শিল্পবাজারে মন্দার মুখেও কেন বাড়ছে লাতিন আমেরিকান সুররিয়ালিজমের চাহিদা
১৯৫৬ সালে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরা বলেছিলেন, বিশ্বের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ নারী শিল্পী মেক্সিকোতেই বাস করেন। মনে হতে পারে, সদ্যপ্রয়াত স্ত্রী ফ্রিদা কাহলোর কথাও হয়তো বলছিলেন তিনি।
কিন্তু না—চিত্রকলার ইতিহাসে ফ্রিদা সবচেয়ে বিখ্যাত নারী শিল্পী হলেও সেই সময় রিভেরা বলছিলেন ইউরোপ থেকে আসা তিন নারী সুররিয়ালিস্টদের কথা—স্পেনের রেমেদিওস ভারো, ইংল্যান্ডের লিওনোরা ক্যারিংটন এবং ফ্রান্সের অ্যালিস রাহন।
আজ ফ্রিদা কাহলো বিশ্বজুড়ে এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। তার মুখ দেখা যায় বইয়ের পাতায়, পোশাকের নকশায়, এমনকি বালিশের কভারেও। কিন্তু রেমেদিওস, লিওনোরা ও অ্যালিসসহ অন্যান্য নারী চিত্রশিল্পীরা মূলধারার জগতে ফ্রিদার মত সে রকম পরিচিতি পাননি। শিল্প-জগতের বাইরে তারা এখনও অনেকের কাছেই অপরিচিত।
তবে মূলধারার বাইরে, শিল্প-সংগ্রাহকদের জগতে তাদের চিত্রকর্ম নিয়ে আগ্রহ বেশ দ্রুত বাড়ছে। তাদের চিত্রকর্মের চাহিদা সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে ছবির দামও—বিশেষ করে লাতিন আমেরিকান নারী সুররিয়ালিস্টদের চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে।
সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের জন্ম হয় ১৯২০-এর দশকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, যখন শিল্পীরা বাস্তবতা থেকে দূরে গিয়ে অবচেতন মন, স্বপ্ন ও অতিপ্রাকৃত জগতকে কেন্দ্র করে স্বাধীন ও মুক্ত সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে শুরু করেন। এটি তখনকার রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ একটি শিল্প আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠে।
লন্ডনভিত্তিক আর্ট পরামর্শ প্রতিষ্ঠান আর্টট্যাকটিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটজন খ্যাতনামা নারী সুররিয়ালিস্ট শিল্পীর চিত্রকর্মের বিক্রয়মূল্য প্রতি বছর গড়ে ১৫০ শতাংশ করে বেড়েছে। আর ২০২৪ সালে সেই বৃদ্ধির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৯ শতাংশে।
এ উত্থানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন লিওনোরা ক্যারিংটন ও রেমেদিওস ভারো, শুধুমাত্র তাদের চিত্রকর্মের বিক্রয়ই বেড়েছে প্রায় ৪৯০ শতাংশ।
আর্জেন্টিনার শিল্পসংগ্রাহক এডুয়ার্দো কস্তান্তিনি ক্যারিংটনের 'লে দিসত্রাকসিওঁ দ্য দাগোবে' (Les Distractions de Dagobert) চিত্রকর্মটি ২ কোটি ৮৫ লাখ ডলার দিয়ে কিনেছেন, যা প্রায় সালভাদোর দালির সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্যের কাছাকাছি।
২০২৪ সালে সামগ্রিক শিল্পবিক্রি কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। বিশ্বশিল্পবাজার মন্দার এই সময়ে নারী সুররিয়ালিস্টদের চিত্রকর্মের কদর বেড়ে যাওয়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এই উত্থানের মূল সূত্র দীর্ঘদিন আগে ১৯৪০-এর দশকে। তখন ইউরোপীয় অনেক শিল্পী ফ্যাসিবাদের হাত থেকে বাঁচতে মেক্সিকোতে আশ্রয় নেন। ফরাসি লেখক ও সুররিয়ালিজমের প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রে ব্রেতোঁ মেক্সিকোকে 'সুররিয়ালিজমের আদর্শ ভূমি' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
