‘ট্রাম্প তিন বছর পরেই বিদায় নেবেন’: ইউরোপকে আশ্বস্ত করার চেষ্টায় ডেমোক্র্যাট নেতারা
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ছিলেন সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। তার বক্তব্যের সুর কেমন হবে, তা নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে আগে থেকেই কৌতূহল ও শঙ্কা ছিল।
শেষ পর্যন্ত তার বক্তব্য সব উদ্বেগ দূর করতে না পারলেও, অনেকেই সেটির মধ্যে মিত্রদের জন্য আশ্বাসের বার্তা দেসঝতে পেয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেলেও, তা ভেঙে পড়বে না—এমন ইঙ্গিতই দেখতে পেয়েছেন তারা।
তবে সম্মেলনে রুবিও একাই একমাত্র মার্কিন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর ছিলেন না। সেখানে উপস্থিত অন্য মার্কিন রাজনীতিবিদরাও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে কথা বলেন। কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন পরিস্থিতিকে সাময়িক হিসেবে উপস্থাপন ধরতে।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম শুক্রবার সম্মেলনের এক অনুষ্ঠানে বলেন, 'আজ আমি যদি আর কিছুই বলতে না পারি, তবে এটুকু বলব—ডোনাল্ড ট্রাম্প সাময়িক। তিনি তিন বছর পরেই বিদায় নেবেন।'
নিউসাম সেখানে উপস্থিত ডজনখানেক মার্কিন আইনপ্রণেতা ও গভর্নরের একজন ছিলেন। তাদের মধ্যে এমন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা ছিলেন, যারা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের মনোনয়নের দৌড়ে থাকতে পারেন।
অনেকেই জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের শক্তিশালী অংশীদার হিসেবেই থাকবে। রুবিওর বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কথার মিল থাকলেও, রুবিও যেমন মহাদেশের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন, অন্যদের বক্তব্যে সে ধরনের সুর ছিল না।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জিন শাহিন বলেন, 'আমরা এখানে এসেছি এই আশ্বাস দিতে যে আমাদের ইউরোপীয় মিত্ররা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা বুঝি।'
সম্মেলনে উপস্থিত রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ কোনো 'গৃহযুদ্ধে' নেই। তিনি মার্কিন মিত্রদের 'মার্কিন রাজনীতির অতিরঞ্জিত কথাবার্তায়' বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেন।
তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই আশ্বাস দেওয়া যতটা সহজ, বাস্তবে তা ততটা সহজ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো, মার্কিন সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং পররাষ্ট্রনীতিকে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে ফেরানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেছে তারা।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা এ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসে। শুক্রবার ফ্লোরিডায় যাওয়ার আগে তিনি আবারও এ বিষয়ে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভার্জিনিয়ার সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেন, নির্বাচনব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ মধ্যবর্তী নির্বাচনের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার জন্য হুমকি হতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমি কখনো ভাবিনি যে ২০২৬ সালের আমেরিকায় দাঁড়িয়ে আমাকে এটা বলতে হবে।'
ট্রাম্প প্রশাসন 'সেভ অ্যাক্ট'-এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছে, ভোটার পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা জালিয়াতি রোধে প্রয়োজনীয় এবং জনপ্রিয়।
সম্মেলনে সিনেটর মার্ক কেলি ও এলিসা স্লটকিনও বক্তব্য দেন। স্লটকিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'গভীর কিছুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে'। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, 'আমরা এটি পার করে আসব।'
সম্মেলনের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিলেন কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। তিনি সম্পদ বৈষম্য ও স্বৈরাচারী সরকারের উত্থানের মধ্যে সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, 'আমাদের অর্থনৈতিক ঘর গোছানো এবং শ্রমিক শ্রেণির জন্য বাস্তবিক সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।'
তিনি আরও বলেন, 'তা না হলে, আমরা স্বৈরাচারীদের দ্বারা পরিচালিত একটি আরও বিচ্ছিন্ন বিশ্বে পতিত হব, যারা কর্মজীবী মানুষদের জন্যও কিছু করে না।'
তবে পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত এক প্রশ্নে তাইওয়ান ইস্যুতে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায় তাকে।
ওকাসিও-কর্টেজ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভিন্ন ধারার একজন নেতা। তবে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বিষয়ে তার বক্তব্যের সঙ্গে জো বাইডেনের সময়কার নীতির মিল ছিল।
অন্যদিকে ট্রাম্প 'আমেরিকা ফার্স্ট' (সবার আগে আমেরিকা) নীতির মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলে আসছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর সেই নীতির প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
মিউনিখে উপস্থিত ডেমোক্র্যাট নেতারা এ প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেন। অ্যারিজোনার সিনেটর রুবেন গালেগো বলেন, 'এখন ইউরোপ শুধু চায় আমরা যেন আরও ভালো হই। স্নায়ু শান্ত করার জন্য এটি একটি খুব ভালো সম্মেলন হয়েছে। মাঝে মাঝে তাদের মনে করিয়ে দিতে হয় যে ট্রাম্পই সব নন... আমরা এখনো এখানে আছি।'
