রূপকথার গল্পগুলো হতে পারে আপনার ধারণার চেয়েও অনেক প্রাচীন
কয়েকশ বছর আগে ব্রাদার্স গ্রিম, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন এবং শার্ল পেরো'র মতো লেখকেরা রাজকন্যা, দুষ্ট দৈত্য, অন্ধকার বন, বিচিত্র সব মন্ত্র ও অপূর্ণ প্রেমের গল্পগুলোকে শিশুসাহিত্যের বইয়ে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু তারা রূপকথার যে গল্পগুলো লিখে রেখেছিলেন, সেগুলোর বয়স আসলে কত পুরোনো? নতুন এক গবেষণা বলছে, এসব গল্পের উৎপত্তি প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত গড়ায়।
রয়্যাল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় একজন লোককথাবিদ ও একজন নৃতত্ত্ববিদ দাবি করেছেন, "রাম্পেলস্টিল্টস্কিন" এবং "জ্যাক অ্যান্ড দ্য বিনস্টক"-এর মতো গল্পগুলো আসলে ধারণার চেয়েও অনেক পুরোনো। তারা বলছেন, এই ক্লাসিক গল্পগুলোর কিছু অংশ ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ বছর আগের। আগে যে ধারণা হতো, ব্রাদার্স গ্রিমের মতো রূপকথার সংকলকরা কয়েকশো বছরের প্রাচীন গল্পগুলো সংগ্রহ করেছেন— বিশেষজ্ঞদের এ বক্তব্য সেই দাবিকে খণ্ডন করে।
ইতিহাসভিত্তিক তথ্য দিয়ে রূপকথার গল্পের বয়স নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ এসব গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই প্রচলিত ইতিহাস বা নৃতত্ত্বের পদ্ধতিতে এর উৎস নির্ণয় কঠিন। গবেষকরা তাই জীববিজ্ঞানের "ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ" পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন—যা সাধারণত জীবের বিবর্তন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে তারা ভাষা, জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির জটিল শিকড় অনুসরণ করে ২৭৫টি রূপকথার গল্পের বংশলতিকা তৈরি করেন।
গবেষকরা ব্যবহার করেছেন অ্যার্নে-থম্পসন-উথার ক্লাসিফিকেশন অব ফোক টেলস— নামের একটি সূচক, যেখানে গল্পগুলোকে "অবাধ্য স্ত্রী অনুগত হতে শেখে" বা "মানুষ ও দৈত্যের অংশীদারিত্ব"-এর মতো ধরণে ভাগ করা হয়। এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে তারা ৫০টি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীতে গল্পগুলোর উপস্থিতি অনুসরণ করে ৭৬টি গল্পের পূর্বসূরি নির্ধারণে সক্ষম হন।
এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক গল্পই অন্য প্রাচীন গল্পের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ গল্পের উৎস পাওয়া গেছে অত্যন্ত প্রাচীন সময় থেকে। যেমন—"জ্যাক অ্যান্ড দ্য বিনস্টক"-এর উৎস ধরা পড়েছে পশ্চিম ও পূর্ব ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার বিভাজনের সময়, অর্থাৎ ৫,০০০ বছর আগে। আর "দ্য স্মিথ অ্যান্ড দ্য ডেভিল" নামের এক গল্পের বয়স প্রায় ৬,০০০ বছর।
এই ফলাফল আংশিকভাবে সমর্থন করে উইলহেল্ম গ্রিমের দীর্ঘদিন উপেক্ষিত তত্ত্ব, যেখানে তিনি বলেছিলেন, সব ইন্দো-ইউরোপীয় সংস্কৃতির মধ্যে একটি সাধারণ গল্প ঐতিহ্য আছে। তবে সবাই এই গবেষণার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। সায়েন্স নিউজের ক্রিস সামোরে লিখেছেন, অনেক লোককথাবিদ প্রশ্ন তুলেছেন—"দ্য স্মিথ অ্যান্ড দ্য ডেভিল" কি সত্যিই ব্রোঞ্জ যুগে ছিল, যখন 'ধাতু নির্মাতা' অর্থে কোনো শব্দই ছিল না?
তাহলে কি মৌখিক ইতিহাসের উৎস জানতে ঐতিহাসিক দলিল ও লিখিত সূত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? গবেষক দল বলছে, "একদমই না।" তাদের ভাষায়, "এটি কোনোভাবেই সাহিত্যিক রেকর্ড বিশ্লেষণের গুরুত্ব কমিয়ে দেয় না; বরং মৌখিক ঐতিহ্যের বিকাশ বুঝতে এটি এখনো অপরিহার্য।"
তাছাড়া, রূপকথা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষা বা সংস্কৃতিতে গ্রহণের সময় অনেক রকম পরিবর্তন তাতে চলে আসতে পারে। তাই গবেষকেরাও এখনো বইয়ের পাতার গল্পগুলোর শেকড় খুঁজে চলবেন।
এরই মধ্যে হয়তো আপনি আপনার পুরোনো গল্পের বইটা হাতে নিয়ে ভাবতে পারেন—এই একই গল্প হয়তো হাজার বছর আগে কেউ এক আগুনের পাশে বসে বলছিল ছোট্ট কোনো শ্রোতাকে।
