জুনের মধ্যে ইসলামী ইন্টারব্যাংক মানি মার্কেট চালু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক
ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য 'ইন্টারব্যাংক ইসলামী মানি মার্কেট' চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যেই এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়লে প্রচলিত ব্যাংকের মতো কলমানির মাধ্যমে অর্থ ধার করতে পারে না। ফলে তারল্য ব্যবস্থাপনায় তারা প্রায়ই এক ধরনের চাপের মধ্যে থাকে। তবে নতুন এই বাজার চালু হলে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা তৈরি হবে এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোর ইসলামী ইন্টারব্যাংক মানি মার্কেট কীভাবে পরিচালিত হয়, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১, ৭, ১৪, ২৮, ৯০ ও ১৮০ দিন মেয়াদী লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করা হবে। জামানতসহ এবং জামানত ছাড়া—উভয় পদ্ধতিতেই টাকা ধার করার সুযোগ থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য একটি ইন্টারব্যাংক ব্যবস্থা চালু করা হলেও, তা কার্যকর হয়নি। নতুন করে এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়লে কলমানির মাধ্যমে সহজেই অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য অনুরূপ একটি বাজার তৈরির পরিকল্পনা প্রথম নেওয়া হয়েছিল সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময়েই।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, 'ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ইন্টারব্যাংক ব্যবস্থা ছিল না। তাই অনেক সময় বাধ্য হয়ে ইসলামী ধারার বাহিরে গিয়ে তাদের টাকা ধার করতে হয়েছে। ইন্টারব্যাংকে চালু করা হলে ইসলামী ধারার এসব ব্যাংক নিজেদের মধ্যে ফান্ড ট্রান্সফার করতে পারবে, এটা অবশ্যই একটা পজেটিভ সাইন।'
তিনি বলেন, 'যেসব ইসলামী ব্যাংকে ফান্ড সারপ্লাস রয়েছে, তারা অন্যদের ধার দিতে পারবে। এতে সাময়িক অর্থ সংকট থাকবে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। বর্তমানে এসব ব্যাংক টাকার সংকটে পড়লে অন্যান্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের বিশেষ সহায়তা দিতে বাধ্য হয়েছে, কারণ টাকা নেওয়ার জন্য তো তাদের কোনো ইন্সট্রুমেন্ট নেই।'
আরফান আলী বলেন, 'এটি চালু করা হলে ইসলামী ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।'
শরিয়াহভিত্তিক একটি ব্যাংকের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, 'কোনো ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়লে প্রচলিত ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা ধার করতে পারে না। তাছাড়া প্রচলিত ব্যাংকের মতোও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপোর মাধ্যমে টাকা ধার করতে পারে না। ইসলামিক সুকুক দিয়ে টাকা ধার করতে পারে। তবে সেটার পরিমাণ অনেক কম, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।'
তিনি আরও বলেন, 'ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য প্রতিষ্ঠিত কোনো ইন্টারব্যাংক মার্কেট নেই।'
বর্তমানে তারল্য সংকট মোকাবিলায় ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো যা করছে
প্রথমত, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো ও প্রচলিত ব্যাংকগুলোর যে শরিয়াহভিত্তিক ব্র্যাঞ্চ রয়েছে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের 'ইসলামী ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ)'- এর মাধ্যমে তারল্য সহায়তা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের সুকুককে জামানত হিসেবে রাখতে হয়। এ তারল্য সহায়তা শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, ইসলামী ব্যাংকগুলো 'বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ড (বিজিআইআইবি)'- থেকে তারল্য সহায়তা নিতে পারে। যেসব ব্যাংকের অতিরিক্ত তহবিল থাকে, তারা এখানে জমা রাখে। সেখান থেকে অন্যরা সহায়তা নিতে পারে। এ তারল্য সহায়তা তিন বা ছয় মাস মেয়াদী হয়। বর্তমানে এ তহবিলে কোনো অর্থ নেই। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে এ তহবিলের অর্থ দেওয়া হয়েছে, তাই বর্তমানে এ ব্যবস্থা কার্যকর নয়।'
