যোগীর বুলডোজার–কাণ্ডের নিন্দা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের, ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের বুলডোজার নীতির তীব্র নিন্দা করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এসময় প্রয়াগরাজ প্রশাসন এবং যোগী আদিত্যনাথ সরকারের সমালোচনা করে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত ছয়জনকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি এএস ওখা এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার বেঞ্চ এ নির্দেশ দিয়েছেন।
বিচারপতিরা বলেছেন, 'এভাবে কারো বাড়ি ভেঙে ফেলা হলে, তা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। বাসস্থানের অধিকার বা এ ব্যাপারে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া কিছু আছে। এই ক্ষেত্রে সেই সব কিছুই মানা হয়নি। যা সম্পূর্ণ সংবেদনশীলতার অভাব।'
তারা বলেন, 'আশ্রয় ও বাসস্থানের অধিকার সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অভিন্ন অঙ্গ। উন্নয়নের কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্তৃপক্ষকে সেটা জানতে হবে।'
তারা উত্তরপ্রদেশ সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে 'দেশে আইনের শাসন আছে।'
বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বুলডোজার–নীতি প্রথম চালু করেন। পরে বিজেপি–শাসিত অন্যান্য রাজ্যেও এই নীতি ব্যবহার হতে থাকে। দাঙ্গা বা অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ধৃত বা পলাতকদের ঘরবাড়ি দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগেই বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হতে থাকে। এ নিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হতে থাকে রাজ্যে রাজ্যে।
এরই ধারাবাহিকতায় উত্তর প্রদেশের একটি প্লটে চার-পাঁচ জনের বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন এক জন আইনজীবী এবং অধ্যাপকও। অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন না করেই তাদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। কেন তাদের বাড়ি ভাঙা হয়েছিল?
তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মামলাকারীদের আইনজীবী জানান, তার মক্কেলদের বাড়ি যে জমিতে ছিল, প্রশাসন তা ভুল করে নিহত গ্যাংস্টার আতিক আহমেদের বলে চিহ্নিত করেছিল। তারপরই ওই বাড়িগুলি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি, বাড়ি ভাঙার কথা তার মক্কেলদের জানানো হয় মাত্র একদিন আগে।
বাড়ি ভাঙার প্রক্রিয়া অবৈধ বলে দাবি করে ভুক্তভোগীরা প্রথমে এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। যদিও সেখানে তাদের আবেদন খারিজ হয়। তারপরই মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। সুপ্রিম কোর্ট সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের সমালোচনা করে। প্রশ্ন তোলে, প্রশাসনের নোটিস পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়েও।
বিচারপতি ওকা বলেন, 'বাড়ি ভাঙার ফলে মামলাকারীরা তাদের মাথার উপর ছাদ হারিয়েছেন। ২০২১ সালে আইনের না পরোয়া করে যাদের বাড়ি ভাঙা হয়েছিল, সেই প্রয়াগরাজের লুকারঞ্জের বাসিন্দা এক আইনজীবী, এক অধ্যাপক এবং দুজন মহিলাকে বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসাবে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে প্রয়াগরাজ প্রশাসন। শুধু তাই নয়, কর্তৃপক্ষের উচিত সর্বদা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।'
শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, 'যাদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, তাদের পাঠানো নোটিসের জবাবের সুযোগ দেওয়া হয়নি।'
পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কোনো বাড়ি ভেঙে ফেলার আগে কর্তৃপক্ষের অবশ্যই মনে রাখতে হবে সকল নাগরিকের বাসস্থানের অধিকারের কথা সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে।
মাঝে একটি শুনানি শেষে উত্তরপ্রদেশসহ দেশের একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যে বুলডোজার নীতির নিন্দা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত জানায়, রাজ্য প্রশাসনের কোনো অধিকার নেই বিচারকের ভূমিকায় বসে অভিযুক্তর বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই বেসরকারি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার। এইসঙ্গে শীর্ষ আদালত বেআইনি ও দখলীকৃত নির্মাণ ধ্বংসের ক্ষেত্রে গাইডলাইন বেঁধে দিয়েছিল।
জানানো হয়েছিল, বাড়ি ভাঙার কমপক্ষে ১৫ দিন আগে নোটিস দিতে হবে।