ইউরোপ যেভাবে উদ্ভাবনের পথ আটকে দেয়
পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর কাছে গণহারে কর্মী ছাঁটাই করার দুটো রাস্তা খোলা আছে। প্রথমটি হলো আমেরিকান রাস্তা, যেখানে বস হঠাৎ করে জুম কলে শত শত কর্মীকে ডেকে পাঠান, যাদের কেউই আঁচ করতে পারেন না কী হতে চলেছে। এরপর তাদের হাতে কয়েক মাসের বেতন ধরিয়ে দিয়ে লোক দেখানোভাবে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানানো হয় (আর হ্যাঁ, দুপুর হওয়ার আগেই ডেস্ক খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়)।
অন্যদিক, ইউরোপের রাস্তাটা অনেক প্যাঁচানো। যে কোম্পানিগুলো গণছাঁটাই করতে চায়, তাদের প্রথমে ইউনিয়নগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনায় বসতে হয়; জার্মানিতে তো ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা কোম্পানির বোর্ডেই বসেন। এরপর একটি সামাজিক পরিকল্পনা বা 'প্ল্যান সোশ্যাল' তৈরি করা হয়। এর পরেই শুরু হয় ধর্মঘট, যা একরকম অবধারিত। এতে নাক গলান এবং কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টি করেন যাতে তারা মূল পরিকল্পনার চেয়ে কম কর্মী ছাঁটাই করে, অথবা ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের নতুন প্রশিক্ষণের খরচ দেয়।
ছাঁটাইয়ের আসল খেসারত কত দিতে হবে, তা বোঝা যায় বহু বছর পর, যখন শ্রম আদালত এই বিষয়ে রায় দেয়। আর এই পুরো সময়টায় ওই কোম্পানি নতুন করে কর্মী নিয়োগ করতে পারে না, কারণ সেরকম করলে পুরোনো ছাঁটাই হওয়া কর্মীদেরই আবার ফিরিয়ে আনতে হতে পারে।
প্রথম দর্শনে ইউরোপীয় ব্যবস্থাটিকে অনেক বেশি মানবিক মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যিটা হলো, কর্মী ছাঁটাইয়ের এই প্রক্রিয়ার এমন কিছু খেসারত আছে যা চোখে দেখা যায় না। ব্যাপারটা শুধু ছাঁটাইয়ের খরচ বা ঝামেলার নয় যা কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী লাভের ওপর প্রভাব ফেলে। বরং, আসল সমস্যা হলো একসাথে বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করাটা এতটাই কঠিন—যা কর্পোরেট দুনিয়ার এক রূঢ় বাস্তবতা—যে ইউরোপের বড় বড় কোম্পানিগুলো উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বাজি ধরা থেকে একশো হাত দূরে থাকে।
বিশেষ করে, যুগান্তকারী কোনো আবিষ্কারে (যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চালকবিহীন গাড়ির মতো অত্যাধুনিক জিনিস, যা মূলত সিলিকন ভ্যালি থেকেই আসে) বিনিয়োগ করতে হলে বড় কোম্পানির এই ক্ষমতা থাকা দরকার যে তারা প্রথমে হাজার হাজার কর্মী নিয়োগ করবে, এবং প্রকল্প ব্যর্থ হলে তাদের বেশিরভাগকে ছাঁটাই করে দেবে। ইউরোপে পুনর্গঠনের খরচ এতটাই বেশি যে এই ধরনের বিনিয়োগের কথা ভাবাই যায় না—যার ধাক্কা গিয়ে লাগে মহাদেশের অর্থনীতির ওপর, যা একেবারে সর্বনাশ ডেকে আনে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাক্তন কর্মকর্তা ও বর্তমান প্রযুক্তি উদ্যোক্তা অলিভিয়ের কস্ট বলেন, 'কর্মী ছাঁটাই যদি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়, যেমনটা ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই হয়, তখন মালিকপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ব্যবসায় টাকা ঢালতে ভয় পায়।' আরেকজন উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদ ইয়ান কোটানলেম-এর সাথে মিলে তিনি কোম্পানিগুলোর পুনর্গঠনের এই লুকানো খরচের হিসাব খুঁজে বের করেছেন।