তৃতীয়ত, ইসলামী ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে আমানত দেওয়া-নেওয়া করে থাকে। এতে মুদারাবা হিসাবে মুনাফার হার দেওয়া হয়। নগদ অর্থে ঘাটতি হলে এসব ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক অন্য ব্যাংক থেকে আমানত নিয়ে তা পূরণ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, 'ইন্টারব্যাংক হলে ইসলামী ব্যাংকগুলো টাকার সংকটে পড়লে অন্যান্য ব্যাংকের মতোই একটি সুশৃঙ্খল প্ল্যাটফর্ম পাবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না, তবে এক ধরনের মনিটর করবে।'
তিনি বলেন, 'এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বুঝতে পারবে মার্কেটে কি পরিমাণের তারল্য চাহিদা ও যোগান রয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মার্কেটে তারল্য চাহিদা ও যোগান মনিটর করতে পারলেও, ইসলামী ব্যাংকগুলোতে সঠিকভাবে করতে পারছে না।'
ইন্টারব্যাংক চালু হলে যা সুবিধা পাওয়া যাবে
ইন্টারব্যাংক ব্যবস্থা চালু হলে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে লেনদেন করতে পারবে। তাছাড়া প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে যাদের শরিয়াহভিত্তিক ব্র্যাঞ্চ রয়েছে, তাদের সঙ্গেও ইন্টারব্যাংকের লেনদেন করা যাবে।
এতে কোনো ইসলামী ব্যাংক সাময়িক তারল্য সংকটে পড়লে শরিয়াহভিত্তিক আরেক ব্যাংক থেকে টাকা নিতে পারবে। সাধারণত ইন্টারব্যাংকে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের কাছে আস্থার ওপর ভিত্তি করে ধার দেয়। এ ধার দেওয়ার বিপরীতে কোনো রকমের নিশ্চয়তার ইন্সট্রুমেন্ট থাকে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'এ ব্যবস্থা চালু হলে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে অর্থ লেনদেনে স্থিতিস্থাপকতা বাড়বে। স্বল্পমেয়াদী তহবিল সংগ্রহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে অন্য ব্যাংক থেকে সহায়তা নিতে পারবে।'
তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে যদি কোনো ব্যাংকের চলতি হিসাবের ঘাটতি হয়, তাহলে অন্য ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে ঘাটতি মেটানো যাবে।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, 'ইন্টারব্যাংক থেকে নবগঠিত সম্মিলিত ব্যাংকের টাকা ধার পাওয়া কঠিন হবে। কারণ নতুন গঠিত এ ব্যাংকে টাকা ধার দিলে তা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকবে।'
তিনি বলেন, 'সম্মিলিত ব্যাংকের অ্যাসেটের আয় নেই, ইন্টারেস্ট এক্সপেন্স রয়েছে তবে ইন্টারেস্ট ইনকাম নেই। তাছাড়া কোর ইনকাম মার্জিন তো অনেক কম, কমিশন আয়ও কম কারণ এখন ঋণপত্র খুলতে পারবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'তাছাড়া আরও অনেক ধরনের জটিলতা রয়েছে, কারণ এ ব্যাংকের ক্লেইম বেশি, সে হিসাবে কোনো ধরনের আয় নেই।'
দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়
ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ইন্টারব্যাংক মানি মার্কেট চালু করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলছেন দেশের একটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তিনি বলেন, 'শরিয়াহভিত্তিক যেসব ব্যাংকে অর্থ তছরুপ হয়েছে, সেসব ব্যাংকে ইন্টারব্যাংক ব্যবস্থা দিয়ে তারল্য সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। কারণ ইন্টারব্যাংক ব্যবস্থা দিয়ে স্বল্পমেয়াদী সংকট সামাল দেওয়া হয়, তবে এটা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা যাবে না। এ অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে।'
তিনি বলেন, 'ইন্টারব্যাংক থেকে টাকা নিলেও এসব ইসলামী ব্যাংকে ধার নেওয়া অর্থের ব্যবস্থাপনা সঠিক উপায়ে হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং করতে হবে।'
