যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-ইউক্রেনের শান্তি আলোচনা যদি ভেস্তে যায়, তারপরে কী?

যুদ্ধের ইতি টানতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে পৃথকভাবে যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র— তা শুরুতেই লাইনচ্যুত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেনকে ভবিষ্যতে সহযোগিতার ভার নিক ইউরোপীয় মিত্ররা। কারণ ওয়াশিংটনের মনোযোগ এখন মধ্যপ্রাচ্যে ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। কিন্তু, দায়িত্ব নিতে তাঁরা প্রস্তুত কিনা—সে সিদ্ধান্ত ইউরোপীয়দেরই নিতে হবে। রাজী যদি হয়ও, সেক্ষেত্রে তাদের অবদান কতটুকু পার্থক্য গড়তে পারবে, তা নিয়েও ভাবনার অবকাশ থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুরো ইউরোপেরও নেই। এজন্য তারা প্রথমে পশ্চিম ইউক্রেনকে সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগ নিতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা ধরেই নেবে নিপার নদীর পূবপাড় পর্যন্ত সফলভাবেই এগোতে পারবে রুশরা। অবশ্য, পশ্চিম ইউক্রেনকে নিরাপত্তা দেওয়াও সহজ হবে না, বরং সেখানে পশ্চিম ইউরোপের সেনাদের অবস্থানের কারণে রুশ সেনাদের সাথে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকিও থাকবে। তাই ইউক্রেনের ভবিষ্যতের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত শেষপর্যন্ত নেয়া হবে— ওয়াশিংটনকে তা মনস্থির করতে হবে।
এদিকে ট্রাম্প অভিযোগ করছেন, যুদ্ধবিরতির বিশদ চুক্তির ব্যাপারে দীর্ঘসুত্রিতা করছে রাশিয়া। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে, তিনি রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা প্রদানের হুমকিও দিয়েছেন। এবারের হুমকির নতুন মাত্রা হচ্ছে, রাশিয়ার তেল ক্রয়কারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবে না।
রাশিয়ান তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতাই হচ্ছে চীন ও ভারত। তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যও যেনতেন প্রকারের নয়। চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ২০২৪ সালে ছিল ৫৮ হাজার ২৪০ কোটি ডলার। এরমধ্যে চীনে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাবে, ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্য হয় মোট ১১ হাজার ৯৭১ কোটি ডলারের। যারমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় ৭ হাজার ৭৫১ কোটি ডলারের পণ্য। অন্যদিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে ৪ হাজার ২১৯ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ, এ ভারতের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি খুব শিগগিরই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আবারো কথা বলবেন। তবে এই ফোনালাপ কবে করবেন– তার সুর্নিদিষ্ট কোনো দিনক্ষণ জানায়নি ট্রাম্প প্রশাসন।
যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসার আগে— রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই চাইছে যুদ্ধের ময়দানে যতটা সম্ভব সুবিধেজনক অবস্থায় থাকতে।
এইক্ষেত্রে এগিয়ে আছে রাশিয়া। কুর্স্ক থেকে শুরু করে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলেও রাশিয়ার সামরিক অভিযান দ্রুতলয়ে চলছে বলে জানা যাচ্ছে। রাশিয়া ইউক্রেনের হাত থেকে ওডেসা নগরীও দখলে নিতে চায়। এটিকে ক্রেমলিন একটি রাশিয়ান শহর বলেই দাবি করে।
ইউক্রেন প্রায় সবখানেই সুবিধে না করতে পারলেও, একটি অঞ্চল বাদে (রাশিয়ার কুর্স্ক) নিজ দেশের ভূখণ্ড রক্ষার জন্য যথাসাধ্য লড়াই করছে। তবে তারা পিছু হটছে এমন চিত্র সিএনএনের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। অর্থাৎ, রুশ বাহিনী একটু একটু কওরে আরও ইউক্রেনের জমি দখলে নিচ্ছে।
তবে কুর্স্কের সাথে কাছাকাছি অবস্থিত রাশিয়ার বেলগোরদ অঞ্চলে ইউক্রেনও ড্রোন ও কামানের মাধ্যমে হামলা করছে। এমনকী বেলগোরদ অঞ্চলে তারা কিছুটা সামনে এগোতে পেরেছে বলেও শোনা যাচ্ছে।
এই এলাকায় ইউক্রেনের আক্রমণের আসল লক্ষ্য এখনও স্পষ্ট নয়। তবে কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, বেলগোরদকে রক্ষায় সেখানে আরও সেনা মোতায়েনে রাশিয়াকে বাধ্য করাটা একটা উদ্দেশ্য হতে পারে। এতে অন্যান্য স্থানে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের ওপর রুশ বাহিনীর আক্রমণের ধার কমবে।
