ফিলিস্তিনের জন্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে ফ্রান্স-সৌদি আরবের উদ্যোগে বৈশ্বিক সম্মেলন আজ
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সমর্থন আদায়ে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে আজ সোমবার নিউইয়র্কে শুরু হচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা এই সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন আনুষ্ঠানিকভাবেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবেন। এমন পদক্ষেপে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
ইতোমধ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মেলনটি বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন একে আখ্যা দিয়েছেন "সার্কাস" হিসেবে। বৃহস্পতিবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা মনে করি এটি কোনো সহায়ক পদক্ষেপ নয়, বরং সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করবে।"
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে দেশটির পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে। পশ্চিম তীরের কিছু অংশ দখল করার পাশাপাশি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
অপরদিকে, ওয়াশিংটনও সতর্ক করেছে যে, ফ্রান্সসহ যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে—তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। নিউইয়র্কের এই সম্মেলনের অন্যতম সহ-আয়োজক হলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ।
গাজা সিটিতে ইসরায়েলের স্থল অভিযান চলমান থাকা অবস্থায় এই সম্মেলনে যোগ দেবেন বিশ্বনেতারা, যা আগামীকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের লাগাতার আক্রমণে পুরো গাজা উপত্যকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সেখানে মানবিক বিপর্যয় তীব্রতর হয়েছে। পশ্চিম তীরের বাড়ছে ইসরায়েলের আগ্রাসন। এমতাবস্থায়, যুদ্ধবিরতির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দুই বছর আগে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে এক হামলা চালানোর পর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এমন অবস্থায় দুই রাষ্ট্র সমাধানের ধারণা চিরতরে যেন হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ বাড়ছে।
চলতি মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি সাত পৃষ্ঠার ঘোষণাপত্র অনুমোদন করেছে, যেখানে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য "বাস্তবসম্মত, সময়াবদ্ধ ও অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ" গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হামাসকে আত্মসমর্পণ ও নিরস্ত্র হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তাৎক্ষণিকভাবে এ উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। উভয়েই এই সম্মেলনকে ক্ষতিকর এবং দৃষ্টি আকর্ষণের কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, 'নিউইয়র্ক ঘোষণাপত্র অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কোনো অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি পথনকশা (রোডম্যাপ)। এর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জায়গা হলো যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিত করা।'
জ্যঁ–নোয়েল আরও বলেন, 'যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির লক্ষ্য অর্জন হওয়ার পর পরবর্তী ধাপের পরিকল্পনা করতে হবে, যা আজ সোমবারের আলোচনায় উঠবে।
ফ্রান্সই এ উদ্যোগকে সামনে এনেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জুলাইয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। ছোট দেশগুলো এতদিন এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দেশের অবস্থান এটিকে আরও গতি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোববার ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সোমবারের সম্মেলনে ফ্রান্সসহ আরও ছয়টি দেশ এ ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দিতে পারে। তবে কিছু দেশ শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃতি দেবে, আবার কেউ কেউ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সংস্কার প্রতিশ্রুতি কতদূর বাস্তবায়ন করে তার ওপর ধাপে ধাপে কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ নির্ভর করবে।
ইসরায়েল বরাবরই স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা এই স্বীকৃতির বিরোধী। তেলআবিবের দাবি, ৮৯ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সংস্কার ও আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম নন। এ বছরের শুরুর দিকে আব্বাস মাখোঁকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তাতে যে সংস্কার প্রতিশ্রুতির উল্লেখ ছিল, তার তিনি রাখতে পারবেন না।
প্রেসিডেন্ট আব্বাস এবং ডজনখানেক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা সরাসরি সম্মেলনে থাকবেন না। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে। তাই আব্বাস ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নেবেন।
এমনকি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি সম্মেলনের সহ-আয়োজক, তিনিও উপস্থিত থাকছেন না। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ শুক্রবার সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, যুবরাজ সোমবার ভিডিওর মাধ্যমে বক্তব্য রাখতে পারবেন।
পশ্চিম তীর-ভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিন রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, "বিশ্ব আজ উচ্চকণ্ঠে বলছে—একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রয়োজন। এখন দরকার এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া।"
তিনি আরও যোগ করেন, "সম্মেলন শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং এখন বিশ্বকে দেখাতে হবে প্রকৃত পদক্ষেপ কী হবে।"
