ট্রাম্পের শুল্ক সত্ত্বেও চীনের রপ্তানি বৃদ্ধি, বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার
২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে। দেশটি বুধবার জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘস্থায়ী চাপ মোকাবিলায় উৎপাদনকারীরা বৈশ্বিক পরিসরে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালানোয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি জোরদার হওয়ায় এই সাফল্য এসেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজার যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দিকে নজর দেওয়ার জন্য চীনা কোম্পানিগুলোর প্রতি নীতিনির্ধারকদের যে আহ্বান ছিল, তা কার্যকর ফল দিয়েছে। গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ এবং বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও এই কৌশল অর্থনীতির জন্য সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে।
এইচএসবিসির প্রধান এশীয় অর্থনীতিবিদ ফ্রেড নিউম্যান বলেন, 'চীনের অর্থনীতি এখনো অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। এটি একদিকে যেমন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও চীনা উৎপাদনকারীদের বাড়তে থাকা প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রতিফলন, অন্যদিকে তেমনি অভ্যন্তরীণ দুর্বল চাহিদা এবং তার ফলে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার ফলও।'
২০২৬ সালে বেইজিংয়ের সামনে চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। এর মধ্যে রয়েছে চীনের বাণিজ্যচর্চা ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দেশের রাজধানীতে তৈরি হওয়া উদ্বেগ সামাল দেওয়া, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চীনা পণ্যের ওপর তাদের অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টি মোকাবিলা করা।
নীতিনির্ধারকদের সামনে অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো, ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের এই অর্থনীতি আবাসন খাতের মন্দা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে আর কত দিন অন্য বাজারে আরও সস্তা পণ্য রপ্তানি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।
নিউম্যান বলেন, 'চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ক্রমেই বাড়তে থাকলে বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে পারে, বিশেষ করে যেসব দেশ নিজেরাই উৎপাদনভিত্তিক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।'
বুধবার প্রকাশিত কাস্টমস বিভাগের তথ্যে দেখা গেছে, উৎপাদন খাতে পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত চীনের সারা বছরের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৮৯ ট্রিলিয়ন ডলারে। এই অঙ্কটি সৌদি আরবের মতো বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সমান। এর আগে গত নভেম্বরে প্রথমবারের মতো এই উদ্বৃত্ত এক ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছিল।
তথ্য প্রকাশের পর সংবাদ সম্মেলনে চীনের কাস্টমস প্রশাসনের উপমন্ত্রী ওয়াং জুন বলেন, 'বাণিজ্য অংশীদারদের বৈচিত্র্য বাড়ায় ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা (চীনের) উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে।'
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি থেকে ডিসেম্বরে রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যমানের হিসাবে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। নভেম্বরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা যেখানে ৩ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, বাস্তবে তা অনেক বেশি হয়েছে।
ডিসেম্বরে চীনের আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে আগের মাসে তা ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে।
পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝিওয়েই ঝাং বলেন, 'শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অভ্যন্তরীণ দুর্বল চাহিদার প্রভাব কমাতে সাহায্য করছে।'
তিনি আরও বলেন, 'চাঙ্গা শেয়ারবাজার ও স্থিতিশীল যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের সঙ্গে মিলিয়ে সরকার অন্তত প্রথম প্রান্তিকে (কিউ১) তাদের সামষ্টিক বা ম্যাক্রো নীতির অবস্থান অপরিবর্তিত রাখবে বলেই মনে হচ্ছে।'
রপ্তানি বৃদ্ধি: বিশ্ববাজারে আরও অংশীদারিত্ব বাড়াতে প্রস্তুত চীন
এই ইতিবাচক তথ্য প্রকাশের পর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও চীনের মুদ্রা ইউয়ান স্থিতিশীলই ছিল। সকালের লেনদেনে বেঞ্চমার্ক সাংহাই কম্পোজিট সূচক এবং ব্লু-চিপ সিএসআই ৩০০ সূচক—দুটিই ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
গত বছর এশিয়ার এই শক্তিশালী অর্থনীতির মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সাতবার ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যার পেছনে আংশিকভাবে দুর্বল ইউয়ানের ভূমিকা ছিল। ২০২৪ সালে এমন ঘটনা ঘটেছিল মাত্র একবার। এতে স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানো কিছুটা কমলেও বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে চীনের সামগ্রিক বাণিজ্যে ট্রাম্পের পদক্ষেপ বড় ধরনের আঘাত হানতে পারেনি।
২০২৫ সালে ডলারের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমেছে, আর বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি কমেছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে চীনা কারখানাগুলো অন্য বাজারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০২৫ সালে চীনের বিরল মৃত্তিকা ধাতুর রপ্তানি অন্তত ২০১৪ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও এপ্রিল থেকে বেইজিং কিছু মাঝারি থেকে ভারী উপাদানের রপ্তানি সীমিত করতে শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, সয়াবিন কেনা, বোয়িং উড়োজাহাজের সম্ভাব্য চুক্তি এবং টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে দরকষাকষির সময় এই পদক্ষেপ ছিল ওয়াশিংটনের ওপর নিজেদের প্রভাব দেখানোর একটি কৌশল।
বিশ্বের শীর্ষ কৃষিপণ্য আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ সয়াবিন কিনেছে। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে চালান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় এই আমদানি সম্ভব হয়েছে। বাণিজ্য উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় বছরের বড় একটি সময় চীনা ক্রেতারা মার্কিন ফসল কেনা থেকে বিরত ছিলেন।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর এখনো বড় প্রভাব ফেলছে
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, চলতি বছরও বিশ্ববাজারে চীনের অংশীদারিত্ব বাড়বে। এর পেছনে থাকবে চীনা কোম্পানিগুলোর বিদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে কম শুল্কে পণ্য প্রবেশের সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি নিম্নমানের চিপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের শক্তিশালী চাহিদাও এই প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তবে বেইজিং ইঙ্গিত দিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য ধরে রাখতে হলে শিল্প খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সুবিধা কিছুটা সংযত করতে হবে এবং বিশাল রপ্তানির কারণে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তির সংকটও সমাধান করতে হবে।
গত সপ্তাহে চীন তাদের সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের জন্য ভর্তুকি-সদৃশ রপ্তানি কর ছাড় বাতিল করেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধের একটি বড় কারণ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জও খুব দ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই—এমনকি বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যদি প্রেসিডেন্টের শুল্ক বৃদ্ধির বিরুদ্ধে রায়ও দেয়।
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, তার ধারণা চীন আমেরিকান পণ্যের জন্য তাদের বাজার খুলে দিতে পারে। এর এক দিন আগে তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন, যা তেহরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার বেইজিংয়ের সঙ্গে পুরোনো ক্ষত নতুন করে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ জিচুন হুয়াং বলেন, 'ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্য উত্তেজনা সৃষ্টির সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।'
