১ লাখ বছর ধরে ‘নিষ্ক্রিয়’ মনে করা গ্রিসের বিশাল আগ্নেয়গিরিতে জমছে ম্যাগমা
গ্রিসের মেথানা আগ্নেয়গিরিকে শত সহস্র বছর ধরে নিষ্ক্রিয় বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে নতুন গবেষণায় জানা গেছে, এর নিচে বিপুল পরিমাণ ম্যাগমা জমা হচ্ছে।
এথেন্স থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরিটি গত ১ লাখ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো লাভা উদ্গিরণ, বিস্ফোরণ বা ছাইয়ের মেঘ সৃষ্টি করেনি, ফলে এটিকে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় হিসেবে ধরা হয়েছিল।
তবে গবেষকরা এখন দেখতে পেয়েছেন, বাইরে থেকে নিষ্ক্রিয় মনে হলেও, আগ্নেয়গিরিটির গভীরে থাকা ম্যাগমা চেম্বারগুলোতে ধীরে ধীরে বিপুল পরিমাণ ম্যাগমা জমা হচ্ছে। এর ফলে 'নীরব' আগ্নেয়গিরিগুলোর ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
গবেষণাটি সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে গবেষকরা লিখেছেন, 'সাম্প্রতিক কোনো উদ্গিরণ না থাকলেও নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর ওপর নজরদারি চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভূত্বকের ভেতরে ম্যাগমা ঠান্ডা হওয়ার সময় যে ক্ষুদ্র জিরকন স্ফটিক তৈরি হয়, সেগুলো বিশ্লেষণ করেছেন।
এই স্ফটিকগুলোকে প্রাকৃতিক 'টাইম ক্যাপসুল' হিসেবে ধরা হয়, কারণ এগুলো কবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছে সেই তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে।
ইটিএইচ জুরিখের আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ অলিভিয়ার বাখমান বলেন, 'জিরকন স্ফটিকগুলোকে আমরা ছোট ছোট ফ্লাইট রেকর্ডারের মতো ভাবতে পারি। বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভূত্বকের ম্যাগমা আঁধারের ভেতরে শীতল হওয়ার সময় তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র 'জিরকন' স্ফটিকগুলো পরীক্ষা করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা যা শিখেছি তা হলো—আগ্নেয়গিরিগুলো হাজার হাজার বছর ধরে ভূপৃষ্ঠে কোনো লক্ষণ না দেখিয়েও ভূগর্ভে "শ্বাস-প্রশ্বাস" নিতে পারে।'
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীর্ঘ ১ লাখ বছরের নীরব সময়কাল থাকা সত্ত্বেও মেথানার নিচে প্রায় অবিরাম ম্যাগমা তৈরি হয়েছে।
ড. বাখমান বলেন, 'গ্রিস, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকা, জাপানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আগ্নেয়গিরি ঝুঁকি মূল্যায়নকারী কর্তৃপক্ষের জন্য এর অর্থ হলো—যেসব আগ্নেয়গিরি হাজার হাজার বছর ধরে শান্ত থাকলেও মাঝে মাঝে ম্যাগমার অস্থিরতার লক্ষণ দেখায়, সেগুলোর ঝুঁকির মাত্রা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।'
গবেষকদের মতে, এই ১ লাখ বছরের সময়রেখার মধ্যে আগ্নেয়গিরির নিচে জিরকন বৃদ্ধির পরিমাণ তুঙ্গে পৌঁছেছিল, যা তীব্র ম্যাগমা সক্রিয়তার স্পষ্ট প্রমাণ দেয়।
মেথানার উপরের ম্যাগমা চেম্বারে যে ম্যাগমা সরবরাহ হচ্ছে, তা অত্যন্ত জলসমৃদ্ধ—যা গবেষকদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মেথানার নিচে থাকা ম্যান্টল বা ভূস্তর সমুদ্রতলের পলি এবং বিপুল পরিমাণ জল দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হওয়ার কারণে এমনটি হতে পারে।
এই প্রক্রিয়াকে তারা 'হাইড্রেশন' বা জলীয়করণ বলে উল্লেখ করেছেন, যা ম্যান্টলকে প্রভাবিত করে, স্ফটিকায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে এবং ম্যাগমা উৎপাদনকে আরও কার্যকর করে তোলে।
গবেষকদের মতে, এ ধরনের জলসমৃদ্ধ ম্যাগমার দ্রুত স্ফটিকায়ন তুলনামূলক কম উদ্গিরণের কারণ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষণার আরেক লেখক রাজভান-গ্যাব্রিয়েল পোপা বলেন, 'আমরা মনে করি, অনেক সাবডাকশন জোনের আগ্নেয়গিরি পর্যায়ক্রমে অত্যন্ত জলসমৃদ্ধ আদিম ম্যাগমা দ্বারা পুষ্ট হয়—যা এখনো বৈজ্ঞানিক মহলে পুরোপুরি স্বীকৃত নয়।'
গবেষণার ফলাফল বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আগ্নেয়গিরি শান্ত থাকলেই সেটি নিঃশেষ হয়ে গেছে—এমনটা ভাবা ভুল।
বরং এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে, ভেতরে ভেতরে একটি বড় এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক ম্যাগমা সিস্টেম তৈরি হচ্ছে, যা আগ্নেয়গিরির ঝুঁকি মূল্যায়নে 'গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব' ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের আপাতদৃষ্টিতে নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলো হাজার হাজার বছর নীরব থাকার পরও ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে এবং হঠাৎ করেই অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রূপ নিতে পারে।
