ইউক্রেনের বিশাল অঞ্চল জুড়ে প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ করেছে রাশিয়া, ইউক্রেন তা ভেদ করতে পারবে?
কৃষ্ণসাগর তীরে আদিগন্ত বিস্তৃত উর্বর সমভূমির দেশ ইউক্রেন। পাহাড় ও অসমতল ভূমি কম থাকায়, এখানে নেই যুদ্ধ লড়ার সময় প্রাকৃতিক আড়ালের সুবিধা। রুশ-ইউক্রেনীয় সংঘাতের প্রথম দিক থেকেই তাই ট্রেঞ্চ বা পরিখা খনন করে লড়েছে রুশ সমর্থিত উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ইউক্রেনের সেনারা। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলের পর থেকে ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আগ্রাসনের আগপর্যন্ত, এভাবেই লড়ছিল দুপক্ষ। তাই বলা যায়, পরিখার যুদ্ধ ইউক্রেনের মাটিতে নতুন কিছু নয়। খবর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের
রুশ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত প্রাকৃতিক সম্পদ ও শিল্পে এগিয়ে থাকা অঞ্চল হলো- ডনবাস। ইউক্রেনের এই অঞ্চলটি যদিও এখন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত। এই বিনাশের জ্বলজ্যান্ত স্মারক- ছড়ানো-ছিটানো অজস্র পরিখার লাইন, বাঙ্কার, মেশিনগান পোস্ট, আর্টিলারি পজিশন ইত্যাদি। রাশিয়ানরা দখলীকৃত এলাকা ধরে রাখতে খনন করেছে পরিখা। অন্যদিকে, তাদের সুরক্ষিত অবস্থান থেকে হঠাতে– বিপরীত দিকে পাল্টা পরিখা নির্মাণ করে– সেখান থেকে লড়ছে ইউক্রেনীয়রা।
আবার, পপসানা এলাকায় ইউক্রেনীয়রা আছে রক্ষণাত্মক অবস্থানে। তাদের পরিখার সারিতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালাচ্ছে রুশ বাহিনী। লক্ষ্য তাদের হঠিয়ে বাখমুত শহরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এজন্য প্রচণ্ড হামলা অব্যাহত রাখা হয়েছে। বাখমুত এরমধ্যেই পরিণত হয়েছে ধ্বংস ও বিভীষিকার এক রণক্ষেত্রে। এখানে শত শত রুশ ও ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি যাই হোক, পরিখা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় রাশিয়ার কারণে। গত কয়েক মাসে মস্কো ইউক্রেন থেকে দখলীকৃত বিশাল অঞ্চলজুড়ে গড়ে তুলেছে পরিখাসহ নানান প্রতিরোধ কাঠামো, যা সত্যিই নজিরবিহীন। মার্কিন গণমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস একটি ছবির কথা উল্লেখ করে বলেছে, স্যাটেলাইট এই চিত্রে থাকা সকল অবকাঠামো মাত্র ছয় দিনে গড়ে তোলা হয়েছে।
এসব প্রতিরোধ কাঠামো প্রমাণ করে, রাশিয়ান সামরিক বাহিনী আরও শক্তিশালী রক্ষণাত্মক অবস্থান গড়ে তুলছে ইউক্রেনীয় আক্রমণ মোকাবিলা মাথায় রেখেই। এগুলি নির্মাণের সময় নদীর মতো প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাকেও কাজে লাগানো হচ্ছে।
রুশ বাহিনীর এমন করার কারণও যথেষ্ট। গত মাসে দক্ষিণে ইউক্রেনীয় আক্রমণ অভিযানে বিশাল এলাকা হারায় রাশিয়া। প্রাদেশিক রাজধানী খেরসনও যারমধ্যে ছিল। ফলে দনিপ্রো নদীর অন্যপাড়ে সরে যেতে হয় রুশ বাহিনীকে। এই নদীই এখন প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করছে দুই পক্ষের মধ্যে। নদীর দক্ষিণ তীরে একাধিক বিশাল আকৃতির প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে রাশিয়া, যাতে নদী পার হওয়ার উৎসাহ হারায় ইউক্রেনীয় সেনারা।
প্রতিরোধ কাঠামোর মধ্যে আছে- পিরামিড আকৃতির কংক্রিটের তৈরি মাইলের পর মাইলব্যাপী বিস্তৃত 'ড্রাগন'স টিথ' নামের প্রতিবন্ধক। গভীর খাঁদ খোড়া হয়েছে ট্যাংকের ফাঁদ হিসেবে। উভয় স্থাপনার উদ্দেশ্য– ইউক্রেনীয় সাঁজোয়া যান ও ট্যাংককে থামিয়ে দেওয়া। কারণ যুদ্ধে গতি হারালে সহজে তাদের প্রতিরোধ বা ধ্বংস করাও সম্ভব হবে। বা কোণঠাসা করে এমন অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে, যেখানে আক্রমণ চালিয়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করা যাবে।
