এশিয়াজুড়ে সার্কুলার ইকোনমি প্রসারে যাত্রা শুরু করল ‘সাচিন’
এশিয়াজুড়ে 'সার্কুলার ইকোনমি' (চক্রাকার অর্থনীতি) সংক্রান্ত সমাধানগুলো এগিয়ে নিতে গবেষণাভিত্তিক থিংক ট্যাংক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে 'সোসাইটি ফর এশিয়ান সার্কুলার ইনোভেশন নেটওয়ার্ক' (সাচিন)।
শনিবার (১৬ মে) ঢাকার বিসিআই কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্যে সাচিনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, 'এশিয়াজুড়ে গবেষণা, উদ্ভাবন, নীতি-নির্ধারণী সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য '
তিনি আরও বলেন, 'আজ আমরা কেবল একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করছি না; বরং আমরা একটি নতুন যাত্রা, নতুন চিন্তাধারা এবং একটি নতুন দায়িত্বের সূচনা করছি।'
সাচিনের স্লোগান হচ্ছে— 'থিংক সার্কুলার। ইনোভেট রিজিওনালি। ইমপ্যাক্ট গ্লোবালি।'
সংগঠনটি প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি খাত টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করলেও পর্যায়ক্রমে কৃষি, উৎপাদন শিল্প, নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট, স্বাস্থ্যসেবা, প্লাস্টিক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আর্থিক সেবা, পানি ও স্যানিটেশন এবং জাহাজ নির্মাণসহ বিস্তৃত শিল্পখাতে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউরোচ্যাম বাংলাদেশের চেয়ারপারসন নুরিযা লোপেজ, সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসএবিসিসিআই) সভাপতি আশরাফুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন, অর্গানাইজেশন ফর রিডাকশন অফ কার্বন ফুটপ্রিন্ট ইন বাংলাদেশের সভাপতি জেড এম গোলাম নবী এবং এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেন।
অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন সাচিনের নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, সহ-সভাপতি শিয়াবুর রহমান শিহাব, সাধারণ সম্পাদক শাফায়াত হোসেন, উপদেষ্টা এ কে এম জাহিদুল আলম, যুগ্ম সম্পাদক শেখ মো. রেজভী নেওয়াজ, কোষাধ্যক্ষ স্থপতি মো. নাজমুল সাকিব এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহফুজুর রহমান।
নুরিযা লোপেজ তার বক্তব্যে বলেন, 'বাংলাদেশ এখন আর চক্রাকার অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নকে কেবল বিশ্ববাজারের চাপিয়ে দেওয়া কমপ্লায়েন্স বা শর্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মান্ধাতা আমলের উৎপাদন মডেল ইতোমধ্যেই দেশের ভবিষ্যৎ ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি আরও বলেন, 'সার্কুলারিটি বা চক্রাকার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। এটি দেশটিকে একটি টেকসই
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, ইউরোপে রপ্তানি শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।'
এশিয়ার ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত ও জলবায়ু চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে প্রীতি চক্রবর্তী জানান, প্রচলিত 'পণ্য তৈরি, ব্যবহার ও বর্জন'—এই অর্থনৈতিক মডেল এখন আর টেকসই নয়। তিনি এমন একটি চক্রাকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর জোর দেন যেখানে সম্পদের দক্ষ পুনব্যবহার নিশ্চিত হবে, বর্জ্য কমিয়ে আনা হবে এবং পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শিল্প প্রবৃদ্ধিও ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবেশগত টেকসই অবস্থার সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।'
তিনি আরও বলেন, 'যদি পানি দূষিত হয়, তবে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বায়ু দূষিত হলে শিশু ও বৃদ্ধরা কষ্ট পায়। টেকসই উন্নয়ন এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি এখন অপরিহার্য।'
সাচিন জানিয়েছে, তারা মূলত চারটি প্রধান ক্ষেত্রে কাজ করবে— গবেষণা ও উন্নয়ন, নীতি-কৌশল প্রণয়ন ও সমর্থন, নেটওয়ার্কিং ও সহযোগিতা এবং জ্ঞান প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধি।
সংগঠনটি তাদের ভবিষ্যতের কিছু উদ্যোগের পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান সাসটেইনেবিলিটি ডেটা অ্যান্ড এআই পোর্টাল, সার্কুলার টেক অ্যান্ড ইনোভেশন মার্কেটপ্লেস, সাচিন একাডেমি অ্যান্ড সার্টিফিকেশন, সার্কুলার সলিউশনস ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং এশিয়ান সার্কুলার ইকোনমি অ্যান্ড ক্লাইমেট সামিট।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গবেষক, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, শিল্প প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সাচিন জানায়, তাদের লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)— বিশেষ করে এসডিজি ১২ (পরিমিত ভোগ ও উৎপাদন), এসডিজি ১৩ (জলবায়ু পদক্ষেপ) এবং এসডিজি ১৭ (লক্ষ্য অর্জনে অংশীদারিত্ব)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পরিশেষে, এশিয়ার জন্য একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং চক্রাকার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সরকার, শিল্প খাত, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
