পোকরোভস্ক দখল হলেও ফ্রন্টলাইন ভেঙে পড়বে না, তবে ট্রাম্পের দৃষ্টিতে দুর্বল হবে ইউক্রেন
রাশিয়ার কাছে পোকরোভস্কের পতন এখন 'কবে' ঘটবে—সে প্রশ্নই মূল; 'হবে কি হবে না'—তা নয়। তবে শহরটি দখল হলেও ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যূহে তাৎক্ষণিক কোনো ধস নামবে না বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি-আলোচনার সংবেদনশীল সময়ে এটি কিয়েভকে স্পষ্টভাবে দুর্বল অবস্থায় ফেলে দেবে।
মস্কো গত ১ ডিসেম্বর জানিয়েছিল, রুশ সেনারা পোকরোভস্ক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে—এর দুই দিন পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও তার জামাতা ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতির একটি খসড়া চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তবে রাশিয়ার দাবির ১০ দিন পরও ইউক্রেন বলছে, তাদের সেনারা এখনো শহরের উত্তরাংশে অবস্থান ধরে রেখেছে। পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর আগে ৬০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল পোকরোভস্কে, এবং লড়াই তীব্র হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি ইউক্রেনীয় বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
ইউক্রেনের দাতব্য প্রতিরক্ষা সংস্থা 'কাম ব্যাক অ্যালাইভ'-এর সিনিয়র বিশ্লেষক মাইকোলা বিলিয়েস্কভ বলেন, "প্রতিকূল শর্তে ইউক্রেনকে শান্তি আলোচনার দিকে ঠেলে দেওয়ার যে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি এই ফ্রন্টে তীব্র লড়াইয়ের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলছে। এতে রাশিয়া লাভবান হচ্ছে, কারণ এটা ট্রাম্পের মূল্যায়নকে প্রভাবিত করে।"
এদিকে ইউক্রেনের জন্য জরুরি হলো যেভাবেই হোক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। কারণ ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র সরবরাহ করে দেশটিকে। একইসঙ্গে এমন এক শান্তি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, যেখানে রাশিয়া দাবি করছে ডনবাস অঞ্চলের সমগ্র অংশ থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে। এই অঞ্চলেই অবস্থান পোকরোভস্কের।
ইউক্রেনের সরকার বলছে, ২০১৪ সাল থেকে যে ভূমির (ডনবাস) জন্য যুদ্ধ চলছে, সেটি কোনও আক্রমণকারী শক্তির কাছে ছেড়ে দেওয়ার নৈতিক বা আইনগত অধিকার তাদের নেই। শিল্পসমৃদ্ধ এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নই দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু।
এমতাবস্থায় চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প কিয়েভের উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য আরও কঠোর করেন। মার্কিন গণমাধ্যম পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাশিয়া যুদ্ধের উপরের দিকে অবস্থান করছে এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির "কিছু বিষয় মেনে নেওয়া শুরু করা উচিৎ।"
রুশ বাহিনীর ধীর অগ্রযাত্রা
পোকরোভস্কে রুশ বাহিনীর ধীরলয়ে এগোতে পারছে, আর সেটাই এ যুদ্ধের প্রযুক্তিগত বাস্তবতাকে আবারো তুলে ধরছে। ঘাতক ড্রোনের অবাধ বিচরণের মধ্যে সামনে এগিয়ে যাওয়া যে কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তা স্পষ্ট করছে এই ধীরগতি।
২০২২–এর পর যুদ্ধ এক ধরনের শক্তিক্ষয়ের যুদ্ধের রূপ নেয়, যেখানে কোনো পক্ষই সহজে ভূমির দখল নিতে পারেনি। ২০২৩ সালের শেষদিকে রাশিয়া নতুন আক্রমণ শুরু করে এবং ইউক্রেনের মোট ১৯.২ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেয়—যা ২০২২ সালের শেষের তুলনায় মাত্র এক শতাংশের কিছু বেশি।
ডনবাসের দনেৎস্ক অঞ্চলের উঁচু এলাকায় অবস্থিত পোকরোভস্ক হবে ২০২৪ সালের শুরুতে পূর্বাঞ্চলীয় আভদিভকা দখলের পর রাশিয়ার প্রথম দখল করা বড় শহর। শহরটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত; মাত্র ১,২০০ বাসিন্দা সেখানে টিকে আছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের সাথে সামরিক বিশ্লেষকরাও একমত—পূর্ব ফ্রন্টে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা হঠাৎ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। এর পেছনে আছে তাদের ফ্রন্টলাইন দুর্গ, ড্রোন প্রতিরক্ষা এবং পোকরোভস্কে রুশ সেনাদের বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আক্রমণ কৌশল।
