বিদেশের মাটিতে সর্বোচ্চ মোতায়েন, এবার রাশিয়ায় ৩০ হাজার সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা উ. কোরিয়ার
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ায় আরও প্রায় ৩০ হাজার সামরিক সদস্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, এটিই হবে বিদেশের মাটিতে কোরীয় পিপলস আর্মির ইতিহাসের সবচাইতে বড় মোতায়েনের ঘটনা। তথ্যটি নিশ্চিত হওয়া গেলে, উত্তর কোরীয় বাহিনী একটি আধুনিক ও বড় পরিসরের স্থলযুদ্ধে অংশ নেওয়ার এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, যার সমকক্ষ খুব কম দেশই রয়েছে। ফলে পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপ—উভয় অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলে এসব অতিরিক্ত সেনা গ্রহণের জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং এই কাজ গত জুন মাস থেকেই চলছে। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অতিরিক্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার (উৎক্ষেপক যান) সরবরাহ করারও পরিকল্পনা করছে।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরেই দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা– ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বা এক প্রতিবেদনে জানায়, উ. কোরীয় পিপলস আর্মি রাশিয়ায় আরও কয়েক হাজার সামরিক সদস্য স্থানান্তর করা শুরু করেছে। এসব বাহিনী ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে প্রত্যক্ষ সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। ওই গোয়েন্দা সংস্থাটি জানায়, ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা পাহারা ও সুরক্ষামূলক কাজের জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং আরও এক হাজার সামরিক প্রকৌশলী মাইন অপসারণ অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে। যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার এই সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে দেশটির সামরিক বাহিনী কেবল ন্যাটোর ব্যবহৃত সরঞ্জাম সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্যই পাচ্ছে না, বরং সরাসরি সেসব অস্ত্রশস্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামরিক সদস্য পাঠানোর পাশাপাশি ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, যে আলবুগা কারখানায় রাশিয়া 'গেরান-২' ড্রোন তৈরি করে, সেখানে উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করার জন্য উত্তর কোরিয়া ৫ হাজার শিল্প শ্রমিক পাঠিয়েছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণে উত্তর কোরীয় অস্ত্রও সরবরাহ করা হয়েছে, যা কেবল তাদের উন্নত সক্ষমতার জন্যই নয়, বরং বিশাল পরিমাণে সরবরাহের সক্ষমতার কারণেও সমাদৃত হচ্ছে। গোয়েন্দাদের একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষের দিকেই উ. কোরিয়া রাশিয়ায় ৬০ লাখের বেশি আর্টিলারি গোলা বা কামানের গোলা সরবরাহ করেছে। সরবরাহকারী দেশ হিসেবে উ. কোরিয়ার এই গুরুত্বের মূল কারণ হলো, যুদ্ধ শুরুর আগে শান্তিকালীন সময়েও তাদের সক্রিয় সামরিক বাহিনীর আকার— বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে রাশিয়ার নিজস্ব বাহিনীর চেয়েও অনেক বড় ছিল—বিশেষ করে তাদের আর্টিলারি বা কামান বাহিনী ছিল রাশিয়ার চেয়ে কয়েকগুণ বড়। ১৭০ মিলিমিটারের মোবাইল হাউইৎজার এবং 'বুলসে-৪' ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মতো কিছু সরঞ্জাম– চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
রাশিয়ার বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, উচ্চমানের প্রশিক্ষণের জন্য উত্তর কোরীয় সেনাদের বিশেষ মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ইউক্রেনের মূলত বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় আসা (কনস্ক্রিপ্ট) সেনাদের তুলনায় তো বটেই, এমনকি রুশ সেনাবাহিনীর অনেক ইউনিটের চেয়েও প্রশিক্ষণে তারা বেশ এগিয়ে রয়েছে। উ. কোরীয় বাহিনীর এই উচ্চমানের প্রশিক্ষণ ঐতিহাসিকভাবে বারবার প্রমাণিত হয়েছে—কোরীয় যুদ্ধের শুরুর দিকে কোরীয় পিপলস আর্মি যখন মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীকে টানা তিন মাস পিছু হটতে বাধ্য করেছিল, কিংবা সিরিয়া যুদ্ধে যখন দেশটির বিশেষ বাহিনীকে বিদ্রোহ দমনে সহায়তার জন্য সীমিত পরিসরে মোতায়েন করার খবর এসেছিল। যদিও কুরস্ক অভিযানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে সহায়তা করতে ন্যাটোর সদস্য দেশের বলয়ভুক্ত বাহিনী, যেমন মার্কিন 'ফরওয়ার্ড অবজারভেশন গ্রুপ'-এর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তবে কুরস্কে তারা উ. কোরীয় সেনাদের মুখোমুখি সংঘাতের জড়িয়েছিল কি না বা কতটুকু জড়িয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মধ্যে রুশ সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত আর্টিলারি গোলার প্রায় অর্ধেকই ছিল উ. কোরিয়ার তৈরি। এমনকি অনেক রুশ আর্টিলারি ইউনিট প্রায় পুরোপুরি উ. কোরিয়ার সরবরাহ করা গোলাবারুদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সে সময়ে রুশ সেনাবাহিনীর অন্তত ছয়টি আর্টিলারি ইউনিট তাদের মোট গোলাবারুদের ৫০ থেকে ১০০ শতাংশই পেয়েছিল দূরপ্রাচ্যের এই দেশ থেকে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে সামনের সারির যুদ্ধে রুশ বাহিনীকে সহায়তা দিতে ১৭০ মিলিমিটারের সেলফ-প্রোপেল্ড আর্টলারিসহ কোরীয় পিপলস আর্মির সামরিক ইউনিটগুলো পাঠানো শুরু হলে—এ সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়া উ. কোরিয়ার কাছে নতুন 'সু-৫৭' পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বিক্রির পাশাপাশি তাদের পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচিতে সহায়তা দিয়ে উ. কোরিয়া থেকে কেনা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মূল্য আংশিকভাবে শোধ করার চেষ্টা করবে। কারণ মানবচালিত যুদ্ধবিমান উৎপাদনে উ. কোরিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প পিছিয়ে রয়েছে। আর যেসব বিমান তারা উৎপাদন করছে, সেগুলোও পুরোনো বিদেশি (চীনা ও রুশ) প্রযুক্তির কপি, যা কিনা তাদের বাহিনী আধুনিকায়নের চাহিদা মেটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়।
