নিরীহ পিঁপড়াই কি একসময় সাপের ভয়ানক শত্রু ছিল?
সাপ সাধারণত তাদের বিষদাঁতের মাধ্যমেই শিকারকে বিষ প্রয়োগ করে কাবু করে—এ তথ্যটি আমাদের সবারই জানা। কিন্তু সাপের শরীরের অন্য প্রান্তেও যে এক প্রকার বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়, সেটি নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হয় না। বিষধর হোক বা বিষহীন—প্রায় সব সাপেরই লেজের গোড়ায় এক ধরনের বিশেষ গ্রন্থি থাকে, যা থেকে দুর্গন্ধযুক্ত এক তরল নিঃসৃত হয়।
এই নিঃসরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য এতদিন রহস্যের আড়ালেই ছিল। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এই রাসায়নিক নিঃসরণ আসলে সেই সুদূর অতীতের স্মৃতি বহন করছে, যখন সাপেরা আজকের মতো এমন ভয়ংকর হয়ে ওঠেনি। তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে তাদের নিয়মিত মোকাবিলা করতে হতো এক নির্মম শত্রুর—যাদের আমরা খুব নিরীহ ও সাধারণ 'পিঁপড়ে' হিসেবে জানি।
১৯৬০-এর দশক থেকেই বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, কিছু সাপের লেজের নিঃসরণ পোকামাকড় তাড়ানোর ক্ষমতা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, অনেকটা কেঁচোর মতো দেখতে 'টেক্সাস ব্লাইন্ড স্নেক' নামের এক ক্ষুদ্র সাপ পিঁপড়ে ও উইপোকার বাসায় ঢুকে খাবার খোঁজার সময় নিজের শরীরে ওই নিঃসরণ মেখে নেয়। কিন্তু যেসব সাপ কখনও পিঁপড়ের সংস্পর্শে আসে না, তারাও কেন এমন দুর্গন্ধযুক্ত উপাদান তৈরি করে—সে বিষয়ে এতদিন কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি।
এই রহস্যের কিনারা করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত 'স্মিথসোনিয়ান কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউট'-এর পল ওয়েলডন এবং ফ্লোরিডার 'সেন্টার ফর মেডিক্যাল, এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ভেটেরিনারি এন্টোমোলজি'-র রবার্ট ভ্যান্ডার মিয়ের বিভিন্ন প্রজাতির সাপের শরীর থেকে এই তরল সংগ্রহ করেন।
তাদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল বোয়া কনস্ট্রিক্টর, মধ্য আমেরিকান বারোয়িং পাইথন, বল পাইথন, টিম্বার র্যাটলস্নেক, কিং কোবরা এবং ইউনিকালার ক্রিবো (বনের অধিপতি নামে পরিচিত একটি বড় ও বিষহীন সাপ)।
এরপর গবেষকরা 'রেড ফায়ার অ্যান্ট' (বিষধর লাল পিঁপড়ে) দিয়ে একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন। মাটির নিচে বিশাল কলোনি গড়ে তোলা এই পিঁপড়েরা অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি ভীষণ আক্রমণাত্মক। গবেষকরা একটি কক্ষে পিঁপড়েদের আচরণের ওপর নজর রাখেন এবং সেখানে সাপের নিঃসরণের গন্ধ ছড়িয়ে দেন। তবে দেখা গেল, শুধু গন্ধে পিঁপড়েরা বিচলিত হয় না এবং তারা নির্বিঘ্নেই কক্ষে চলাচল করছে।
পরবর্তীতে ড. ওয়েলডন ও ড. ভ্যান্ডার মিয়ের পরীক্ষা করেন, যদি পিঁপড়েদের শরীরের সঙ্গে সরাসরি এই নিঃসরণের সংস্পর্শ ঘটে, তবে কী হয়। তারা পিঁপড়েদের সামনে একটি সাধারণ পানির ফোঁটা এবং অন্যটিতে ২০০ মাইক্রোলিটার সাপের নিঃসরণ মেশানো পানির ফোঁটা রাখেন।
দেখা গেল, পিঁপড়েরা সাধারণ পানির ফোঁটাকে ঘিরে ধরে তৃপ্তির সঙ্গে পান করছে; কিন্তু সাপের নিঃসরণ মেশানো ফোঁটার ধারেকাছেও ঘেঁষছে না। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে গবেষকরা চারটি ভিন্ন প্রজাতির সাপের সামান্য নিঃসরণ সরাসরি কিছু পিঁপড়ের গায়ে লাগিয়ে দেন।
ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। যে সাপের নিঃসরণই ব্যবহার করা হোক না কেন, সংস্পর্শে আসা মাত্রই পিঁপড়েরা পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়ে পড়ে এবং অর্ধেকেরও বেশি পিঁপড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়।
এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি 'সায়েন্স অফ ন্যাচার' জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, সাপের লেজের এই নিঃসরণ মূলত আদি যুগে পোকামাকড় থেকে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে বিবর্তিত হয়েছিল। ক্রিটেশিয়াস যুগে যখন পৃথিবীতে ডাইনোসরদের বিচরণ ছিল, তখন সাপ ও পিঁপড়ে—উভয়ই মাটির নিচে বসবাস করত।
গবেষকদের ধারণা, সাপের এই আত্মরক্ষার উপাদানটি সম্ভবত তখনই বিবর্তিত হয়েছিল। সেই আদিম সাপেরা হয়তো বর্তমানের টেক্সাস ব্লাইন্ড স্নেকের মতোই ছিল, যারা ওই কৌশলে আক্রমণকারী পিঁপড়েদের হাত থেকে রক্ষা পেত।
তবে প্রশ্ন ওঠে—আজকের দিনে কিং কোবরা বা বল পাইথনের মতো শক্তিশালী সাপেরা যখন নিজেরাই দুর্ধর্ষ শিকারি, তখন কেন তারা এখনও এই নিঃসরণ উৎপাদন করে? গবেষকরা মনে করেন, এই রাসায়নিক উপাদানটি সময়ের বিবর্তনে দ্বৈত উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে।
পূর্ববর্তী কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মাংসাশী স্তন্যপায়ী প্রাণীরা সেই সব প্রাণীর মাংস এড়িয়ে চলে যার গায়ে সাপের লেজের নিঃসরণ লেগে থাকে। যেহেতু স্তন্যপায়ী শিকারিরা সাপের অনেক পরে পৃথিবীতে এসেছে, তাই তাদের ভয়ে এই তরলের বিবর্তন হয়নি।
বরং কাকতালীয়ভাবে এই কীটনাশক-ধর্মী নিঃসরণ স্তন্যপায়ীদের কাছে এতটাই অসহ্য লেগেছে যে, তারা সাপকে শিকার করা থেকে বিরত থাকে। হাত-পা না থাকায় সাপেরা তাদের শরীরের দুই প্রান্তকেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে—এক প্রান্তে রয়েছে মারণঘাতী বিষ, আর অন্য প্রান্তে দুর্ভেদ্য দুর্গন্ধ!
