সাইকেল থেকে নগদ টাকা উৎকোচ, ভারতের রাজ্যগুলো নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির চড়া মূল্যের বোঝা বইতে পারবে?
ভারতে এখন নির্বাচনে জয়ের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে বিনামূল্যে দেওয়া বিভিন্ন সুবিধা বা উপহার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজ্যগুলো কি এই বিপুল খরচের বোঝা সামলাতে পারবে?
বিশ্বের বৃহত্তম এই গণতন্ত্রের জমজমাট রাজনৈতিক অঙ্গনে বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের উপহারের ধরন বদলেছে। টেলিভিশন সেট থেকে শুরু করে সাইকেল, এমনকি কখনো কখনো সোনার গয়না দিয়েও ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে, জনকল্যাণমূলক অর্থনীতি এবং প্রাক-নির্বাচনি জনতোষণবাদের মধ্যকার সূক্ষ্ম রেখাটি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, নগদ অর্থ দেয়া, বিশেষ করে নারীদের লক্ষ্য করে দেওয়া আর্থিক সহায়তা, সব দলের জন্যই নির্বাচনে জেতার একটি জনপ্রিয় কৌশল হয়ে উঠেছে।
গত সপ্তাহে ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিশাল জয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে রাজ্যের নারীদের জন্য ১০,০০০ রুপি (প্রায় ১১২ ডলার) নগদ সহায়তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক নারী ভোট দিতে এসেছিলেন।
গত বছর মহারাষ্ট্রের মতো অন্যান্য রাজ্যেও নির্বাচনের আগে মোদীর দল নারীকেন্দ্রিক একই ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প চালু করেছিল। বিরোধী দলগুলোও বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনের আগে একই রকম প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক
অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজের মতো বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের উপহারের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদিও 'দরকারি' এবং 'অপচয়মূলক' উপহারের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সত্যিটা হলো, নির্বাচনের সময়ের প্রতিশ্রুতি আদায় করেই ভারতের দরিদ্ররা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কাছ থেকে কিছু পায়।
অন্যদিকে, যদিও তার নিজের দলও একই কাজ করে, মোদী অতীতে এই সংস্কৃতির বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এমনকি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও ২০২৩ সালে নির্বাচনের সময় এই ধরনের 'অযৌক্তিক বিনামূল্যের জিনিস' বিতরণের ওপর লাগাম টানার চেষ্টা করেছিল।
যদিও নির্বাচনী টোপ হিসেবে বিনামূল্যের জিনিসের ব্যবহারের বদলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে মোটামুটি সবাই একমত, কিন্তু ভারতের নির্বাচনগুলো ক্রমশ এমন সব সাধ্যাতীত, ভোটকেন্দ্রিক খয়রাতির অর্থনীতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, যা রাজ্যগুলোর পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব।
অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ চাপ
এমকে গ্লোবালের গবেষণা অনুযায়ী, বিহার মারাত্মক রাজস্ব চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজ্যটির আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতির পরিমাণ তার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
তা সত্ত্বেও, রাজ্যটি নির্বাচনের আগে জিডিপির ৪ শতাংশের সমান মূল্যের বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণা করেছে, যা রাজ্যের নিজস্ব ব্যয়ের চেয়েও বেশি। এই অর্থ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী দীর্ঘমেয়াদী সম্পদে ব্যয় করা যেত, যা রাজ্যের উন্নয়নে সহায়তা করত।
এমকে গ্লোবালের মতে, লাগামহীন প্রাক-নির্বাচনি জনতোষণবাদ চর্চা করা রাজ্যগুলোর তালিকায় বিহার শুধু একটি উদাহরণ মাত্র।
সংস্থাটি বলেছে, 'এমনকি ভালো (রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিচক্ষণ) রাজ্যগুলোও এখন বিনামূল্যের উপহারের চাপের কবলে পড়েছে।' এর ফলে, রাজ্যের বাজেট-বহির্ভূত ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য জিডিপির ৩ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতির যে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, এখন সেটিই সর্বনিম্ন সীমায় পরিণত হয়েছে।
কিছু সমীক্ষা বলছে, ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২১টি রাজ্যই এই ৩ শতাংশ ঘাটতির সীমা অতিক্রম করেছে, যার অন্যতম কারণ হলো নির্বাচনের আগে করা অতিরিক্ত ব্যয়।
এই ধরনের ব্যয় যে টেকসই নয়, তার একটি বড় উদাহরণ হলো মহারাষ্ট্রে ভারতীয় জনতা পার্টি-নেতৃত্বাধীন জোটের 'লাডকি বহিন' (স্নেহের বোন) আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। এমকে গ্লোবালের মতে, এই প্রকল্পের কারণে মহারাষ্ট্র রাজ্যের ঘাটতি ০.৪% বেড়ে গিয়েছিল। এর ফলে, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সরকার কিছু প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতা
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) রাজ্য-স্তরের ঋণের ওপর এই ধরনের ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান বোঝাকে একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আরবিআই-এর মতে, যদিও গত দশকের তুলনায় ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে ভারতীয় রাজ্যগুলোর সামগ্রিক ঋণ জিডিপির প্রায় ২৮.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, এটি এখনও সুপারিশকৃত ২০ শতাংশের সীমার অনেক উপরে রয়েছে। এর সাথে ভর্তুকির বোঝা বাড়ায় নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।
আরবিআই তার ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, 'চাপের একটি নতুন ক্ষেত্র হলো ভর্তুকি খাতে ব্যয়ের তীব্র বৃদ্ধি, যার পেছনে রয়েছে কৃষিঋণ মকুব, বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত পরিষেবা (যেমন বিদ্যুৎ, পরিবহন, গ্যাস সিলিন্ডার) এবং কৃষক, যুবক ও নারীদের নগদ অর্থ প্রদান।'
'রাজ্যগুলোর উচিত তাদের ভর্তুকি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা, যাতে এই ধরনের ব্যয় আরও উৎপাদনশীল খাতের ব্যয়কে বাধাগ্রস্ত না করে।'
এই সতর্কতা এমন এক সময়ে এলো যখন বেসরকারি খাত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কারখানাগুলোতে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকছে এবং সরকার নিজেও অবকাঠামোতে মূলধনী ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এর পরিবর্তে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভোগব্যয় বাড়ানোর জন্য সরকার কর ছাড় এবং বিভিন্ন খয়রাতির দিকে ঝুঁকছে।
কিন্তু বিহারে বিনামূল্যের উপহারের এমন বিপুল সাফল্যের পর এবং সামনে আরও কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচন থাকায় এই সতর্কবাণীতে কেউ কান দেবে বলে মনে হয় না।
এমকে গ্লোবালের অর্থনীতিবিদ মেধাবী অরোরা এবং হর্ষল প্যাটেল বলেছেন, 'বিহারের এই নির্বাচনী ফলাফল গত দুই বছরে রাজ্যগুলোতে বয়ে যাওয়া বিনামূল্যের উপহারের প্রতিশ্রুতির ঢেউকে আরও শক্তিশালী করেছে। আগামী বছর তামিলনাড়ু, কেরালা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তাই আশা করা যায় যে, অর্থনীতির তলানিতে পৌঁছানোর এই প্রতিযোগিতা চলতেই থাকবে।'
