১২ হাজার বছরে প্রথম অগ্ন্যুৎপাত ইথিওপিয়ার আগ্নেয়গিরির; ছাই ছড়িয়েছে ভারতের আকাশে, ফ্লাইট বাতিল
ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের একটি আগ্নেয়গিরিতে প্রায় ১২ হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। এই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আকাশে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত উঁচুতে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে এবং তা লোহিত সাগর পেরিয়ে ইয়েমেন, ওমান ও ভারতের দিকে ধাবিত হয়।
এ আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ছাইয়ের মেঘ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় এই ছাইয়ের মেঘ ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করে রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, দিল্লি ও পাঞ্জাবের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। মাটি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ভেসে আসা এই মেঘের কারণে আকাশ অন্ধকার হয়ে যায় এবং দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলে অবস্থিত 'হাইলি গুবি' আগ্নেয়গিরিটি রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে প্রায় ৫০০ মাইল উত্তর-পূর্বে এবং ইরিত্রিয়া সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। গত রোববার এই আগ্নেয়গিরিতে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে অগ্ন্যুৎপাত চলে।
স্থানীয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেইদ বলেন, এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব স্থানীয় গবাদি পশুপালক সম্প্রদায়ের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সেইদ আরও জানান, হাইলি গুবি আগ্নেয়গিরিতে এর আগে অগ্ন্যুৎপাতের কোনো রেকর্ড নেই। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ বা গবাদি পশুর প্রাণহানি না ঘটলেও বহু গ্রাম ছাইয়ে ঢাকা পড়েছে। এর ফলে গবাদি পশুদের খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।'
প্রায় ৫০০ মিটার উচ্চতার এই আগ্নেয়গিরি 'রিফ্ট ভ্যালি' অঞ্চলে অবস্থিত। ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় এই অঞ্চলে দুটি টেকটোনিক প্লেট বা ভূত্বকীয় পাত পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
ভলক্যানিক অ্যাশ অ্যাডভাইজরি সেন্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের মেঘ ইয়েমেন, ওমান, ভারত ও পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
আফার অঞ্চলটি মূলত ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। আহমেদ আবদেলা নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তিনি বিকট শব্দ শুনতে পান এবং তার কাছে এটি শক্তিশালী কম্পন তরঙ্গের মতো মনে হয়েছে। তিনি বলেন, 'মনে হলো ধোঁয়া আর ছাইসমেত হঠাৎ কোনো বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ঘন সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা গেছে। তবে বার্তা সংস্থা এএফপি তাৎক্ষণিকভাবে এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গ্লোবাল ভলক্যানিজম প্রোগ্রাম-এর তথ্যমতে, হলোসিন যুগে হাইলি গুবি আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাতের কোনো রেকর্ড নেই। সর্বশেষ বরফ যুগের সমাপ্তির পর প্রায় ১২,০০০ বছর আগে হলোসিন যুগের সূচনা হয়।
মিশিগান টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ সাইমন কার্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্লুস্কাই-এ নিশ্চিত করেন, 'হলোসিন যুগে হাইলি গুবিতে অগ্ন্যুৎপাতের কোনো রেকর্ড নেই'।
এদিকে নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জরুরি 'অ্যাসটাম'—অর্থাৎ ভলক্যানিক অ্যাশ অ্যালার্ট জারি করেছে। ফলে ইন্ডিগো অন্তত ছয়টি ফ্লাইট বাতিল করেছে এবং আকাসা এয়ার জেদ্দা, কুয়েত ও আবুধাবিগামী বেশ কিছু ফ্লাইট ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করেছে।
আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে রুট বদলাতে ভারতীয় বিমানগুলোর সেই সুযোগ না থাকায় ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া বিমানবন্দরগুলোকে রানওয়ে এবং ট্যাক্সিওয়েতে ছাই জমছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার এবং প্রয়োজনে কার্যক্রম স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
