যেভাবে ১২ বছর বয়সি এই উদ্বাস্তু বালক এখন গাজার সর্বকনিষ্ঠ প্যারামেডিক
জাকারিয়া সারসাক, বয়স মাত্র ১২। এ বয়সে তার এখন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলাধুলা আর স্কুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু গাজার এই বালকের সেই সুযোগ নেই। তার এখন দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে অ্যাম্বুলেন্স ক্রুদের সঙ্গে গাজা উপত্যকার এখান থেকে ওখানে ছুটে বেড়িয়ে। জাকারিয়ার কাজ ইসরায়েলের হামলায় নিহতদের মরদেহ সংগ্রহ ও আহতদের জীবন বাঁচানো।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার সবচেয়ে কমবয়সি সাস্থ্যসেবী জাকারিয়া এবিসি নিউজকে বলে, প্রতিদিন সংঘর্ষের ভয়াবহতা দেখতে দেখতে সে ক্লান্ত। তার এখন একটাই ইচ্ছা—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগের জীবন ফিরে পাওয়া, যেদিন থেকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
গত ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার জবাবে সেদিনই পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েল। নির্বিচার সেই আক্রমণে প্রাণ গেছে ৩২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির, আহত হয়েছে ৭৪ হাজারের বেশি।
ইসরায়েলের আক্রমণের ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ জাকারিয়ার সমবয়সি অথবা তার চেয়ে ছোট। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অন্তত ইসরায়েলের হামলার ফলে অন্তত ১৩ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যের অভাবে পুষ্টিহীনতায় মারা যাওয়া শিশুরাও রয়েছে।
জাকারিয়া জানায়, 'আমরা শহিদদের নিয়ে যাই, আহতদের নিয়ে যাই। তাদের হাসপাতালে রেখেই আবার ছুটি আহত এবং শহিদদের নিয়ে আসতে।'
জাকারিয়া জানায়, কোথাও আক্রমণ হওয়ার খবর পেলেই বড়দের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে উঠে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় সে। তাদের জন্য ব্যান্ডেজ, টর্নিকেটসহ অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম বহন করে। আহতদের স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠাতে এবং অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামাতে সাহায্য করে।
সহকর্মীরা তার এই সাহায্যকে আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেন বলে জানায় জাকারিয়া।
নিজের কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সে এবিসি নিউজকে বলে, 'একটু ভয় তো লাগেই। [আহত বা নিহত] কাউকে দেখলেই বুকে ব্যথার মতো অনুভূতি হয়…আর ভয় লাগে।'
জাকারিয়া জানায়, বাড়ির বাইরে ইসরায়েলি ট্যাংক হাজির হতেই পালাতে বাধ্য হয়েছিল সে আর তার পরিবার। বাড়ি থেকে পালিয়ে তারা আশ্রয় নেয় আল-আকসা হাসপাতালে।
হাসপাতালে আশ্রয় পাওয়ার পর সেখানকার চিকিৎসকদের সঙ্গে পরিচয় হয় জাকারিয়ার। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যসেবী হিসেবে কাজ শুরু করে সে।
গত জানুয়ারিতে আল-আকসা হাসপাতালে আক্রমণ চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। সেই আক্রমণের মুখে হাসপাতাল ছেড়ে পালাতে হয় জাকারিয়ার পরিবারের সদস্যদের।
জাকারিয়া জানায়, 'আমার পরিবার এখন রাফায়, আর আমি এখানে। আমার বড় চার ভাই আছে। ওদের কথা খুব মনে পড়ে।'
মার্চের শেষদিকে রাফায় গিয়েছিল সে, তখন সর্বশেষ পরিবারের সঙ্গে দেখা হয় তার। কিন্তু মাত্র একদিন পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পায় জাকারিয়া। এর পরই তাকে স্বাস্থ্যসেবীর কাজ করতে আল-আকসা হাসপাতালে ফিরতে হয়।
জাকারিয়া জানায়, পরিবারের সঙ্গে থেকে যাওয়ার সুযোগ ছিল তার। কিন্তু সে মনে করে, স্বাস্থ্যসেবীর কাজটা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন এ কাজ ছাড়া সম্ভব নয়।
পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদের অনুভূতি জানাতে গিয়ে জাকারিয়া বলে, 'ওদের সঙ্গে দেখা হয় না বলে খুব খারাপ লাগে। দোয়া করি, আল্লাহ যেন আমাদের আবার এক করে দেন।'
ইসরায়েলের আক্রমণে মারা যাওয়া বন্ধুদের কথাও খুব মনে পড়ে জাকারিয়ার। 'আমার দুজন বন্ধু মারা গেছে। খবরটা পাওয়ার পর আমি কাঁদতে শুরু করেছিলাম।'
নিত্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় জাকারিয়াকে। কিন্তু সে বলে, ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করার জন্য এই ঝুঁকি নেওয়াই চায়।
যুদ্ধের আগে কোন জিনিসগুলো সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, জানতে চাইলে জাকারিয়া বলে, 'স্কুলের কথা, শিক্ষকদের কথা খুব মনে পড়ে আমার।'
একেবারে চোখের সামনে সঙ্ঘাতের ভয়াবহতা দেখার পরও জাকারিয়া স্বপ্ন দেখে, এ সঙ্ঘাত একদিন শেষ হবে, তারপর শান্তির একটা জীবন পাবে সে।
যুদ্ধ শেষ করার আকুল আকুতি জানিয়ে সে বলে, 'আমরা এ যুদ্ধের শেষ চাই।'