ইউক্রেনীয় বাহিনী জানায়, রুশ সেনারা সাধারণত ছয়জন বা তারও কম সদস্যের দলে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে এক বা দুইজন সেনা ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা ভেদ করে কোনো একটি ভবন দখলের চেষ্টা করছে।
"তারা (রুশরা) ছোট ছোট আক্রমণ দল গড়ে আমাদের অবস্থান ঘিরে ফেলছিল, কারণ আমাদের পদাতিক বাহিনীর সংকট এখন খুবই গুরুতর," বলেন 'লামবাদা' ছদ্মনামের এক ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটর, যিনি পোকরোভস্কে লড়েছেন।
পোল্যান্ডের সামরিক বিশ্লেষক কনরাড মুজিকা বলেন, ইউক্রেন আগস্টে তাদের স্কেলিয়া অ্যাসল্ট রেজিমেন্ট ও বিশেষ বাহিনীকে পোকরোভস্কে পাঠিয়েছিল প্রতিরক্ষা জোরদারে, তবে পূর্বাঞ্চলের লাইমান ও কুপিয়ানস্ক ফ্রন্টে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় পরে এই ইউনিটগুলো আবার সেখানে পাঠানো হয়।
যুদ্ধকালীন সময়ে ইউক্রেনের রিজার্ভ সেনার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বারবার উঠে এসেছে—মার্কিন কর্মকর্তারাও ইউক্রেনকে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
যদিও এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়। ইউক্রেনের সরকার দেশটির ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণ প্রজন্মকে রক্তক্ষয়ী এই সংঘাত থেকে রক্ষা করতে সেনা নিয়োগের ন্যূনতম বয়স কমাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
এরপর কী?
যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনায় প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব আসে যে ইউক্রেনকে দনেৎস্ক অঞ্চল থেকে সরে যেতে হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইউক্রেন বর্তমানে এ অঞ্চলের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। জেলেনস্কি এই সপ্তাহে জানান, তিনি ও ইউরোপীয় নেতারা নতুন ২০ দফা পরিকল্পনা তৈরি করেছেন, তবে ভূখণ্ড ছাড়ার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। শিগগিরই তাদের প্রস্তাব ওয়াশিংটনে পাঠানো হবে।
পুতিন সম্প্রতি বলেছেন, পোকরোভস্ক—যাকে রাশিয়া সোভিয়েত আমলের নাম 'ক্রাসনোআর্মেইস্ক' বলে—যে কোনো দিকেই সামরিক অভিযান চালানোর জন্য "আদর্শ প্ল্যাটফর্ম।"
বিশ্লেষক মুজিকা বলেন, রাশিয়া সম্ভবত পোকরোভস্কের উত্তর-পূর্বে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোর্স্ককে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করবে। যাতে উঁচু এলাকায় অবস্থান নিয়ে আরও দূরত্বে ড্রোন হামলা চালাতে পারে।
দক্ষিণে জাপোরিঝিয়া অঞ্চল এবং পূর্বে দ্নিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলেও রাশিয়ার সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখা গেছে—যদিও দ্নিপ্রোপেত্রোভস্ক রাশিয়ার দাবি করা পাঁচটি দখলকৃত অঞ্চলের মধ্যে পড়ে না। তবে দ্রুত সাফল্যের সম্ভাবনা কম বলছেন পশ্চিমা বিশ্লেষকরা।
মুজিকার মতে, "তারা যেভাবে অভিযান পরিচালনা করছে, তাতে অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর।"
ট্রাম্প দ্রুত ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থায়ন করা মার্কিন সহায়তা—যেমন গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র সরবরাহ—কাটছাঁট করার হুমকি দিচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন 'ন্যায়সঙ্গত' শান্তিচুক্তির প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি জোর দিয়ে তুলে ধরছে।
কিয়েভ আশা করছে, তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা আরও বেশি অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেবে।
গত আগস্ট থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানিশিল্পকে নিশানা করছে, মস্কোর রাজস্ব কমাতে এবং জ্বালানি সংকট তৈরি করতে। সম্প্রতি তারা কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজগুলোকেও টার্গেট করা শুরু করেছে।
রাশিয়া পাল্টা ব্যাপক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ধাপে ধাপে, যা ইউক্রেনের জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি করেছে এবং দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শীর্ষ ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, "যুদ্ধ আরও কয়েক বছর চলতে পারে, যদি না কোনো 'ট্রাম্প মুহূর্ত' বা 'পুতিন মুহূর্ত' এসে সেটি থামিয়ে দেয়"—তবে তার মূল্যায়ন, পুতিনের পিছু হটার কোনো ইচ্ছাই নেই।
