নাজিব আহমেদ: ৯ বছরেও মেলেনি এই ভারতীয় শিক্ষার্থীর নিখোঁজ রহস্য
ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) বায়োটেকনোলজি নিয়ে পড়ছিলেন নাজিব আহমেদ। নয় বছর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে তিনি আচমকাই নিখোঁজ হন, আর তারপর থেকেই তার সন্ধানে এখনো হন্যে হয়ে ঘুরছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকা ২৭ বছর বয়সী নাজিবের সঙ্গে ডানপন্থী ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) সদস্যদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে সেই সংগঠনের পক্ষ থেকে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
দীর্ঘ বছর ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিবিআই এই রহস্যভেদে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে দিল্লি পুলিশ থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত তারা নাজিবের ভাগ্য সম্পর্কে কিছুই নিশ্চিত করতে পারেনি।
অবশেষে দিল্লির একটি আদালত নাজিব আহমেদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছে । কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য সব সূত্র খতিয়ে দেখেও কোনো অগ্রগতি পায়নি।
গত মাসে ঘোষিত রায়ে আদালত বলেছে, 'শেষকথা হিসেবে আমরা এটাই আশা করি, নাজিব আহমেদকে যেন খুব শিগগিরই খুঁজে পাওয়া যায়।'
তবে নাজিবের পরিবার অভিযোগ করেছে, তদন্ত সঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। তারা এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।
'এর মানে কী দাঁড়ায়? ভারতের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা যদি দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিখোঁজ হওয়া এক ছাত্রকেও খুঁজে পেতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ কার কাছে যাবে?'—বিবিসি হিন্দিকে বলেন নাজিবের মা ফাতিমা নাফিস।
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আমাদের ছেলেকে না পাওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।'
উত্তরপ্রদেশের এক গ্রামে জন্ম নাজিব আহমেদের। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পরিবারের সদস্যরা অনেক কষ্ট করে তার জেএনইউ-তে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছিলেন।
'স্নাতক শেষ করার পর ও এক কথায় জানিয়ে দিল, জেএনইউতেই পড়বে,' বলছিলেন নাজিবের মা ফাতিমা নাফিস।
'আমি তখন বলেছিলাম, ভর্তি হতে পারো, কিন্তু হলে থাকবে না। তুমি খুবই সহজ-সরল। কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি।'
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর রাতে জেএনইউ'র হলে নির্বাচনী প্রচারে থাকা এবিভিপি-সংশ্লিষ্ট একদল ছাত্রের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন নাজিব আহমেদ। ছাত্র রাজনীতিতে জেএনইউ বরাবরই সক্রিয়, যেখানে আদর্শগত বিরোধ থেকে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সিবিআইকে দেয়া সাক্ষ্যে নাজিবের রুমমেট মোহাম্মদ কাসিম জানান, ওই মারামারিতে নাজিব আহত হন এবং তাকে স্থানীয় এক সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকরা অভিযোগ করেন, পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না করা পর্যন্ত তারা চিকিৎসা দিতে পারবেন না।
আদালতের রায় অনুযায়ী, এরপর নাজিব নিজেই কোনো অভিযোগ না করে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। আর তার পরদিন থেকেই তিনি নিখোঁজ। তার মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ এবং কাপড়চোপড় সবই ছিল তার হোস্টেলের কক্ষে।
সিবিআই-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিখোঁজ হওয়ার দিন সকাল ১০টার দিকে নাজিব আহমেদ শেষবারের মতো তার ফোন ও ল্যাপটপ ব্যবহার করেছিলেন। হলের এক ওয়ার্ডেন সিবিআইকে জানান, তিনি নাজিবকে সকালে একটি অটোরিকশায় উঠতে দেখেছিলেন, যেটি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়।
এরই মধ্যে নাজিবের রুমমেট ফোন করে মারামারির ঘটনা জানালে মা ফাতিমা নাফিস দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। সকালেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান এবং ছেলেকে না পেয়ে ১৫ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে থানায় একটি জিডি করেন।
কিন্তু এরপর কয়েক দিন কেটে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীরা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগ তোলেন।
২০১৬ সালের নভেম্বরে দিল্লি হাই কোর্টে একটি রিট করেন ফাতিমা নাফিস। পুলিশের তদন্তের ধীরগতি, বিভ্রান্তিকর দিকনির্দেশনা ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন তিনি। সেই সাথে আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবিও জানান।
এর এক মাস পর দিল্লি পুলিশ জেএনইউ ক্যাম্পাসজুড়ে বড় পরিসরে দুই দফা তল্লাশি চালায়, যেখানে স্নিফার ডগও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তখনও কোনো তথ্য মিলেনি।
শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের মে মাসে আদালত মামলার তদন্তভার তুলে দেয় সিবিআইয়ের হাতে।
এক বছর পর সিবিআই আদালতকে জানায়, তারা সম্ভাব্য সব সূত্র খতিয়ে দেখেও কোনো ফলাফল পায়নি এবং তাই মামলাটি বন্ধ করার অনুমতি চায়।
সংস্থাটি জানায়, তারা ৫০০'র বেশি সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, ট্যাক্সি, বাস, ট্রেন ও বিমানের বিভিন্ন অপারেটরের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে, এমনকি হাসপাতাল ও মর্গেও খোঁজ চালিয়েছে—তবুও নাজিবের খোঁজ মেলেনি।
নাজিব সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারলে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও, তাতেও কোনো ফল আসেনি বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান।
তদন্ত প্রক্রিয়া এরপর আরও দুই বছর স্থবির অবস্থায় কাটে। ২০২০ সালে ফাতিমা নাফিস আবার আদালতের দ্বারস্থ হন। এবার তিনি সিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনকে চ্যালেঞ্জ করেন।
তার অভিযোগ ছিল, সিবিআই তার ছেলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত ছাত্রদের যথাযথভাবে জিজ্ঞাসাবাদই করেনি। তিনি বলেন, ওই ছাত্রদের 'স্পষ্ট উদ্দেশ্য' ছিল, তারা নাজিবকে হুমকি দিয়েছিল এবং তাদের গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল।
তবে সিবিআই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তারা নাজিবের সন্ধানে 'একটিও চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি'।
সিবিআই আরও জানায়, ওই রাতের সংঘর্ষে জড়িত নয়জন ছাত্রের ফোন ট্র্যাক করে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের কাউকে নাজিবের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়িত বলে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
মামলাটি চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দিল্লির একটি আদালত জানিয়েছে, সিবিআই সম্ভাব্য সব দিক থেকেই তদন্ত চালিয়েছে, কিন্তু নাজিব আহমেদের অবস্থান সম্পর্কে 'কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য' পাওয়া যায়নি।
আদালত ফাতিমা নাফিসের আবেদন খারিজ করে দেয়। রায়ে বলা হয়, সাক্ষীরা মুখের হুমকির কথা স্বীকার করলেও এবিভিপির সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার সঙ্গে নাজিবের নিখোঁজ হওয়ার সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো প্রমাণ নেই।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, জেএনইউর উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধরনের হাতাহাতি ও কথা কাটাকাটি অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবে আদালত বলেছে, ভবিষ্যতে যদি নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে, তাহলে সিবিআই চাইলে আবার তদন্ত চালু করতে পারবে।
এই আদেশ নাজিবের পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য এক বড় ধাক্কা।
২০১৮ সালে দিল্লি হাই কোর্টে ফাতিমা নাফিসের পক্ষে দাঁড়ানো আইনজীবী কলিন গনসালভেস বলেন, তিনি এখনো সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ভারতে ছোটখাটো অভিযোগেই যেখানে প্রায়ই মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেখানে নাজিবের ঘটনার মতো গুরুতর অভিযোগে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও হেফাজতে না নেওয়াটা 'অবিশ্বাস্য'—বলেন তিনি।
ফাতিমা নাফিসের অভিযোগ, তার ছেলের ধর্মই তদন্তের গুরুত্বকে প্রভাবিত করেছে।
'যদি ভিকটিম একজন হিন্দু ছেলে হতো, তাহলে পুলিশ কি একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাত?'—জিজ্ঞাসা করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, 'যদি সন্দেহভাজনদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে, তবে আমাদের সন্তানের জন্য কেন এমন কিছুই হলো না?'—এই বলে তিনি সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অপরাধে অভিযুক্তদের বাড়ি বুলডোজারের মাধ্যমে ভেঙে ফেলার প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করেন। বিবিসি এ বিষয়ে সিবিআইয়ের মন্তব্য চেয়েছে।
তবে সিবিআই বরাবরই বলে আসছে, তারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেছে। ২০১৮ সালে দিল্লি হাই কোর্টও জানিয়েছিল, তদন্তে পক্ষপাতিত্ব বা 'রাজনৈতিক চাপে' পরিচালিত হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ আদালতের সামনে আসেনি।
তবু লড়াই থামাননি ফাতিমা নাফিস। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর—যেদিন নাজিব নিখোঁজ হয়েছিলেন—সে দিনটিতে তিনি জেএনইউতে মোমবাতি মিছিলের নেতৃত্ব দেন। ]
নাজিবকে ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণ হলেও অপেক্ষা থামেনি।
'মাঝে মাঝে ভাবি, বাড়ির বাইরে একটা নেমপ্লেট লাগানো দরকার,' বলছিলেন নাজিবের বাবা নাফিস আহমেদ।
'বাড়িটা এখন নতুন করে সাজানো হয়েছে। ও যদি কোনও একদিন ফিরে আসে, আর যদি চিনতেই না পারে?'