এর আগে কুর্স্কে একই উদ্দেশ্যে আক্রমণ অভিযান চালিয়ে এখন পিছু হটতে হচ্ছে ইউক্রেনীয়দের। লাভের ঝুলি শূন্য, উল্টো এই অভিযানে দক্ষ সেনা ও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাদের। ইউক্রেন শুধু কুর্স্কের দখল নিয়ে শান্তি আলোচনার টেবিলে তা দর কষাকষির কাজে লাগাতেই চায়নি, কিয়েভের আরও উদ্দেশ্য ছিল কুর্স্কের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দখল। এতে করে, সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইউক্রেনে পাঠিয়ে— ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর রুশ হামলার প্রভাব কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা ছিল।
কিন্তু, রুশ সেনাদের বাধার মুখে ততো দূর যেতেই পারেনি ইউক্রেনীয়রা। বরং সাত মাস ধরে তারা একটু একটু করে পিছু হটছিল কুর্স্কে। বর্তমানে কুর্স্ক থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে ইউক্রেনীয় সেনারা। আর রুশ বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে এপারে ইউক্রেনের সুমি অঞ্চলে প্রবেশ করেছে।
বেলগোরদেও ইউক্রেন খুব একটা সুবিধে করতে পারবে বলে মনে হয় না। অঞ্চলটির গভর্নর ভিয়াস্লেভ গ্ল্যাডকভ জানান, ইউক্রেন এখানকার ২০টি গ্রামের ওপর আক্রমণ করেছে। গ্রামগুলো দখলে নিতে পারলে— ইউক্রেনীয়দের মনোবল হয়তো কিছুটা চাঙ্গাও হবে, কিন্তু কতদিন দখল ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।
এককথায়, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন এখন বিপাকে পড়েছে। আর তা ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররাও জানে। তাই যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ আরও কিছু দেশ ইউক্রেনের সমর্থনে ইউরোপীয় সেনাদের পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সর্বশেষ ইউরোপ থেকে বিমান ও নৌবাহিনী পাঠানোর আলাপও শোনা যাচ্ছে।
এধরনের বাহিনীকে পাঠানো হলে— কোথায় তাঁরা অবস্থান করবে, সেটি নির্ধারণে এরমধ্যেই একটি মিশন ইউক্রেনে পাঠানো হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ব ইউক্রেনের কাছাকাছি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হলে রাশিয়ার হামলায় ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই থাকবে, কারণ রাশিয়ার রয়েছে কয়েক স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একইভাবে ওডেসা বন্দরের বাইরেও তেমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে যুদ্ধজাহাজ রাখা যাবে। আর ওডেসা রয়েছে রাশিয়ার মিসাইলের আওতার মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে কৃষ্ণসাগরে অস্ত্রবিরতির সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছেন পুতিন। কিন্তু, ইউক্রেনকে রক্ষার জন্য ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য সেখানে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করলে— এটি ভেস্তে যাবার প্রবল সম্ভাবনা আছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশেরই বিমানবাহী রণতরী রয়েছে, কিন্তু রাশিয়ার এত কাছাকাছি তারা এধরনের মূল্যবান সামরিক সম্পদ মোতায়েনের ঝুঁকি নেবে না বলেই মনে হয়।
তবে ইউক্রেনীয় বাহিনী যদি একেবারেই পরাস্ত হয় এবং পশ্চিম ইউরোপও রাশিয়ার দখলে চলে যাওয়ার হুমকি সৃষ্টি হয়— হয়তো তখন গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে তা ঠেকানোর চেষ্টা করবে ফরাসী ও ইংরেজরা। আর সেটা করতে প্যারিস-লন্ডনের সাহায্য লাগবে পোল্যান্ডের। কিন্তু, পোলিশ সরকার আর এই যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
রাশিয়া–ইউক্রেনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা যদি পথভ্রষ্ট হয়, যা ঘটার সম্ভাবনাই বেশি, তাহলে ইউক্রেনের একটি অংশের জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের নিরাপত্তা গ্যারান্টির দরকার হবে। ইউরোপের ডেশগুলো সেটা করতে আগ্রহী হবে তখনই, যদি তারা সত্যিই রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, এবং ভবিষ্যতে যেকোনো রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।