ইউরোপের আপত্তি সত্ত্বেও মার্কিন পরিকল্পনায় ‘সৎভাবে’ কাজ করতে আগ্রহী জেলেনস্কি
ইউরোপের আপত্তি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনায় 'সৎভাবে' কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বৃহস্পতিবার কিয়েভে মার্কিন আর্মি সেক্রেটারি ড্যানিয়েল ড্রিসকলের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এ অবস্থান জানান।
তবে ইউরোপীয় মিত্ররা এ পরিকল্পনায় রাশিয়ার পক্ষে শাস্তিমূলক ছাড় দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
রয়টার্সের দেখা ওই মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিয়েভকে পুরো দনবাস অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে এবং সামরিক বাহিনীকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিমাণে ছোট করতে হবে। এই ধরনের পদক্ষেপ ইউক্রেনের মিত্রদের কাছে আত্মসমর্পণের সমান বলে বিবেচিত।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ইউক্রেনকে সেনাবাহিনী ৬ লাখ সদস্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এবং দেশটি 'দৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা' পাবে, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
পরিকল্পনায় রাশিয়ার প্রতি বেশ কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন: ক্রিমিয়া, লুহানস্ক ও দোনেৎস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাস্তবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীকে দোনেৎস্কের কিছু এলাকা থেকে সরে আসার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'এই পরিকল্পনা জেলেনস্কির প্রশাসনের অন্যতম শীর্ষ সদস্য রুস্তেম উমেরোভের সঙ্গে আলোচনার পর তৈরি করা হয়েছে। কিছু সংশোধনের পর উমেরোভ এটির অধিকাংশে সম্মতি দেন এবং পরে প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করেন।'
জেলেনস্কির দপ্তর জানায়, তিনি পরিকল্পনার খসড়া পেয়েছেন।
কিয়েভে মার্কিন আর্মি সেক্রেটারি ড্যানিয়েল ড্রিসকলের সঙ্গে বৈঠকের পর জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লেখেন, 'ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষের পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবে এবং কিয়েভ 'গঠনমূলক, সৎ ও দ্রুত' কাজ শুরুতে প্রস্তুত।
জেলেনস্কির দপ্তর পরিকল্পনার ২৮ দফা বিষয়বস্তু নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি। তবে জানায়, তিনি 'জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতিগুলো তুলে ধরেছেন।'
এতে আরও বলা হয়, 'আগামী দিনগুলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্ভাবনা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় মূল পয়েন্টগুলো নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে চান।'
রয়টার্সের দেখা পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপের মধ্যে একটি অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
এতে উল্লেখ রয়েছে, ন্যাটো আর সম্প্রসারণ করবে না এবং ইউক্রেনে সেনা মোতায়েন করবে না। রাশিয়াকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে ও ক্ষেত্রভেদে প্রত্যাহার করা হবে।
এছাড়া রাশিয়াকে জি-৮–এ ফিরতে আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি, প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার এবং আর্কটিকে রেয়ার আর্থ খনিজ উত্তোলন বিষয়ে চুক্তি করবে।
হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ প্রায় এক মাস ধরে নীরবে এই পরিকল্পনায় কাজ করছেন এবং ট্রাম্প এটি সমর্থন করেন।
তিনি বলেন, , পাঁচ বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধের বাস্তবতা সামনে রেখে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক সমাধান খুঁজতেই এ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আরোচনা হয়নি।
তবে তারা ইঙ্গিত দেন, কিয়েভকে শাস্তিমূলক ছাড় চাপিয়ে দেওয়ার দাবি তারা মানবে না।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, 'ইউক্রেনীয়রা শান্তি চায়; তবে তা হতে হবে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই। কিন্তু শান্তি কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ হতে পারে না।'
জেলেনস্কির দপ্তর জানায়, ড্রিসকল বৃহস্পতিবারই তার কাছে পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করেন।
আরও কয়েকটি সূত্র রয়টার্স ও অন্যান্য গণমাধ্যমকে জানায়, এই পরিকল্পনা মূলত উইটকফ এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভের মধ্যে ব্যাকচ্যানেল আলোচনার ফল।
বুধবার এক্স-এ রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'দুই পক্ষের মতামত নিয়ে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য ধারণার তালিকা তৈরি করতে কাজ চালিয়ে যাবে' এবং শান্তির জন্য কিয়েভ ও মস্কো উভয়কেই ছাড় দিতে হবে।
মার্কিন আর্মির জনসংযোগ প্রধান কর্নেল ডেভ বাটলার বলেন, ড্রিসকলের সঙ্গে একান্ত বৈঠক এবং পরে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় জেলেনস্কি দ্রুত সমঝোতা ও পরিকল্পনা স্বাক্ষরের দিকে অগ্রসর হতে সম্মতি জানান।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করতে চায় যে 'পরিকল্পনাটি ইউক্রেনের জনগণের জন্য ভালো হবে'।
এই সময়টি কিয়েভের জন্য কঠিন, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনী পিছিয়ে আছে এবং দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে সরকার চাপে রয়েছে। বুধবার পার্লামেন্ট দুই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছে।
এদিকে মস্কো জানায়, তারা নতুন কোনো মার্কিন উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না, শুধু যোগাযোগ আছে।
তিনি জানান, পুতিন আগস্টে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে যে অবস্থান তুলে ধরেছেন, রাশিয়া এখনও সেই অবস্থানেই আছে এবং শান্তিচুক্তিতে সংঘাতের 'মূল কারণ' সমাধান করতে হবে।
চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে। শীত ঘনিয়ে আসায় রুশ বাহিনী ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা ও শহরগুলোতে হামলা বাড়িয়েছে।
ক্রেমলিন জানায়, পুতিন বৃহস্পতিবার রুশ বাহিনীর 'ওয়েস্ট' গ্রুপিংয়ের কমান্ড পোস্ট পরিদর্শন করেন এবং জেনারেল স্টাফ প্রধান ভ্যালেরি জেরাসিমভসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
জেরাসিমভ পুতিনকে জানান, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের কুপিয়ানস্ক শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এটি কেন্দ্রীয় ও পূর্ব ইউক্রেনের দিকে অগ্রযাত্রার জন্য মস্কোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, রুশ বাহিনী কুপিয়ানস্ক বা পূর্ব ইউক্রেনের পোকরোভস্ক রেলহাবের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে- এ দাবি সত্য নয়
রয়টার্স এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
যদিও রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, তাদের সেনারা পোকরোভস্কের দক্ষিণ অংশে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে এবং আগুনে পুড়ে যাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সারির ফাঁকা রাস্তায় টহল দিচ্ছে।