আমেরিকায় একটি কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করলে তাদের ৭ মাসের বেতনের সমান খরচ হয়, এবং সেখানেই গল্প শেষ। কিন্তু জার্মানিতে ছাঁটাই করা প্রত্যেক কর্মীর জন্য খরচ হয় ৩১ মাসের বেতন, আর ফ্রান্সে ৩৮ মাস! ছাঁটাইয়ের ক্ষতিপূরণ আর ইউনিয়নকে খুশি রাখার জন্য দেওয়া সুবিধার বাইরেও সবচেয়ে বড় খরচ হলো অনুৎপাদনশীল কর্মীদের দিনের পর দিন ঘাড়ে বয়ে বেড়ানো, যাদের কোম্পানি আসলে বিদায় করতে চায়।
ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের জায়গা ধীরে ধীরে পূরণ করতে গিয়ে নতুন বিনিয়োগ বছরের পর বছর আটকে থাকে। আমেরিকান কোম্পানিগুলো যেখানে দ্রুত নতুন কোনো বিশাল সুযোগের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেখানে ইউরোপীয়রা প্রায় এক শতাব্দী আগে তৈরি আইনের কারণে ইউনিয়নগুলোর সাথে দর কষাকষি করতে গিয়ে সেই পুরোনো পাঁকে আটকে থাকে।
পুনর্গঠনের এই বিপুল খরচ আমেরিকা এবং ইউরোপের কর্তাব্যক্তিদের বিনিয়োগের ধরনটাই আমূল বদলে দেয়। ধরুন, একটা বড় কোম্পানি দশটা ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে টাকা ঢালল। খুব ভালোভাবে চললেও, তার মধ্যে আটটাই মুখ থুবড়ে পড়বে, যার ফলে বিশাল ছাঁটাই করতে হবে (যেমন, অ্যাপল বছরের পর বছর ধরে স্ব-চালিত গাড়ি তৈরির চেষ্টা করে গত বছর হাল ছেড়ে দেওয়ার সময় ৬০০ কর্মী ছাঁটাই করেছিল)। বাকি দুটো প্রকল্প যা লাভ এনে দেবে, তা বিনিয়োগের কয়েকগুণ বেশি। আমেরিকায় যেহেতু ব্যর্থতার খরচ অনেক কম, তাই যেকোনো কোম্পানির জন্য এটা একটা দারুণ বাজি। কিন্তু ইউরোপে কর্মী ছাঁটাই এতটাই ব্যয়বহুল যে এই ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মানেই হয় না।
এর প্রভাব ইউরোপের শিল্প জগতেও স্পষ্ট। ইউরোপের নামকরা কোম্পানিগুলো এখনো সেইসব জিনিসই বিক্রি করছে, যা তারা বিংশ শতাব্দীতে বিক্রি করত, শুধু সেগুলোকে একটু উন্নত করা হয়েছে—সেটা টারবাইন হোক, শ্যাম্পু, ভ্যাকসিন বা বিমান। এর বিপরীতে, আমেরিকার তারকা কোম্পানিগুলো বিক্রি করছে এআই চ্যাটবট, ক্লাউড কম্পিউটার আর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট।
কয়েক দশক ধরে ইউরোপ তার 'ধীরে ধীরে এগোনো, কিন্তু নিশ্চিত লাভের' উদ্ভাবনী মডেল নিয়ে বেশ ভালোই ছিল। শতবর্ষী কোম্পানিগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে সামান্য উন্নত টায়ার বা আরেকটু দ্রুতগতির ট্রেন বানিয়েও পয়সা কামানো যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যারা সাহসী বাজি ধরেছে, তাদের ঘরে লাভের পরিমাণ আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। যুগান্তকারী উদ্ভাবনের পথে হাঁটা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আজ ট্রিলিয়ন ডলারের দৈত্যে পরিণত হয়েছে। আর তাদের একটিও ইউরোপের নয়।
