সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতাকে ‘ওয়ান্টেড’ তালিকাভুক্ত করল রাশিয়া
ক্রেমলিন এবং রাশিয়ায় জন্মগ্রহণকারী ধনকুবের পাভেল দুরোভের মধ্যে ক্রমাগত বাড়তে থাকা বিরোধের জেরে এবার টেলিগ্রামের এই প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে। সেইসঙ্গে তাকে আন্তর্জাতিকভাবে 'ওয়ান্টেড' তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে রাশিয়া।
দুরোভের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি তার অ্যাপ থেকে এমন কিছু চ্যাট বা বার্তা মুছে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা মস্কোর দাবি অনুযায়ী ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করছিল। তাকে 'সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে সুবিধা' দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এর জবাবে টেলিগ্রামের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে ৪১ বছর বয়সী দুরোভের একটি ছবি পোস্ট করা হয়, যেখানে তাকে ক্যামেরার দিকে মধ্যমা প্রদর্শন (অশালীন ইঙ্গিত) করতে দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) জানিয়েছে, কিয়েভের গোয়েন্দারা রুশ নাগরিকদের প্রলুব্ধ করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করতে টেলিগ্রামের একটি 'হানিট্র্যাপ' চ্যানেল ব্যবহার করছিল।
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা তরুণী সেজে রুশ পুরুষদের সাথে যোগাযোগ করত এবং পরে তাদের ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক 'নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে' লিপ্ত হতে বাধ্য করত।
বিদেশি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং ইন্টারনেটের ওপর নজরদারি বাড়ানোর অংশ হিসেবে চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকেই রাশিয়ায় টেলিগ্রাম অ্যাপটি নিষিদ্ধ রয়েছে।
অবশ্য দেশটিতে অ্যাপটি নিষিদ্ধ হলেও ক্রেমলিন এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ রাশিয়ার বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এখনো তাদের দৈনন্দিন তথ্য প্রকাশের জন্য নিয়মিত এই অ্যাপটি ব্যবহার করে আসছে।
ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্র
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান যুদ্ধে এই অ্যাপটিকে একটি 'ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্র' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বর্তমানে উভয় পক্ষের সরকারি কর্মকর্তা, সেনাসদস্য এবং প্রভাবশালী ব্লগাররা নিয়মিত এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করছেন।
এফএসবি জানিয়েছে, এই অ্যাপের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে পরিবহন, যোগাযোগ এবং আর্থিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর অভিযোগে গত এক বছরে ১২ থেকে ২২ বছর বয়সী ৪৬ জন রুশ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এফএসবি তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউক্রেনীয়রা যেন রাশিয়ার ভেতরে 'নাশকতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, গণহত্যামূলক অপরাধ এবং সাইবার জালিয়াতির প্রস্তুতি ও সমন্বয় করতে পারে'—সেজন্য ব্যবহৃত অসংখ্য চ্যানেল, চ্যাট ও বট মুছে ফেলতে 'ব্যর্থ হয়েছে' টেলিগ্রাম।
তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাভেল দুরোভ। তার দাবি, কনটেন্ট মডারেশন এবং অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে টেলিগ্রাম তার নির্ধারিত দায়িত্বের চেয়েও বেশি ভূমিকা পালন করেছে।
এফএসবির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুরোভকে আন্তর্জাতিক ওয়ান্টেড তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তবে রাশিয়া ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বা কার মাধ্যমে এটি করবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মস্কো যদি দুরোভের বিরুদ্ধে একটি 'রেড নোটিশ' জারির অনুরোধও করে, তাহলেও সেই প্রক্রিয়াটি খুব একটা দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বর্তমানে দুবাইতে বসবাস করেন দুরোভ। মস্কোর সাথে দুবাইয়ের চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবে দুরোভকে রাশিয়ার হাতে তুলে দিলে প্রযুক্তিবান্ধব ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার এক আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে দুবাইয়ের যে বৈশ্বিক ভাবমূর্তি রয়েছে, তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এর আগে ২০২৪ সালে ফ্রান্সেও একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন দুরোভ। সে সময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—টেলিগ্রাম প্ল্যাটফর্মে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের অনুরোধে সাড়া দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। পরবর্তীতে তদন্ত চলাকালীনই তাকে ফ্রান্স ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
