ইসলামিক ন্যাটো? সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি - ভারতের জন্য কী প্রভাব রাখবে?
সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এতে বলা হয়েছে, যেকোনো এক দেশের ওপর আক্রমণকে অন্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। ইসরায়েলের দোহায় বিমান হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলো। ওই হামলার পর আরব দেশগুলোরও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র পাকিস্তান এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলো, যা উপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।
বেশ কিছু কারণে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ:
১. এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়া দিয়েছে।
২. সৌদি আরবের পাকিস্তানের পারমাণবিক ছাতার অন্তর্ভুক্তি ইসরায়েলের জন্য আঞ্চলিক সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
৩. এ চুক্তি ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে উসকে দিতে পারে এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যতের সংঘাতে অনিশ্চয়তা বাড়াবে। এছাড়া আরব দেশগুলোর সমর্থন ভারতের বিপক্ষে যেতে পারে।
৪. চীনের জন্য এ চুক্তি কৌশলগত লাভ এনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের সঙ্গে প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৫. উপসাগরে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন প্রশ্নের মুখে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইসরায়েলের কাতার হামলার প্রতিক্রিয়া। এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে নয়- সৌদি কর্মকর্তারা এমন দাবি করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন- চুক্তির সময়টি মোটেও কাকতালীয় নয়।
কাতার যে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ দোহায় হামলার ঘটনা সেটা প্রমাণ করেছে। এদিকে ওয়াশিংটনের নীরবতাকে উপসাগরীয় দেশগুলো এক ধরনের মদদ হিসেবে দেখছে। আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিকল্প খুঁজছিল সৌদি আরব। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে স্থায়ী করে তোলে দেশটি। বহু বছর ধরে এ নিয়ে জল্পনা থাকলেও এবার তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পেল।
এ চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো- এটিতে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার অন্তর্ভুক্ত কি না, ইচ্ছাকৃতভাবে সেটা অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। আর এই অস্পষ্টতা আন্তর্জাতিক চাপ না বাড়িয়ে দেশ দুটির প্রতিরোধশক্তিকে আরও জোরালো করেছে।
'ইসলামি ন্যাটো' ভাবনা
সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিটি সামনে এনেছে সমষ্টিগত মুসলিম সামরিক জোটের ধারণা, যেটিকে অনেকে 'ইসলামি ন্যাটো' বা 'আরব ন্যাটো' নামে ডাকেন। বিগত কয়েক দশকে সংকটময় মুহূর্তে এই ধারণা সামনে এলেও পরে তা হারিয়ে গেছে। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।
ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর অভিভাবক সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে তার নিরাপত্তাকে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করল। সরাসরি আক্রমণের শিকার কাতারও হয়তো একই পথে হাঁটতে পারে। এদিকে ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই একটি ইসলামি সামরিক ব্লকের স্বপ্ন দেখছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মনোভাবও পাল্টেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর ভরসা কমে আসছে তাদের। তবে জোটের ক্ষেত্রে বড় বাধাও আছে আর সেটি হলো মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব। যেমন সৌদি বনাম ইরান, কাতার বনাম সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক বনাম মিসর- যা এই জোট গঠনের পদক্ষেপকে দুর্বল করে দেয়। তবুও বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে জোটের ধারণাটি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ
এদিকে ভারত এখন তীব্র কৌশলগত চাপে আছে। একদিকে তার সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাত। সৌদির দক্ষিণ এশীয় সংঘাতে সরাসরি জড়ানোর আশঙ্কা কম হলেও সৌদির সমর্থনে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যে কোনো ইস্যুতে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারে। এছাড়া যদি সৌদি আরব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণে অর্থায়ন করে, তবে ভারতকে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে।
ইসরায়েলের জন্য বার্তা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সতর্ক সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই প্রক্রিয়া কার্যত থেমে গেছে। ইসরায়েলকে এবারই প্রথম তার সামরিক পদক্ষেপের জবাবে পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি মাথায় রাখতে হচ্ছে।
দোহায় ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য ছিল হামাস নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু এর ফল হলো উল্টো। কারণ এর মাধ্যমে সৌদি–ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ইসলামি ঐক্যের নতুন জাগরণ ঘটল, আর পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি নতুন করে সামনে এলো।
চীনের সুযোগ
কৌশলগতভাবে বড় বিজয়ী এখন চীন। পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র (সিপিইসি'র মাধ্যমে) হওয়ার পাশাপাশি রিয়াদের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড, জ্বালানি চুক্তি ও অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে বেইজিং। চীনের লাভের সবচেয়ে বড় কারণ হলো- যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে আসা এক শক্তিশালী উপসাগরীয় অংশীদারকে কাছে টানার সুযোগ পেল দেশটি।
চুক্তির ফলাফল কী হতে পারে
কয়েকটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট সামনে আসতে পারে:
১. রিয়াদের সঙ্গে আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে ওয়াশিংটন, হয়তো প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা পুনর্বিবেচনা করবে। একইসঙ্গে ইসরায়েলকে একতরফা উত্তেজনামূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে চাপ দেবে।
২. রিয়াদ প্রমাণ করতে চাইবে, এই চুক্তি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষুণ্ন করছে না, বরং মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করছে।
৩. যৌথ মহড়া, সেনা মোতায়েন এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর রক্ষক হিসেবে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়তে থাকবে।
৪. কাতার, তুরস্ক কিংবা উপসাগরীয় ছোট দেশগুলোও একই ধরনের চুক্তিতে যেতে পারে, যা একটি বাস্তব 'আরব ন্যাটো' গঠনের দিকে নিয়ে যেতে পারে মুসলিম দেশগুলোকে।
ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন জোট বা ঐক্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়বে।
