নেপালে কারফিউ ভেঙে রাস্তায় আন্দোলনকারীরা, প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতির বাড়িতে আগুন, সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে হামলা
নেপালে সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও উত্তেজক ও সহিংস আকার ধারণ করছে। আজ মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ও রাষ্ট্রপতি রাম চন্দ্র পৌডেলের বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
সোমবারের প্রাণহানির পর মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বালকোটে অবস্থিত ব্যক্তিগত বাসভবনের সামনে জমায়েত হয়। পরিস্থিতি উত্তেজক হয়ে ওঠে এবং বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কর্তৃপক্ষ জানায়, নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো ধরনের তাজা গুলি ব্যবহারের অনুমতি নেই। তবুও সংঘর্ষের সময় গুলিবর্ষণ ও গুলির আঘাতে কয়েকজন আহত হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রপতির বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালাচ্ছে এবং আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল এবং শের বাহাদুর দেউবার বাসভবন ও জ্বালানি মন্ত্রী দীপক খাড়কার বাড়িতেও হামলা চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।
এদিকে, বিক্ষোভকারীরা সদ্য পদত্যাগী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের বাসভবনেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। গতকাল পদত্যাগ করার পর থেকেই লেখকের বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে শুরু করে। আজ সকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বিক্ষোভকারীরা বাড়িটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুন লাগার সময় লেখক বাড়িতে ছিলেন কিনা, তা এখনও জানা যায়নি।
বাসভবনের বাইরে এখনও বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী অবস্থান করছে এবং তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতাদের বাসভবন ও সম্পত্তিতে পাথর নিক্ষেপ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, নেপালে 'জেন জি' বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সহিংস আন্দোলনে কেপি শর্মা ওলি সরকার কার্যত পতনের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একদিন পরই দেশজুড়ে এই বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
সরকারের ওপর প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক মন্ত্রী পদত্যাগ করে সরকার থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন।
বিক্ষোভকারীরা টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রাস্তায় নেমে পাথর নিক্ষেপ ও মিছিল করার পর রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কারফিউ জারি করা হয়েছে। দেশের এই উত্তাল পরিস্থিতি ওলি সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
যদিও, নেপালে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে পুলিশকে কার্যত নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। বিক্ষোভকারীদের প্রবল রোষের মুখে পুলিশ খুব দ্রুত পিছু হটেছে। ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা কেপি শর্মা ওলি সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ এখন চরমে।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে নেপালে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইউটিউবসহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের নতুন নিবন্ধন ও তদারকি নীতি মানতে ব্যর্থ হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে সোমবার কাঠমান্ডুতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। জনতা সংসদ ভবন ঘিরে ফেললে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। সোমবার নেপালে দুর্নীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ১৯ জন নিহত হন।
আজ মঙ্গলবার এই আন্দোলন ব্যাপক সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত শতাধিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঠমান্ডু উপত্যকাসহ একাধিক জেলায় কারফিউ জারি করেছে প্রশাসন।
এদিকে, নেপালে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ায় প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের নিরাপদে সরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও সাময়িকভাবে বন্ধ করার প্রস্তুতি চলছে।
সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মন্ত্রীদের সরকারি বাসভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপদে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে অন্তত পাঁচটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকেও কেপি শর্মা ওলিকে সরানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩০০-এরও বেশি সামরিক কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারগুলি বিমানবন্দর এলাকা থেকে আসা-যাওয়া করছে।
