চীনের নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড 'ফেসকিনি'; যে কারণে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে
যুগে যুগে ফ্যাশনের ধারা বদলায়। বিভিন্ন সময়ে ফ্যাশন জগতে নতুন ট্রেন্ড আসে, আবার সময়ের সাথে হারিয়েও যায়। একসময় ইউরোপে কেপ, কোডপিস কিংবা রাফ ছিল প্রচলিত পোশাক, এখন তা কেবলই ইতিহাসের অংশ।
আবার কখনও কখনও ফ্যাশন জগতে এমন কিছু নতুন নতুন জিনিসের আগমন ঘটে, যা আগের সব ধারণাকেই পাল্টে দেয়। যেমনটা এখন ঘটছে চীনে।
সেখানে সূর্যরশ্মি থেকে ত্বক বাঁচাতে 'ফেসকিনি' নামে এক ধরনের মুখের আবরণ রীতিমতো ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। মুখ ঢাকা এই পোশাকের নকশা দেখলে প্রথমে অবশ্য ব্যাংক ডাকাতদের কথাই মনে পড়তে পারে।
যদিও এই ট্রেন্ড এতোটাও নতুন নয়। ২০১৬ সালে ফ্রান্সে সমুদ্রসৈকতে মুসলিম নারীদের সাঁতারের বিশেষ পোশাক 'বুরকিনি' নিষিদ্ধ করা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে তোলপাড়, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে চীনের 'ফেসকিনি'।
এই বিতর্কের মাঝেই টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রশ্ন তোলেন, চীনা পর্যটকরা যদি 'ফেসকিনি' পরে ফ্রান্সের সৈকতে যান, তাহলে ফরাসি কর্মকর্তারা কী করবেন?
যদিও 'বুরকিনি' বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম হওয়ার অনেক আগেই চীনে 'ফেসকিনি'র প্রচলন ছিল।দেখতে যতই অদ্ভুত লাগুক না কেন, ফেসকিনি চীনে খুবই পরিচিত একটি দৃশ্য। রঙিন এই ফুল-ফেস মাস্কটি এখনও বেশ জনপ্রিয়।
চীনে অতিবেগুনি (ইউভি) রশ্মি থেকে সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জামাদির বাজার এখন বেশ সমৃদ্ধ, আর ফেসকিনি সেই শিল্পেরই একটি অংশ।এই গ্রীষ্মেও চীনের ভিড়ে ঠাসা সমুদ্রসৈকতে এর দেখা মিলেছে এবং অনলাইনেও দেদারসে বিক্রি হচ্ছে।
করোনা মহামারির সময়ের সার্জিক্যাল মাস্কের সঙ্গে এর অবশ্য কোনো মিল নেই। এই সান মাস্কগুলো মূলত ধোয়া যায় এমন সিনথেটিক কাপড় দিয়ে তৈরি। কোনোটি শুধু মুখের নিচের অংশ ঢেকে রাখে, আবার কোনোটি কপাল থেকে শুরু করে গলা ও বুক পর্যন্ত ঢেকে রাখতে সক্ষম।
এর দামেও রয়েছে ভিন্নতা—কয়েক ডলার থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ ডলারেও বিক্রি হয় একেকটি ফেসকিনি।
সব মিলিয়ে, চীনে গত বছর ইউভি-রশ্মি রোধী পোশাকের বাজার ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি ইউয়ান (১ হাজার ১০০ কোটি ডলার)। গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্যাক্সু কনসাল্টিংয়ের তথ্যমতে, মূলত নারীদের উদ্দেশ্যে তৈরি ফেসকিনির বিক্রি গেল জুলাই পর্যন্ত এক বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। আর পুরুষদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ইউভি স্লিভের (হাতা) বিক্রি দ্বিগুণ হয়েছে।
কিছুদিন আগেও ফেসকিনির ব্যবহার মূলত সমুদ্রসৈকতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাঁতারের সময় রোদে পোড়া ভাব এড়াতে বয়স্ক নারীরাই এটি বেশি পরতেন।
তবে করোনা মহামারি এবং এর ফলে মাস্কের ব্যাপক ব্যবহার এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করেছে। মহামারির পর গত কয়েক বছরে ফেসকিনি বয়স্কদের জন্য অল্পদামি ও নিম্নমানের নকশার পণ্য থেকে তরুণ প্রজন্মের ফ্যাশনেবল সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে।
দ্যাক্সু কনসাল্টিংয়ের লাই মিং ই বলেন, এখন মানুষ এমন মাস্ক চায়, যা তাদের অফিসের পোশাক বা বাইরের সাজসজ্জার সঙ্গে মানানসই হবে। তিনি আরও বলেন, অনেক নারীই ফর্সা ত্বক ধরে রাখার জন্য এটিকে তাদের ত্বকের যত্নের রুটিনের একটি অংশ হিসেবে দেখেন।
বিভিন্ন কোম্পানি এই নতুন ফ্যাশনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসা জমিয়ে তুলেছে। এই ধারায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে শেনজেনে এক যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত হওয়া 'বেনআন্ডার' নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
তারা মাস্কসহ বিভিন্ন ধরনের ইউভি-রোধী সরঞ্জাম বিক্রি করে। তবে আনতা ও লি-নিংয়ের মতো চীনের অনেক ক্রীড়া সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও এখন একই ধরনের পণ্য বিক্রি শুরু করেছে।
যদিও চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি এই ফ্যাশনকে ভালো চোখে দেখছে না। সম্প্রতি দলের মুখপত্র 'পিপলস ডেইলি' এক প্রতিবেদনে 'সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ' বেড়ে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে ত্বক রক্ষার জন্য আসলে কী প্রয়োজন, তা নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির দিকে ইঙ্গিত করা হয়।
ইউরোপে 'রাফস' নামক বিশেষ ধরনের কলার প্রায় এক শতাব্দী ধরে ফ্যাশনে টিকে ছিল। কিন্তু চীনের ফেসকিনির আয়ু হয়তো ততটা দীর্ঘ হবে না।