আমেরিকার এক চিপ কোম্পানি এনভিডিয়ার যা দাম, তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় ২০টা কোম্পানির সম্মিলিত দামের চেয়েও বেশি। হতে পারে এর কিছুটা বুদবুদের মতো, যা একদিন ফেটে গিয়ে আমেরিকার ব্যবসায় ধাক্কা দেবে। কিন্তু এই ধরনের সুপারস্টার শিল্পে কোনো কোম্পানি না থাকাই একটা বড় কারণ, যার জন্য সাম্প্রতিক দশকে ইউরোপীয়দের কর্মঘণ্টা প্রতি উৎপাদন আমেরিকার তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে।
ইউরোপের ব্যবসাগুলোর সামনে সমস্যার পাহাড়। দমবন্ধ করা নিয়মকানুন, আকাশছোঁয়া শক্তির দাম, চড়া কর এবং একটি বিভক্ত বাজার—এই বাধাগুলো সবারই জানা। কিন্তু খুব কম লোকই মনে করে যে শ্রম আইন এখানে একটা বড় সমস্যা। তাদের যুক্তি হলো, সফল কোম্পানিগুলোকে কেনই বা কর্মী ছাঁটাই করতে হবে? অথচ, তাদেরও করতে হয়।
মাইক্রোসফট, গুগল এবং মেটা, প্রত্যেকেই দুর্দান্ত ব্যবসা করা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক ঝটকায় ১০,০০০-এর বেশি কর্মী ছাঁটাই করেছে। মাইক্রোসফটের প্রধান সত্য নাদেলা বলেছিলেন, কোম্পানির দুর্দান্ত সাফল্যের সময়েও কর্মী ছাঁটাই করাটা হলো 'সাফল্যের এক অদ্ভুত প্রহেলিকা'। এই কথাটা একবার ইউরোপের নেতাদের বলে দেখুন তো! জার্মানির দুই শিল্পদানব, বশ এবং ভক্সওয়াগেন, যখন সম্প্রতি ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিল, তখন তাদের ছাঁটাই প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে ২০৩০ সাল চলে আসবে।
ইউরোপীয়রা পুঁজিবাদের এই আদুরে, সোহাগী রূপটা ছাড়তে নারাজ। আমেরিকার চেয়ে একটু গরিব, কিন্তু কাজের চাপ কম আর চাকরির নিরাপত্তা বেশি—এই সামাজিক চুক্তিটাই তাদের বড় আপন। কিন্তু ইউরোপের কর্মসংস্থান আইনে সামান্য কিছু বদল আনলেই মূল্যবান অধিকারগুলো বাঁচিয়ে রেখেও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা সম্ভব। মিস্টার কস্ট এবং কোটানলেমের পরামর্শ হলো, ইউরোপের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া কর্মীদের—যারা মূলত প্রযুক্তি জগতের এবং যাদের সামাজিক সুরক্ষার তেমন দরকারও পড়ে না—তাদের আমেরিকায় মতোই সহজে ছাঁটাই করার নিয়ম করা উচিত।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো কোম্পানিগুলোর জন্য কর্মী ছাঁটাই সহজ করে দিয়েছে, আবার ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের জন্য উদার বেকারত্ব ভাতাও নিশ্চিত করেছে। আসল কৌশলটা হলো, সামাজিক কল্যাণের চাহিদার সাথে উদ্ভাবনের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদের একটা ভারসাম্য তৈরি করা। একসময় চাকরির সুরক্ষাই ছিল ইউরোপের জন্য আদরের নরম কম্বল। আর এখন? এখন সেটাই যেন একটা শক্ত জ্যাকেট, যা শরীরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে দমবন্ধ করে দিচ্ছে। ■
