ফিলারের দিন শেষ, রূপচর্চায় অনেকের ভরসা এবার মাছের শুক্রাণু থেকে তৈরি ইনজেকশনে
দক্ষিণ ম্যানচেস্টারের একটি ছোট নান্দনিক ক্লিনিকে বড় কালো গদিওয়ালা চেয়ারে শুয়ে আছেন অ্যাবি। তার গালে খুব সাবধানে একটি ছোট নল ঢোকানো হচ্ছে।
ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠেন তিনি। তবে ২৯ বছর বয়সী অ্যাবি কিন্তু সরাসরি মাছের শুক্রাণু বা 'স্পার্ম' নিচ্ছেন না।
ত্বকের নিচের অংশে ডিএনএ-র খুব ছোট টুকরো প্রবেশ করানো হচ্ছে। এর নাম পলিনিউক্লিওটাইড। এটি ট্রাউট বা স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে নেওয়া হয়।
মজার ব্যাপার হলো, মানুষের ডিএনএ-র সঙ্গে মাছের ডিএনএ-র বেশ মিল আছে।
তাই আশা করা হয়, অ্যাবির শরীর এই মাছের ডিএনএ গ্রহণ করবে। এতে তার ত্বকের কোষগুলো জেগে উঠবে। ত্বক তখন কোলাজেন ও ইলাস্টিন নামের দুটি প্রোটিন তৈরি করবে। ত্বকের গঠন ঠিক রাখতে এই প্রোটিন খুব জরুরি।
অ্যাবির উদ্দেশ্য হলো ত্বক সতেজ ও সুস্থ রাখা। তিনি বহু বছর ধরে ব্রণের সমস্যায় ভুগছেন। তিনি আশা করছেন এর ফলে দাগ ও লালচে ভাব কমবে।
তিনি বলেন, 'আমি শুধু সমস্যাযুক্ত জায়গাগুলো ঠিক করতে চাই।'
পলিনিউক্লিওটাইডকে ত্বকের যত্নে পরবর্তী বড় 'জাদু' বা মিরাকল বলা হচ্ছে। তারকারা তাদের 'স্যামন স্পার্ম ফেসিয়াল' নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার পর এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।
এই বছরের শুরুর দিকে চার্লি এক্সসিএক্স তার ৯০ লাখ ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারকে জানান, 'ফিলার এখন পুরনো হয়ে গেছে।' তিনি এখন পলিনিউক্লিওটাইড ব্যবহার করছেন এবং এটি তার কাছে 'গভীর থেকে কাজ করা ভিটামিনের মতো'।
কিম এবং ক্লোই কারদাশিয়ানও এর ভক্ত বলে শোনা যায়। জেনিফার অ্যানিস্টনকেও জিমি কিমেল লাইভ-এ নিজের রূপচর্চা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, 'আমার ত্বক কি সুন্দর স্যামন মাছের মতো লাগছে না?'
মাছের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও এটি কি সত্যিই রূপচর্চায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে?
ডার্মাফোকাস নামের একটি কোম্পানির সুজ্যান ম্যানসফিল্ড বলেন, 'আমরা এখন বেঞ্জামিন বাটন মুহূর্ত পার করছি।'
এটি ২০০৮ সালের 'দ্য কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন' সিনেমার একটি রেফারেন্স। সেখানে ব্র্যাড পিট এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেন যার বয়স পেছনের দিকে যায়। শেষ বয়সে তার ত্বক শিশুর মতো হয়ে যায়।
বাস্তবে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ম্যানসফিল্ড জানান, ত্বক পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে পলিনিউক্লিওটাইড পথ দেখাচ্ছে।
ছোট পরিসরে কিছু গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, ইনজেকশনের মাধ্যমে এটি প্রয়োগ করলে ত্বক সজীব হয়। ত্বক স্বাস্থ্যকর হয় এবং বলিরেখা বা দাগ কমতে পারে।
ম্যানসফিল্ড বলেন, 'সৌন্দর্য চর্চায় আমরা শরীর যা প্রাকৃতিকভাবে করে, সেটাকেই বাড়িয়ে দিচ্ছি। এজন্যই এটি বিশেষ কিছু।'
তবে এর খরচও অনেক।
পলিনিউক্লিওটাইড ইনজেকশনের এক একটি সেশনের খরচ ২০০ থেকে ৫০০ পাউন্ড হতে পারে (বাংলাদেশি টাকায় যা ৩০ থেকে ৭৫ হাজার টাকার মতো)। কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন তিনটি সেশন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এরপর চেহারা ঠিক রাখতে প্রতি ছয় থেকে নয় মাস পর পর আবার ইনজেকশন নিতে হয়।
ক্লিনিকে ফিরে আসা যাক। অ্যাবির চিকিৎসা প্রায় শেষ।
ক্লিনিকটির মালিক ও নার্স হেলেনা ডঙ্ক তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, 'আর মাত্র একটা জায়গা বাকি।'
তিনি জানান, গত ১৮ মাসে পলিনিউক্লিওটাইডের জনপ্রিয়তা ব্যাপক বেড়েছে।
হেলেনা বলেন, 'আমার অর্ধেক ক্লায়েন্ট সত্যিই বিশাল পার্থক্য দেখতে পান। তাদের ত্বক আরও আর্দ্র, স্বাস্থ্যকর ও তরুণ মনে হয়। বাকি অর্ধেক হয়তো এত বড় পরিবর্তন দেখেন না। তবে তাদের ত্বকও টানটান ও সতেজ হয়।'
অ্যাবি এর আগে চোখের নিচে ইনজেকশন নিয়েছিলেন। তিনি ফলাফলে বেশ খুশি।
সেখানে অনেকগুলো ছোট ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। প্রক্রিয়াটি ছিল 'বেশ বেদনাদায়ক'। তবে তিনি বলেন, এতে তার চোখের নিচের কালো দাগ কমেছে।
অনেক গবেষণায় একে নিরাপদ বলা হলেও, এটি বেশ নতুন পদ্ধতি। কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করছেন যে বিজ্ঞানের চেয়ে হুজুগ বেশি ছড়াচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জন প্যাগলিয়ারো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, আমাদের শরীরে নিউক্লিওটাইড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ডিএনএ তৈরি করে। কিন্তু 'স্যামন মাছের ডিএনএ কেটে ছোট টুকরো করে' মুখে দিলেই কি সেটা কাজ করবে?
তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে ভালো ও জোরালো তথ্য নেই। একজন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি চাইব আরও কয়েক বছর ধরে বড় ও বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা হোক। তারপরই আমি এটি ব্যবহার করব। আমরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি।'
শার্লট বিকলি পলিনিউক্লিওটাইড নিয়ে তার অভিজ্ঞতাকে 'স্যামন-কেলেঙ্কারি' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নিউইয়র্কের ৩১ বছর বয়সী এই তরুণী গত বছর তার বিয়ের ঠিক আগে এই চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বিয়ের দিন তাকে উজ্জ্বল দেখাক।
কিন্তু ফল হলো উল্টো। শার্লটের ত্বকে ইনফেকশন বা সংক্রমণ হলো। ত্বক ফুলে গেল এবং চোখের নিচের কালি আগের চেয়ে আরও বেড়ে গেল।
তিনি বলেন, 'আমি যা চেয়েছিলাম তার ঠিক উল্টোটা হয়েছে। আমি সেই ডাক্তারকে বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছেন।'
শার্লট মনে করেন, তার চোখের নিচে খুব গভীরে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে লালচে ভাব, ফোলা এবং কালশিটে পড়তে পারে। তবে এগুলো সাধারণত সাময়িক।
কিছু ক্ষেত্রে অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে। ঠিকমতো ইনজেকশন না দিলে ত্বকের রঙ বদলে যাওয়া বা সংক্রমণের মতো দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিও থাকে।
যুক্তরাজ্যে পলিনিউক্লিওটাইড ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে এটি মেডিকেল ডিভাইস হিসেবে নিবন্ধিত, তবে ওষুধের মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এখনো এটি অনুমোদন করেনি।
শার্লট বলেন, 'আমি শুধু ভাবি, কেন আমি এটা করতে গেলাম? আমার মুখে কোনো সমস্যা হলে আমি সেটা নিয়েই পড়ে থাকি।'
অবস্থা ঠিক করতে তিনি চিকিৎসায় হাজার হাজার টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু ১০ মাস পরেও তার চোখের নিচে কিছু দাগ রয়ে গেছে।
শার্লট বলেন, 'আমি আর কখনও আমার মুখে স্যামন মাছের ডিএনএ নেব না। কখনোই না।'
সেভ ফেস নামের একটি সংস্থার পরিচালক অ্যাশটন কলিন্স কসমেটিক শিল্পের নিয়মকানুন নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক দিলে এবং ভালো ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করলে পলিনিউক্লিওটাইড সাধারণত নিরাপদ।
তিনি বলেন, 'কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো, এখন বাজারে এমন পণ্য আসছে যেগুলো ঠিকমতো পরীক্ষা করা হয়নি।'
ব্রিটিশ কলেজ অফ অ্যাসথেটিক মেডিসিনের প্রেসিডেন্ট ডা. সোফি শটারও একমত।
তিনি বলেন, 'নিয়ন্ত্রণের অভাবে যে কেউ এমন পণ্য ব্যবহার করতে পারে যা ঠিকমতো পরীক্ষা করা হয়নি। এটা একটা বড় সমস্যা।'
তবে তার মতে পলিনিউক্লিওটাইড কি কার্যকর?
ডা. শটার বলেন, 'আমার কাছে এটা আছে। যারা প্রাকৃতিক লুক চান তাদের আমি এটি অফার করি।'
তবে তিনি আরও বলেন, 'পলিনিউক্লিওটাইড সব সমস্যার সমাধান নয়। বাজারে আরও অনেক চিকিৎসা আছে যা একই কাজ করে এবং সেগুলোর পক্ষে আরও বেশি তথ্য-প্রমাণ আছে।'
তিনি যোগ করেন যে, কোনো একটি চিকিৎসা সবার জন্য কাজ করবে না।
'আমরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন জিনিসে ভিন্নভাবে সাড়া দিই। এটা সবসময় আগে থেকে বলা যায় না।'
