যুক্তরাজ্যের নতুন কঠোর আশ্রয়নীতি: কীভাবে প্রভাবিত হবেন শরণার্থীরা?
শরণার্থী নীতিতে বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। নতুন নিয়মে কেউ যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পেলেও স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করতে অপেক্ষা করতে হবে ২০ বছর।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দেশটির বর্তমান আশ্রয়ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তার মতে, অবৈধ অভিবাসন 'দেশকে বিভক্ত করে ফেলছে।'
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, শরণার্থীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বয়ংক্রিয় অধিকার বাতিলের পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধাও সীমিত করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্য ইউরোপের অন্যতম কঠোর অভিবাসন নীতির দেশে পরিণত হবে।
শরণার্থীদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হোটেলগুলোর বাইরে তীব্র বিক্ষোভ এবং লন্ডনে অভিবাসনবিরোধী মিছিলের পর শাবানা মাহমুদ এই নতুন পরিকল্পনার কথা জানান। একইসাথে তিনি ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া বন্ধ করতে এবং পরিস্থিতি নিরাপদ হলে শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য নতুন পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসলেও রাজনৈতিক বিতর্ক থামছে না। অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস) এর তথ্যমতে, ২০১১ সাল থেকে দেশটিতে নিট অভিবাসীর (আসা ও যাওয়ার সংখ্যার পার্থক্য) সংখ্যা বার্ষিক প্রায় ২ লাখ থেকে ৩ লাখের মধ্যে ছিল।
তবে, ২০২০ সালে ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাজ্যে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ওএনএস-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে নিট অভিবাসীর সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজারে পৌঁছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে নিট অভিবাসন অর্ধেকে নেমে ৪ লাখ ৩১ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এর প্রধান কারণ স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভিসার সংখ্যা কমানো।
এদিকে, ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় আসা শরণার্থীদের নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হলেও, তারা মোট অভিবাসীর একটি ক্ষুদ্র অংশ। যেমন, ২০২৪ সালে হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন ৩৬,৮১৬ জন।
গত বছর মোট ১ লাখ ৮ হাজার ১৩৮ জন আশ্রয়ের আবেদন করেন। এদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ছোট নৌকায় এসেছিলেন। অর্থাৎ, বেশিরভাগ আশ্রয় আবেদন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই করা হয়েছে।
অভিবাসীর সংখ্যা কমলেও ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ওপর অসন্তোষ কমেনি। আগস্টে ইউগভ (YouGov) এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন অভিবাসনবিরোধী দল 'রিফর্ম ইউকে' শরণার্থীদের বিষয়টি লেবার পার্টির চেয়ে ভালোভাবে সামলাতে পারবে। লেবার পার্টির পক্ষে মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন।
কী কী পরিবর্তন আসছে?
প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে নাগরিকত্ব পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায়। এতদিন শরণার্থীরা যুক্তরাজ্যে পাঁচ বছর থাকার পর স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা 'ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন' এর জন্য আবেদন করতে পারতেন, শেষ পর্যন্ত দেশটির নাগরিকত্বও পেতে পারতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে, এই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০ বছর পর্যন্ত করা হতে পারে।
শুধু তাই নয়, শরণার্থীদের প্রতি ৩০ মাস পর পর নিজেদের স্ট্যাটাস নবায়ন করতে হবে। এসময় সরকার খতিয়ে দেখবে, তাদের নিজ দেশের পরিস্থিতি নিরাপদ হয়েছে কি না। পরিস্থিতি উন্নত হলে তাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ডেনমার্ককে অনুসরণ করে। বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সরকারের নেতৃত্বাধীন ডেনমার্কে আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থা ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর।
ডেনমার্কে শরণার্থীদের সাধারণত দুই বছরের জন্য অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয় এবং মেয়াদ শেষ হলে কার্যত তাদের আবার আশ্রয়ের আবেদন করতে হয়।
এছাড়াও, যেসব শরণার্থী কাজ করে নিজেদের ভরণপোষণে সক্ষম, তাদের সরকারি আবাসন ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
অপরাধমূলক কাজে জড়ালে, দেশত্যাগের আদেশ অমান্য করলে বা অবৈধভাবে কাজ করলেও সহায়তা প্রত্যাহার করা হবে।
সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া
শরণার্থী অধিকার গোষ্ঠীগুলো সরকারের এই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছে। রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী এনভার সলোমন বলেন, 'নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ২০ বছরের অপেক্ষা মানুষকে নিরুৎসাহিত করার বদলে বছরের পর বছর ধরে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেবে।'
অন্যদিকে, বিরোধী দল লেবার পার্টির স্বরাষ্ট্র ছায়ামন্ত্রী ম্যাট ভিকার্স সরকারের এই পরিকল্পনাকে 'লোকদেখানো' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপ
এছাড়াও আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। পরিচয়পত্র ছাড়া আসা শরণার্থীদের বয়স নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা হবে, যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর নির্ভুলতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পাশাপাশি, নাগরিকদের ফেরত নিতে সহযোগিতা না করায় অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া এবং কঙ্গোর ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের 'পারিবারিক জীবনের অধিকার' সংক্রান্ত ধারার ব্যাখ্যা সীমিত করা হবে, যেখানে 'পরিবার' বলতে শুধু বাবা-মা বা সন্তানকে বোঝানো হবে।
কারা ছাড় পাচ্ছেন
এই কঠোর নীতির মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। রাশিয়ার আগ্রাসনের শিকার ইউক্রেনের শরণার্থীরা একটি বিশেষ অস্থায়ী প্রকল্পের অধীনে যুক্তরাজ্যে থাকতে পারবেন এবং তারা এই ২০ বছরের নিয়মের আওতায় পড়বেন না।
যুদ্ধ শেষে তাদের দেশে ফিরতে উৎসাহিত করা হবে। আফগানিস্তান এবং হংকংয়ের জন্যও বিশেষ পুনর্বাসন প্রকল্প চালু থাকছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ইংলিশ চ্যানেল হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা কমাতে নতুন 'নিরাপদ ও বৈধ' পথ তৈরির আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো বলছে, সরকারের কঠোর নীতির কারণেই মানুষ অবৈধ পথে আসতে বাধ্য হয়। তাদের মতে, পারিবারিক পুনর্মিলন বা কমিউনিটি স্পনসরশিপের মতো বৈধ পথ আরও প্রসারিত না করলে এই সংকট সমাধান হবে না।
যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, তারপরেও ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি অভিবাসন ইস্যুতে চাপের মুখে রয়েছে। জনমত জরিপেও দেখা গেছে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা কম।
এই পরিস্থিতিতেই সরকার এমন একগুচ্ছ কঠোর সংস্কার আনছে, যা দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
