চীনে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে শূকরের ফুসফুস প্রতিস্থাপন

অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে অন্য মানুষের অঙ্গ ব্যবহার নতুন কিছু নয়। তবে প্রাণীর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা বহু শতাব্দী ধরে দেখে আসছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রচেষ্টাও ফলপ্রসূ হতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের হৃদপিণ্ড ও কিডনি মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করে কিছুটা সাফল্য পেয়েছেন গবেষকরা।
তবে ফুসফুস প্রতিস্থাপন সবচেয়ে জটিল প্রক্রিয়াগুলোর একটি। এমনকি মানুষ থেকে মানুষে প্রতিস্থাপনেও এর মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি।
তবে গত সোমবার চীনের বিজ্ঞানীরা জানান, এবার প্রথমবারের মতো তারা 'ব্রেইন ডেড' এক ব্যক্তির শরীরে শূকরের ফুসফুস প্রতিস্থাপন করেছেন।
'নেচার মেডিসিন' জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গুয়াংজু মেডিকেল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা জানান, প্রতিস্থাপনের পর অঙ্গটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আংশিকভাবে কাজ করেছে। নয় দিন পর অঙ্গটি শরীর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
চিকিৎসকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংকটে ভোগা রোগীদের জন্য এটি একটি নতুন বিকল্প হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই পদ্ধতিটি সাধারণ ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হতে এখনও দীর্ঘ সময় লাগবে।
চীনের গুয়াংজু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালের গবেষকরা এই গবেষণার মূল লেখক। যদিও গবেষণাপত্রে রোগীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, তবে তাকে ৩৯ বছর বয়সী একজন পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর ব্রেন-ডেড ঘোষণা করা হয়েছিল। রোগীর পরিবারের সম্মতিতে চিকিৎসকরা তার দেহে শূকরের ফুসফুস প্রতিস্থাপন করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গবেষণা জিনগতভাবে পরিবর্তিত পশুর অঙ্গ মানবদেহে প্রতিস্থাপনের (জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন) ক্ষেত্রে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। যদিও এখনও বহু বাধা অতিক্রম করতে হবে, তবুও এই প্রাথমিক সাফল্য ভবিষ্যতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গবেষকরা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, প্রতিস্থাপনের পরপরই অঙ্গ প্রত্যাখ্যানের কোনো তাৎক্ষণিক লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে মাত্র একদিন পর শরীরে জটিলতা শুরু হয়। রোগীর সারা শরীরে ফোলাভাব দেখা দেয় এবং টিস্যুতে তরল জমা হতে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি রক্ত প্রবাহের সমস্যার কারণে হয়েছিল। উল্লেখ্য, ফুসফুস শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসই নয়, রক্ত সঞ্চালনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিস্থাপনের কয়েক দিনের মধ্যে আংশিক সুস্থতার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও, এত সতর্কতা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা দেখেন যে, রোগীর শরীর ধীরে ধীরে অঙ্গটি প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে। পরিশেষে, রোগীর পরিবারের অনুরোধে চিকিৎসকরা এই পরীক্ষা বন্ধ করে দেন।
বিশ্বজুড়ে দান করা অঙ্গের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০২৩ সালে, যতগুলো অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে, তার দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৪৮ হাজারেরও বেশি প্রতিস্থাপন হলেও, অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম ছিল ১ লাখ ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের। এর ফলে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ জন আমেরিকান অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অভাবে মারা যান।
দীর্ঘদিন ধরেই প্রাণীর অঙ্গ মানবদেহে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। গত ৩০ বছর ধরে মানুষের হৃদপিণ্ডে শূকরের ভালভ সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। তবে পুরো অঙ্গ প্রতিস্থাপন আরও জটিল। জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের হৃদপিণ্ড ও কিডনি মানুষের দেহে বসিয়ে চিকিৎসকরা কিছু সীমিত সাফল্য পেয়েছেন। শূকরের যকৃত নিয়েও পরীক্ষা হয়েছে, কিন্তু তাতে সাফল্য এখনও পর্যন্ত তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
তবে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ম্যাসাচুসেটসের টিম অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে। গত জানুয়ারিতে ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে একটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর তিনি সুস্থ জীবনযাপন করছেন।
নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন ক্যানিং থোরাসিক ইনস্টিটিউটের থোরাসিক সার্জারির প্রধান এবং পরিচালক ডা. অঙ্কিত ভরত এই গবেষণাটিকে কৌতূহলোদ্দীপক বলে মনে করলেও বলেন যে, তিনি মনে করেন শূকর থেকে মানুষের ফুসফুস প্রতিস্থাপন সহসা সম্ভব হবে না।
তার মতে, কিডনির মতো অঙ্গের চেয়ে ফুসফুস প্রতিস্থাপন অনেক বেশি জটিল। ফুসফুস রক্ত পরিশোধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, প্লেটলেট উৎপাদন, পিএইচ ভারসাম্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও এর বিপাকীয় (মেটাবলিক) এবং অন্তঃক্ষরা (এন্ডোক্রাইন) কার্যকারিতাও রয়েছে। কিডনি বা হৃদপিণ্ডের মতো নয়, ফুসফুস শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার মতো বাহ্যিক উপাদানের সংস্পর্শে আসে।
নতুন এই গবেষণার গবেষকরা দাবি করেছেন যে, রোগীর শরীরে শূকরের ফুসফুস তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যানের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে ডা. ভরত, গবেষকদের প্রকাশিত এক্স-রে এবং সিটি স্ক্যান ইমেজগুলো পর্যালোচনা করার পর বলেন, 'ফুসফুসের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই যে এখানে হাইপার-অ্যাকিউট রিজেকশন (অতি দ্রুত প্রত্যাখ্যান) ঘটেনি।'
অন্তত ফুসফুস প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে, ডা. ভরত মনে করেন, মানুষের নিজস্ব স্টেম সেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে, তা শূকরের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের চেয়ে বেশি আশাব্যঞ্জক হতে পারে।