মায়াবী চেহারার রাকুন কি তবে আমেরিকার পরবর্তী পোষা প্রাণী?
আমেরিকার ঘরে ঘরে পোষা প্রাণী হিসেবে জায়গা করে নিতেই যেন এগিয়ে আসছে রাকুন।
আদর করে এদের ডাকা হয় 'ট্র্যাশ পান্ডা' বা আবর্জনার পান্ডা। চোখে কালো মুখোশ পরা চেহারার এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটি ডাস্টবিনে খাবার খোঁজার ওস্তাদ। তবে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য—মানুষের কাছাকাছি থাকার ফলে এদের বিবর্তন ঘটছে, আর এরা দেখতে আগের চেয়েও অনেক বেশি 'কিউট' বা মায়াবী হয়ে উঠছে।
চেহারায় স্পষ্ট পরিবর্তন
গবেষণায় প্রায় ২০ হাজার ছবি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে এক স্পষ্ট পরিবর্তন—গ্রামের রাকুনদের তুলনায় শহরের রাকুনদের মুখের সামনের অংশ বা থুতনি অনেকটাই ছোট হয়ে গেছে। কুকুর বা বিড়াল যখন বন্য দশা থেকে গৃহপালিত হতে শুরু করেছিল, তাদের মধ্যেও ঠিক এমন শারীরিক পরিবর্তনই দেখা গিয়েছিল।
কেউ কেউ তো ইতিমধ্যেই এদের পোষা প্রাণী হিসেবে ঘরে তুলেছে, আর টিকটকে এরা রীতিমতো তারকা বনে গেছে! গত বছর ফিলাডেলফিয়ায় মেজর লিগ সকারের একটি ম্যাচ চলাকালে তো এক দুঃসাহসী রাকুন দৌড়ে মাঠের ভেতর ঢুকে পড়েছিল।
ডোরাকাটা লেজের এই প্রাণীগুলোকে অনেকে 'ব্যাকইয়ার্ড ব্যান্ডিট' বা 'বাড়ির উঠানের ডাকাত' বলেও ডাকে। পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই এদের অবাধ বিচরণ।
জঙ্গল হোক বা শহর—সব পরিবেশেই এরা দিব্যি মানিয়ে নিতে পারে। তাই আমেরিকার জনজীবনে এরা এক অদ্ভুত অবস্থানে আছে। কোনো পাড়ায় এরা আদরের পোষা প্রাণী, আবার কোথাও এরা বিরক্তিকর উপদ্রব।
ভয় কমছে, বাড়ছে সখ্য
ফ্রন্টিয়ার্স ইন জুওলজি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের কাছাকাছি থাকা মানে হলো এরা আমাদের সঙ্গে আরও সামাজিক হয়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় বললে, এদের জন্মগত 'পালিয়ে যাওয়ার' প্রবণতা কমে আসছে।
এদের চেহারা যে এমন নরম বা মায়াভরা হয়ে উঠছে, তার কারণ হতে পারে কোষের স্তরে এদের 'লড়ব নাকি পালাব' (ফ্লাইট অর ফাইট) প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তন।
ইউনিভার্সিটি অফ আরকানসাস অ্যাট লিটল রকের গবেষক ও এই গবেষণার সহ-লেখক রাফায়েলা লেশ সায়েন্টিফিক আমেরিকান-কে বলেছেন, শহরের বুকে এদের গৃহপালিত হওয়ার এই প্রক্রিয়ার শুরুটা আসলে আবর্জনা থেকেই।
তিনি বলেন, 'আবর্জনাই আসলে এর মূল চাবিকাঠি। মানুষ যেখানেই যায়, সেখানেই আবর্জনা থাকে—আর প্রাণীরা আমাদের ফেলে দেওয়া খাবার পছন্দ করে।'
কিন্তু এই অঢেল খাবারের সুযোগ নিতে হলে বন্য প্রাণীদের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। ডাস্টবিন ঘাঁটার মতো সাহস থাকতে হবে, মানুষের এলাকায় ঘুরতে হবে, কিন্তু আবার মানুষের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা যাবে না।
লেশ বলেন, 'যদি কোনো প্রাণী মানুষের কাছাকাছি বাস করে, তবে তাকে যথেষ্ট 'ভদ্র' হতে হবে। আর টিকে থাকার এই চাপটা বেশ তীব্র।'
লেখকরা বলেছেন, এই বিষয়টি 'ডমেস্টিকেশন সিনড্রোম ফেনোটাইপ' বা গৃহপালিত হওয়ার লক্ষণের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এই সিনড্রোমের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—লেজ কুঁকড়ে যাওয়া, কান ঝুলে পড়া, গায়ের রং ফিকে হয়ে যাওয়া, মস্তিষ্ক ছোট হওয়া এবং মুখের হাড় ছোট হয়ে আসা।
আমাদের অতি পরিচিত পোষা প্রাণী, যেমন নেকড়ে থেকে আসা কুকুরের মধ্যেও বিবর্তনের সময় ঠিক এই বৈশিষ্ট্যগুলোই দেখা গিয়েছিল।
গবেষণার লেখকরা একটি প্রচলিত ধারণা ভুল প্রমাণ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাধারণত মনে করা হয়, মানুষ বন্য প্রাণীকে ধরে এনে বা প্রজনন করিয়ে গৃহপালিত করেছে। কিন্তু লেখকরা বলছেন, এই ধারণা ভুল হতে পারে।
তাদের মতে, এই প্রক্রিয়াটি হয়তো আরও অনেক আগেই প্রাকৃতিকভাবে শুরু হয়, যখন প্রাণীরা মানুষের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে।
লেখকরা লিখেছেন, 'যাদের মধ্যে পালিয়ে যাওয়ার (বা লড়াই করার) প্রবণতা কম, তারাই এই পরিবেশে সবচেয়ে ভালো টিকে থাকে। অর্থাৎ, গৃহপালিত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়টি মানুষের হাত ধরে নয়, বরং বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেই ঘটে।'