এছাড়া, মাইলের পর মাইল জুড়ে পরিখা, পিলবক্স (কংক্রিটের সুরক্ষিত সেনা অবস্থান), বাঙ্কারসহ ছোট অনেক অবকাঠামো নির্মাণ করছে রাশিয়া, যার আড়ালে অবস্থান নিয়ে শত্রুর দিকে গুলি ছুঁড়তে পারবে সেনারা।
এসব প্রতিরোধ কাঠামো নিঃসন্দেহে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর আক্রমণ গতি কমাতে পারবে, তবে সেজন্য এসব স্থানে যথেষ্ট সংখ্যায় রুশ সেনাদের মোতায়েন করতে হবে।
বিষয়টির ব্যাখ্যা করে, মার্কিন চিন্তক সংস্থা– ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো ফিলিপ ওয়াইলিউস্কি বলেন, অবস্থানগুলো সেনাহীন অবস্থায় থাকলে তা কেবলমাত্র পরিকল্পিত পশ্চাদসরণের ক্ষেত্রেই কাজে লাগবে রুশ বাহিনীর। আর এই ধরনের অপারেশন বাস্তবায়ন সামরিক বিচারে সবচেয়ে দুরূহ কাজগুলোর একটি।
তিনি বলেন, "(শত্রুর আক্রমণ মারাত্মক হলে) রাশিয়ান সেনারা পিছু হঠার সময় এসব প্রতিরোধ স্থাপনা পর্যন্ত আসতে পারবে কিনা তার কোনো গ্যারান্টি নেই। যদি আসতেও পারে, সেখানে তারা চট করেই প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করবে; নাকি আরও পেছন দিকে পালাবে– তাও বলা সম্ভব নয়। যদি এসব জায়গায় আগে থেকেই দৃঢ় সংকল্প ও সুশৃঙ্খল সেনা মোতায়েন না করা হয়– তবে এগুলো মাটিতে খোড়া কিছু গর্ত বৈ অন্য কিছু নয়। তবে যদি সঠিকভাবে সেনা মোতায়েন থাকে, এবং তাদের সমর্থন দিতে গোলন্দাজ কামান, ভ্রাম্যমাণ রিজার্ভ ও রসদ সরবরাহ থাকে তাহলে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে।"
পূর্ব ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর প্রতিরোধ কাঠামোগুলোর সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে স্যাটেলাইটের তোলা চিত্র এবং রেডার ডেটা বিশ্লেষণ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
রেডার ডেটা ভূমিতে আনা পরিবর্তনগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। আর প্ল্যানেট ল্যাবসের কৃত্রিম উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, প্রধান প্রধান মহাসড়কের পাশে গড়ে তোলা পর পর কয়েক সারি প্রতিরক্ষা কাঠামো। রুশ বাহিনীর সম্মুখভাগের ঠিক পেছনের দিকেই এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।
এদিকে বাখমুতের লড়াই এখন তুঙ্গে, কামানের গোলায় শহরটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে দিতে অগ্রসর হচ্ছে রুশ সেনারা। বাখমুতের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে গত দুই সপ্তাহ ধরেই ধীরে ধীরে অগ্রগতি হচ্ছে তাদের। একইসঙ্গে, তারা প্রতিরোধ কাঠামোও গড়ে তুলেছে, যাতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর আকস্মিক পাল্টা-আক্রমণের শিকার হলে– সেখানে পিছু হটে অবস্থান নিতে পারে।
পেছনে কিছুটা সরে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলাটা রাশিয়ার জন্য সুবিধেজনকই হবে। এর আগে এই ব্যবস্থা না থাকায় সেপ্টেম্বরে খারকিভ অঞ্চল থেকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে পিছু হঠতে হয় রুশ সেনাদের। সেখানে হাজার হাজার বর্গমাইল এলাকা ও বিপুল সামরিক সরঞ্জাম পেছনে ফেলে আসে তারা।
