন, "তবে ভালো আচরণের জন্য আমি ১০ মিনিট ছাড় পেয়েছিলাম।"
গল্পের মোড় ও শোকের সুর
রেকর্ড ব্রেকিং এই সিরিজের তৃতীয় কিস্তি 'ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ' মুক্তি পাচ্ছে ১৯ ডিসেম্বর। নীল রঙের 'নাভি' জনগোষ্ঠী তাদের গ্রহকে মানুষের হাত থেকে বাঁচাতে লড়ছে। মানুষ সেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করতে চায়।
নতুন এই সিনেমা দর্শকদের প্যান্ডোরার অবিশ্বাস্য সুন্দর দৃশ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তবে এবার গল্পের আবেগ অনেক গভীর। সিনেমার শুরুতে দেখা যাবে প্রধান দুই চরিত্র জেক সুলি (স্যাম ওয়ার্থিংটন) এবং নেইতিরি (জোয়ি সালডানা) তাদের কিশোর ছেলে নেতেয়ামের মৃত্যুতে শোক পালন করছে।
সন্তান হারানোর শোকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। সাইমনকে এমন সুর তৈরি করতে বলা হয়েছিল যা তাদের এই হতাশার গভীরতা বোঝাতে পারে।
তিনি বলেন, "আমি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম যেন তাদের মাঝখানের বেড়ে চলা দূরত্বটা আপনারা অনুভব করতে পারেন। তাই আমি মিউজিকের দুটি লাইন আলাদা করে দিয়েছি, যেন মনে হয় তারা বিচ্ছিন্ন এবং নিঃসঙ্গ।"
তিনি আরও বলেন, "সাধারণত এমন সিনেমায় শোকের বিষয়গুলো অতটা গুরুত্ব পায় না। কিন্তু যেকোনো পরিবারের জন্য সন্তান হারানো সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। মিউজিকের ক্ষেত্রেও এই নীরব মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
ভিনগ্রহের অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র
সিনেমার অন্য এক অংশে 'উইন্ড ট্রেডার্স' বা যাযাবর এক বণিক দলের দেখা মিলবে। তারা আকাশে ভাসে এমন জাহাজে বা গ্যালিয়নে ভ্রমণ করে। সেখানে তাদের উৎসবের দৃশ্যে সাইমন তার কল্পনাকে ডানা মেলতে দিয়েছেন।
১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের অ্যাকশন সিনেমার আদলে তাদের সুর তৈরি করা হয়েছে। তবে চমক হলো প্যান্ডোরার নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র।
সাইমন বলেন, "সমস্যা হলো, প্যান্ডোরার কোনো পার্টিতে তারা কী বাজাবে? আমি তো তাদের গিটার, বেস বা ড্রাম দিতে পারি না। আমাকে এমন যন্ত্র বানাতে হয়েছে যা তিন মিটার লম্বা, চার আঙুলের নীল মানুষদের জন্য মানানসই।"
যেহেতু অ্যাভাটার পুরোটা অ্যানিমেশন নয়, তাই পর্দায় যে যন্ত্রগুলো দেখা যাবে তা বাস্তবেও থাকতে হবে। এটি পরিচালক ক্যামেরনের নিয়ম।
সাইমন কিছু যন্ত্রের নকশা আঁকেন এবং আর্ট ডিপার্টমেন্ট সেগুলো তৈরি করে। এর মধ্যে ছিল তুর্কি বাদ্যযন্ত্র 'সাজ'-এর মতো লম্বা গলার এক যন্ত্র। জাহাজের পালের কাপড় দিয়ে বানানো হয়েছে ড্রামের উপরের অংশ। থ্রি-ডি প্রিন্টারে এগুলো বানানো হয় এবং অভিনেতারা সেটে সেগুলো সত্যিই বাজিয়েছেন।
তবে যন্ত্রগুলোর এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নেই। সাইমন হেসে বলেন, "আপাতত এগুলোকে 'তারের জিনিস' আর 'ড্রামের জিনিস' বলে ডাকা হচ্ছে। আমার মনে হয় এগুলোর নাম ঠিক করতে একটা প্রতিযোগিতা করা উচিত।"
সাইমনের উঠে আসা
মাত্র ১৩ বছর বয়সে সাইমনের মিউজিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। তিনি বিবিসিকে চিঠি লিখেছিলেন রেকর্ড প্রডিউসার হওয়ার উপায় জানতে। বিবিসি ভুল বুঝে তাকে রেডিও প্রোডাকশনের বদলে ইলেকট্রনিক্স পড়ার পরামর্শ দেয়। সেই সুবাদে আশির দশকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি সিন্থেসাইজার বা বাদ্যযন্ত্রের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন।
পরে আমেরিকায় গিয়ে তিনি হুইটনি হিউস্টন ও মাইকেল জ্যাকসনের মতো তারকাদের সঙ্গে কাজ করেন। মাইকেল জ্যাকসনের 'হিস্ট্রি' অ্যালবামে তিনি ড্রাম প্রোগ্রামিং করেছিলেন।
সিনেমার গানে তার হাতেখড়ি হয় অস্কারজয়ী 'ড্যান্সেস উইথ উলভস' দিয়ে। পরে তিনি 'সেভেন' সিনেমার মিউজিক করেন। জেমস ক্যামেরনের সঙ্গে তার পরিচয় হয় বিখ্যাত সুরকার জেমস হর্নারের মাধ্যমে। তখন তারা 'টাইটানিক' সিনেমায় কাজ করছিলেন। তখন অর্থের অভাবে 'টাইটানিক'-এর মিউজিক মূলত সিন্থেসাইজার দিয়ে করা হয়েছিল।
'অ্যাভাটার'-এর ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটেছে। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার একদম নিষিদ্ধ ছিল। সাইমন বলেন, "ক্যামেরন আমাকে নির্দিষ্ট করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আমরা কোনো এআই ব্যবহার করছি না তো? আমরা কোনো সত্যিকারের মিউজিশিয়ানের কাজ কেড়ে নিচ্ছি না তো?'"
তিনি বলেন, "অনেক প্রযোজক টাকা বাঁচাতে এআই ব্যবহার করতেন। কিন্তু জেমস ক্যামেরন মানের সঙ্গে কোনো আপস করেন না। অভিনেতাদের অভিনয়ের মতো মিউজিকটাও তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।"
ছবি মুক্তির আগেই মাইলি সাইরাসের গাওয়া থিম সং 'ড্রিম অ্যাজ ওয়ান'-এর জন্য গোল্ডেন গ্লোব মনোনয়ন পেয়েছেন সাইমন। তবে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছেন। ক্যামেরন ইতিমধ্যে ২০২৯ ও ২০৩১ সালের জন্য 'অ্যাভাটার' চার ও পাঁচের চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলেছেন।
সাইমন বলেন, "চতুর্থ পর্বটি অবিশ্বাস্য। এটি একদম নতুন এক জগতে নিয়ে যাবে।"
তবে পরের সিনেমাগুলো আসবে কি না, তা নির্ভর করছে 'ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ'-এর ব্যবসার ওপর। সাইমন বলেন, "আমি আশা করি আমাদের খরচ উঠে আসবে। সম্ভবত ১.৪ বিলিয়ন (১৪০ কোটি) ডলার আয় করলেই আমরা পরের সিনেমাটি বানাতে পারব। দর্শক যদি চায়, তবেই আমরা অ্যাভাটার ফোর নিয়ে আসব।"
