ইরানের সাথে যুদ্ধে নেতানিয়াহুর আসল লক্ষ্য কী, যা তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন না?

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ চতুর্থ দিনে গড়ানোর পর, স্পষ্ট হয়ে উঠছে যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য। শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো নয়—লক্ষ্য আরও গভীর: ১৯৭৯ সাল থেকে শাসন করে আসা আয়াতোল্লাহদের শাসনব্যবস্থা পতনের মাধ্যমে এমন এক সরকার প্রতিষ্ঠা, যারা নিজেরাই পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসবে।
ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার পর গেল ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েল যেসব স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, তা দেখে মনে হয় তালিকাটি তৈরি করেছেন যেন সরকারবিরোধী ইরানিরাই। হামলার লক্ষ্য ছিল—পুলিশ সদর দপ্তর, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি)-এর গোয়েন্দা দপ্তর এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সম্প্রচারকেন্দ্র। সঙ্গে ছিল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের কিছু শিশুসুলভ টুইট।
এমনকি আইডিএফ মুখপাত্রও যখন আইআরজিসির গোয়েন্দা প্রধানকে হত্যা করার কথা জানান, তখন তিনি উল্লেখ করেন—এই কর্মকর্তা 'ইরানিদের ওপর নজরদারি করে তাদের দমন করতেন'। প্রশ্ন জাগে—এই কাজ কি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আওতায় পড়ে?
যদি এই মুহূর্তে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন রাজপথে জোরালো হয়, আর সেই বিক্ষোভের পাশে থাকে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ড্রোন, যারা বাসিজ বাহিনীর যানবাহন গুঁড়িয়ে দেবে—তাহলে এক অভিনব দৃশ্য দেখা যাবে মধ্যপ্রাচ্যে।
বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর আর আগের মতো নজর নেই। ফোর্ডো পারমাণবিক স্থাপনাটি এখনও অক্ষত, পাহাড়ের গভীরে অবস্থান করে সুরক্ষিত রয়েছে। যদি ইসরায়েল এখনো এমন কোনো অস্ত্র আবিষ্কার না করে থাকে, যা বিশ্বে কারও জানা নেই—তবে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই এখন স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস করতে সক্ষম।
গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বি-৫২ বোমারু বিমানগুলোর গতিবিধি নজরে রেখেছেন—এই বিমানগুলো 'বাংকার-বাস্টার' বোমা ফেলতে সক্ষম। তবে এখন পর্যন্ত ২১টি বিমানের কোনোটিই মিসৌরির ঘাঁটি ছেড়ে বের হয়নি। বরং, গত মে মাসে ভারত মহাসাগরে মোতায়েন ছয়টি বিমান ঘাঁটিতে ফিরে গেছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুর কাছে প্রশ্ন রাখা হয়—তিনি কি ট্রাম্পকে বাংকার বোমার ব্যাপারে অনুরোধ করেছেন? তিনি সরাসরি কোনো জবাব দেননি।
সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুর মূল বার্তা ছিল—তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো কিছু করতে বলছেন না। তবে ইসরায়েলের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র পুরো পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, 'আমরাই সব প্রস্তুত করছি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। ফুটবলের মতো—আমরা প্রতিপক্ষের রক্ষণের দেয়াল ভেঙে ফেলেছি, খেলোয়াড়দের পাশ কাটিয়ে বল বাড়িয়েছি বক্সের মধ্যে। এখন যুক্তরাষ্ট্র একা গোলপোস্টের সামনে।'
নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য পরিষ্কার—ইরানকে এমনভাবে বিপর্যস্ত করা, যাতে ট্রাম্প তার আত্মগর্ব ও ইতিহাসে নাম লেখানোর বাসনা থেকে এই অভিযানে যোগ দেন। তিনি যেন নিজেকে বিশ্বের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরতে পারেন—যিনি ইরানকে পারমাণবিক হুমকি থেকে মুক্ত করেছেন, সম্ভব হলে গোটা ইসলামি শাসন ব্যবস্থাকেই শেষ করেছেন, এবং ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন একজন 'বিশ্বনায়ক' হিসেবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রকাশ্যে কোনো ধরনের অংশগ্রহণের সংকেত দেয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ হতে পারে—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপন কোনো সমন্বয় চলছে, যার কথা শুধু গুটিকয়েক মানুষ জানে। যেমন—নেতানিয়াহু, মোসাদের প্রধান ডেভিড বারনিয়া, উপদেষ্টা রন ডারমার এবং সম্ভবত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী গিলা গামলিয়েল, যিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সোমবার হারেৎজকে হোয়াইট হাউসের নিয়মিত এক দর্শনার্থী বলেন, 'আমি প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠদের জিজ্ঞেস করেছিলাম। তারা জানিয়েছে—এই বিষয়টি তাদের আলোচনার টেবিলে নেই। এমনকি সেখানে থাকার কোনো প্রয়োজনও তারা দেখছেন না। ইসরায়েলই এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাজ করে দিচ্ছে। তারা শুধু অনুমতি দিয়েছে, সেটাই যথেষ্ট।'
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্য কোনো বিষয়ে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দিচ্ছেন না নেতানিয়াহু। অর্থনীতি, পুনর্গঠন, সহায়তা কিংবা প্রতিদিনের যুদ্ধ ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও কোনো আলোচনা হয়নি তার নেতৃত্বে। বিদেশে আটকে পড়া ইসরায়েলিদের সংকট—যেটি সাধারণ সময়ে রাজনৈতিক চাপের জায়গা হতে পারত—তাতেও তার কোনো আগ্রহ নেই।
সাধারণ সময় হলে পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভকে নিয়ে জনমত যেভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তা উপভোগ করতেন নেতানিয়াহু। কিন্তু এখন এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তার নেই।
নেতানিয়াহুর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেন, 'আমরা দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি যেন সেটা দ্রুত শেষ করা যায়। সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।'
মূল নিবন্ধ হারেৎজে প্রকাশিত: ১৭ জুন
অনুবাদ: সাকাব নাহিয়ান শ্রাবন