তাই এবার আক্রমণের পাশাপাশি প্রতিরোধ কাঠামো তৈরিতেও জোর দেওয়া হয়েছে। যেমন পপসানার কাছে মাত্র ১১ দিনেই একটি প্রতিরোধ কাঠামোর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে রাশিয়ানরা। পপসানা এলাকার স্যাটেলাইট থেকে তোলা চিত্রে দেখা যায়, উন্মুক্ত মাঠের মধ্য দিয়ে প্রতিরোধ কাঠামোগুলো এঁকেবেঁকে আরও উত্তর দিকে চলে গেছে।
রাশিয়ার কিছু সমর বিষয়ক ব্লগাররা রণাঙ্গনের সম্মুখভাগে প্রতিরোধ লাইন নির্মাণ নিয়ে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন। সামাজিক মাধ্যম টেলিগ্রামের এক পোস্টে সাবেক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইগর স্ট্রেলকভ বলেন, খেয়ালখুশি মতো (সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া) এসব দীর্ঘমেয়াদি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কৌশল বেছে নেওয়া রাশিয়ান ফেডারেশনের জন্য আত্মঘাতী হয়েছে'।
ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার বা পরিখার যুদ্ধ উনবিংশ ও বিংশ শতকের বড় বড় যুদ্ধেই বেশি দেখা গেছে। কিন্তু, আধুনিক যুদ্ধেও পরিখা বা অন্যান্য বাধা– শত্রুর আক্রমণের ধার ভোঁতা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে বাধ্য হয়ে বিশেষ কোনো দিককে আক্রমণের জন্য বেছে নিতে হয় শত্রুকে। এভাবে তাদের অভিযানকে নিজেদের সুবিধে অনুসারে রূপ দেওয়ার সুযোগ থাকে প্রতিপক্ষের। এমনটাই ব্যাখ্যা করেন ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো বেন ব্যারি।
তিনি বলেন, 'পূর্বে প্রস্তুত করা অবস্থান থেকে লড়াই করার সুবিধা লাভই হলো প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো গড়ে তোলার প্রধান উদ্দেশ্য'।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে কুরস্কের ময়দানে জার্মান বাহিনীর আক্রমণকে এই কৌশলে পরাজিত করেছিল সোভিয়েত লাল ফৌজ। ব্যারি বলেন, মস্কো এই পদ্ধতিকে রাশিয়ার প্রতিরোধ যুদ্ধের মডেল মনে করে।
"যেমন ধরুন যুদ্ধকালে, তারা জানতো জার্মানরা সেখানে (কুরস্কে) আক্রমণ করতে আসছে। ফলে তারা অনেক সারিতে একের পর এক প্রতিরোধ লাইন গড়ে তোলে। বেছানো হয় মাইলের পর মাইল জুড়ে ভূমিমাইনসহ নানান রকম প্রতিবন্ধক। শত্রুর হামলা মোকাবিলায় রিজার্ভ হিসেবে অতিরিক্ত সেনাও রেখেছিল তারা'।
আধুনিক যুদ্ধে অবশ্য পরিখার বেশ কিছু দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। যেমন অনেক পরিখাই পুরোপুরি উন্মুক্ত বা উপরের দিকে কোনো সুরক্ষা নেই। এতে করে সহজেই সেগুলো ড্রোন দিয়ে শনাক্ত করা যায়। তারপর শত্রুর গোলাবর্ষণের শিকার হয়। এর আগে রাশিয়ার পরিখায় নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম– পশ্চিমাদের দেওয়া এমন কামান থেকে গোলাবর্ষণ করেছে ইউক্রেন।
পরিখাগুলো ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর কামানের রেঞ্জের মধ্যে থাকায় এই ঝুঁকি এড়ানো যাবে না। আর সেজন্যই অনেকে এই কৌশলের সমালোচনা করেছেন। আর কার্যকারিতা নিয়েও তুলেছেন প্রশ্ন।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউক্রেনের স্তাভো শহরের কাছে এমন একটি রুশ পরিখায় ইউক্রেনের গোলাবর্ষণে অনেক রুশ সেনা হতাহত হয়েছে।
এর আগে গত নভেম্বরে এক প্রতিবেদনে মার্কিন গবেষণা সংস্থা- ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অভ ওয়ার জানায়, দনিপ্রো নদীর উত্তর পাড় থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার আগেই অক্টোবরে দক্ষিণ খেরসনে প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো গড়ে তোলে রাশিয়া। এতে প্রমাণিত হয়, আবারো প্রমাণ হয় রুশ বাহিনী আর বিপুল এলাকার অধিকার হারাতে চায় না, যা তাদের বহু রক্তক্ষয়ে অর্জন করতে হচ্ছে।
