ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ফ্রান্সের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল
ফ্রান্সের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন 'দৃঢ়ভাবে আপত্তি' জানিয়েছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের জন্য দুই-রাষ্ট্র সমাধান নিয়ে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে তারা অংশ নেবে না।
বৃহস্পতিবার রাতে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মার্কো রুবিও মাখোঁর সিদ্ধান্তকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' উল্লেখ করে বলেন, এটি 'হামাসের প্রচারণাকে উৎসাহ দেয়' এবং 'শান্তিপ্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেয়'।
এর আগে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ জানিয়েছিলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, 'মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়সংগত ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির প্রতি ফ্রান্সের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার বজায় রেখেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি— ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।'
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত ১৪২টি দেশ ইতোমধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে অথবা স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ কয়েকটি প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশ এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
গত মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড ও স্পেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
তবে মাখোঁর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে, ফ্রান্স হবে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং জি-৭ জোটের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী দেশ, যারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।
এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, 'এই সিদ্ধান্ত সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করে এবং এটি আরও একটি ইরানি দোসরের জন্ম দিতে পারে।'
তার ভাষায়, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা ইসরায়েলকে ধ্বংস করার জন্যই ব্যবহৃত হবে— শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য নয়।'
নেতানিয়াহু দাবি করেন, 'ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের পাশের কোনো রাষ্ট্র চায় না; তারা চায়, ইসরায়েলের জায়গায় একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।'
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও মাখোঁর সিদ্ধান্তকে 'লজ্জাজনক' এবং 'সন্ত্রাসের কাছে আত্মসমর্পণ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'ইসরায়েল এমন কোনো ফিলিস্তিনি সত্তা গড়ে উঠতে দেবে না, যা আমাদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।'
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিতে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলা হয়ে আসছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ধারণার বাস্তবতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে এসে তিনি প্রস্তাব দেন, গাজা ভূখণ্ড 'নিয়ন্ত্রণে নিয়ে' সেখানকার ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে দিয়ে ওই এলাকাকে 'মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা' হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো, আরব দেশসমূহ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং জাতিসংঘ। তারা এটিকে 'জাতিগত নিধনের মতো' বলেও অভিহিত করেছে।
চলতি জুন মাসে ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নয় বলে তিনি মনে করেন।
তবে তার এই বক্তব্য প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, 'হাকাবি তার নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। নীতিনির্ধারণ করেন প্রেসিডেন্ট ও হোয়াইট হাউস।'
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ডেপুটি মুখপাত্র টমি পিগট জানান, জাতিসংঘে আগামী ২৮ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে না।
ফ্রান্স ও সৌদি আরবের সহ-সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনে বহু বছরের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধান এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি পথরেখা নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে।
পিগট বলেন, 'এ বিষয়ে আমাদের আর কিছু বলার নেই, শুধু এটুকুই যে— যুক্তরাষ্ট্র এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে না।'
এদিকে গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি হামলা বন্ধের দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে চালানো হামলায় ১,১৩৯ জন নিহত হন এবং ২০০ জনের বেশি লোককে ফিলিস্তিনে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।
এর পর থেকে টানা ২১ মাস ধরে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৪৪ হাজার।
যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও কাতারের মধ্যস্থতায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও তা এখনো কোনো সফল সমঝোতায় পৌঁছায়নি।
সোমবার যুক্তরাজ্য, জাপানসহ ইউরোপের ২৮টি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলকে জানিয়েছে— গাজায় যুদ্ধ 'এখনই বন্ধ করতে হবে'।
বিবৃতিতে তারা শিশু ও সাধারণ মানুষ যখন খাদ্য ও পানি সংগ্রহ করতে যায়, তখন তাদের ওপর ইসরায়েলের হামলাকে 'অমানবিক' এবং 'মানবিক সহায়তা বন্ধে পরিকল্পিত প্রচেষ্টা' হিসেবে আখ্যা দেয়।
