'ধুলোমাখা বাকরুদ্ধ মুখ': ভূমিকম্পের ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত আফগান গ্রামবাসীরা
'ধুলোমাখা মুখে মানুষগুলো যেন রোবটের মতো নিথর হয়ে বসে আছে। তারা এতটাই বাকরুদ্ধ যে, কেউ এ নিয়ে একটি কথাও বলতে পারছে না। চারদিকে এক ধরণের গভীর নিস্তব্ধতা গ্রাস করে আছে।'
বলছিলেন আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত কুনার প্রদেশের বাসিন্দা মতিউল্লাহ শাহাব, যিনি নিজেই একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
গত রবিবার মধ্যরাতের ঠিক আগে, ৬.০ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে পূর্ব আফগানিস্তানে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ৮০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে শাহাব নিজেই মধ্যরাতে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে দেখেন তার বাড়িঘর প্রবলভাবে কাঁপছে। দেয়াল ভেঙে পড়ার ভয়ে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে সারারাত বাগানে জেগে কাটান। 'আমরা সবাই খুব ভয় পেয়েছিলাম,' বলেন শাহাব।
ভোর হতে না হতেই তিনি নিজের গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরেন ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার উদ্দেশ্যে। কিন্তু রাস্তাগুলো পাথরে ভরে থাকায় তাকে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে প্রায় দুই ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলিতে পৌঁছাতে হয়।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নাঙ্গারহার ও কুনার প্রদেশ। তবে এর কম্পন কাবুল এবং প্রতিবেশী পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে।
তিনি যখন আন্দারলাচাক গ্রামে পৌঁছান, তখন দেখেন কয়েকজন ছোট শিশুকে রাস্তায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বুকে ও মুখে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে দুটো ছোট্ট শিশু একটি স্ট্রেচারে শুয়ে আছে। অন্য শিশুদের সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। শুধু এই গ্রামেই মারা গেছেন ৭৯ জন।
মতিউল্লাহ বলেন, 'আমি অনেক মৃতদেহ দেখেছি। ১৭ বার আফটারশক অনুভব করেছি।'
ভূমিকম্পে মৃত অসংখ্য মানুষের জন্য কবর খুঁড়তে স্থানীয়দের সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন মতিউল্লাহ। তিনি বলেন, 'আমি যে গ্রামগুলো পরিদর্শন করেছি, সেগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।' শাহাবকে এক ব্যক্তি জানান, তিনি তাঁর স্ত্রী ও চার সন্তানকে হারিয়েছেন। তবে অধিকাংশ মানুষ এতটাই শোকাহত ও হতবিহ্বল ছিলেন যে তাদের কথা বলার শক্তিটুকুও ছিল না।
রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় তালেবান সরকারের উদ্ধার অভিযান মূলত হেলিকপ্টার নির্ভর হয়ে পড়েছে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু দুর্গম ও পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে এখনো কিছু জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই উদ্ধারের অপেক্ষায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে অনেকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছেন, এমন খবরও আসছে অহরহ।
শাহাব জানান, স্বেচ্ছাসেবকরা আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তিনি নিজে দুটি বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে দুই নারীকে উদ্ধার হতে দেখেছেন। তবে উদ্ধারাভিযানের সময় নারীদের ছবি তোলার অনুমতি তাকে দেওয়া হয়নি, কারণ তালেবান নারীদের ছবি তোলার অনুমতি দেয় না।
মতিউল্লাহ আরও বলেন, বহু বাসিন্দা এখন খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
কুনারের সোকাই জেলার আরেক বাসিন্দা ইজ্জাতুল্লাহ সাফি জানান, ভূমিকম্পে তার বাড়ির একাংশ ধসে পড়েছে।
'রাতটিকে ছোটখাটো মহাপ্রলয়ের মতো মনে হচ্ছিল। ভূমিকম্পটি এতোটাই তীব্র ছিল, আবার কম্পনের পরপরই প্রচণ্ড বাতাস বইতে শুরু করে, হালকা বৃষ্টিও পড়ে। আমার সন্তানরা ভয়ে চিৎকার করতে করতে আমাকে জাপটে ধরেছিল। চারদিকে ধুলোয় ভরে গিয়েছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'মোবাইল নেটওয়ার্ক তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। আমরা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিদ্যুৎ না থাকায়, আমরা ফোনের টর্চলাইটের ওপর নির্ভর করেছিলাম।'
ইজ্জাতুল্লাহ জানান, সকালে সরকারি হেলিকপ্টার এসে আহতদের পাহাড় থেকে কুনার মহাসড়কে নামিয়ে আনে, সেখান থেকে তাদের গাড়িতে করে ক্লিনিকে পাঠানো হয়।
বিদ্যুৎ নেই, সারাদিন বাজারও বন্ধ ছিল। তাছাড়া আফগানিস্তানের ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকা এখনো দুর্গম।পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত গ্রামগুলোতে পৌঁছাতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে, যা উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