শিল্প-ইতিহাসবিদ জ্যানেট ক্যাপলান বলছেন, মেক্সিকোর আদি সংস্কৃতিতে এক ধরনের 'জাদুকরী ভাবনা' গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। ডে অব দ্য ডেড উপলক্ষে শিশুদের চিনির তৈরি খুলি-আকৃতির মিষ্টি উপহার দেওয়ায় তার ছাপ স্পষ্ট।
প্যারিসে এই নারী শিল্পীরা পুরুষ শিল্পীদের ভিড়ে অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছেন। কিন্তু মেক্সিকোতে এসে রেমেদিওস ভারো, লিওনোরা ক্যারিংটন ও অ্যালিস রাহন নিজেদের স্থান করে নেন। সেখানেই তারা আধুনিক সুররিয়ালিজমের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেন।
মুদ্রার মান থেকে শুরু করে প্রযুক্তি শেয়ারের দাম সবকিছুরই ওঠানামা ঘটছে। এমন সময়ে সংগ্রাহকরা বেশি নজর দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠিত শিল্পকর্মের দিকে। ২০২২ সালে 'অতি আধুনিক' বা আল্ট্রা-কনটেম্পরারি আর্ট ছিল জনপ্রিয়, কিন্তু ২০২৪ সালে এর দাম ৩৮ শতাংশ কমে গেছে, যা সামগ্রিক শিল্পবাজারের পতনের চেয়েও বেশি।
এর বিপরীতে, ২০২৪ সালে নিউ ইয়র্কে রেনে ম্যাগ্রিটের একটি চিত্রকর্ম বিক্রি হয়েছে ১২১ মিলিয়ন ডলারে, যা শিল্পী এবং সুররিয়ালিস্ট শিল্পকর্মের জন্য নতুন রেকর্ড।
বিনিয়োগ করতে চান, কিন্তু দামের কারণে বিখ্যাত সব শিল্পকর্ম কেনা সম্ভব না এমন সংগ্রাহকদের জন্য নারী সুররিয়ালিস্টদের কাজ ঝুঁকি কমানোর সাশ্রয়ী বিকল্প বলে মনে করেন আর্টট্যাকটিকের লিন্ডসে ডিউয়ার। কারণ, কম দামে তুলনামূলক স্থিতিশীল মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে।
এই প্রবণতার পেছনে দায়ী ধনকুবেরদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও। আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে ল্যাটিন আমেরিকান আর্ট মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা এডুয়ার্দো কস্তান্তিনি চান, তার সংগ্রহশালাটি শিল্পকর্মে পূর্ণ হোক।
তার মতো শিল্প সংগ্রাহকদের নিলামের লড়াইয়ের কারণে অনেক সময় দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। ২০২০ সালে রেমেদিওস ভারোর একটি চিত্রকর্মের রেকর্ড দামে কিনে কস্তান্তিনি বলেছিলেন, 'এমন অসাধারণ শিল্পকর্ম আবার দেখা যাবে পঞ্চাশ বছর পর।'
প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২১ সালে নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট সুররিয়ালিজমকে পশ্চিম ইউরোপের বাইরেও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে একটি প্রদর্শনী আয়োজন করে, যেখানে ক্যারিংটন, ভারো ও রাহনের শিল্পকর্মও ছিল।
উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম খুব কমই বিক্রি হয়, তবে গত ১২ মে নিউ ইয়র্কের ক্রিস্টিজ নিলামে ভারোর 'রেভেলেশন' নামক চিত্রকর্মটি ৬ কোটি ২২ লাখ ডলারে বিক্রি হয়—যা এই শিল্পীর জন্য নতুন রেকর্ড।
ছবিটিতে আলোকিত বৃত্তের মাঝে ছড়িয়ে থাকা ঘড়ির গিয়ার দিয়ে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে জন্ম নেওয়া সুররিয়ালিজম মূলত অবচেতন মন ও অতিপ্রাকৃত জগতকে কেন্দ্র করে কাজ করে। আর্টট্যাকটিকের লিন্ডসে ডিউয়ার বলেন, 'একশ বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও আজকের দিনেও সুররিয়ালিজমের ভাব অনেকটা আগের মতোই রয়ে গেছে।'
