বাহাদুর শাহ পার্ক: ঢাকার ঔপনিবেশিক অতীতের এক জীবন্ত দলিল
বাহাদুর শাহ পার্কের চার দিক থেকে সাতটি সড়ক ছড়িয়ে গেছে—যেগুলো মানুষকে নিয়ে যায় শাঁখারীবাজার, রায়সাহেব বাজার, লক্ষ্মীবাজার ও সদরঘাটের দিকে। এটি বাহাদুর শাহ পার্ক, আন্টাঘর ময়দান অথবা ভিক্টোরিয়া পার্ক—সব নামেই পরিচিত। আদালত, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও বাণিজ্যকেন্দ্র ঘিরে রেখেছে পার্কটিকে।
৮৫ কাঠার এই ছায়াসুনিবিড় পার্কটি স্থানীয়দের নিশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দেয়। প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার মানুষ স্বাস্থ্যচর্চা কিংবা দুদণ্ড জিরিয়ে নিতে এখানে আসেন।
১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে এই বাহাদুর শাহ পার্কেই শেষনিশ্বাস ফেলেছিলেন কফুর খাঁ ও দীন দয়াল মিশ্র। কফুর খাঁ অসুস্থ ছিলেন। ২২ নভেম্বর কেল্লার ভেতরেও ছিলেন না তিনি। তবু বিদ্রোহের অভিযোগে পার্কের পামগাছে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। লালবাগ কেল্লায় তখন ২৬০ জন নেটিভ সিপাহি ছিলেন।
মীজানুর রহমান 'ঢাকা পুরাণ'-এ লিখেছেন, 'সিপাহিদের এই সংঘর্ষটিকে ঢাকাবাসী লাল পল্টন ও কালা পল্টনের, তথা সোজা কথায় কালা-ধলার লড়াই বলে জেনে আসছে। অথচ এটাই ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম প্রকাশ।'
দুই তোলা রুটি
হাতের তালুর সমান চাপাতি নামের এক গোল রুটি তখন ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতজুড়ে। রুটিগুলো হতো যব বা গমের তৈরি। ওজন ছিল দুই তোলা।
রুটি ছড়িয়ে দিচ্ছে যারা, তাদের ধরতে ঘাম ছুটে যাচ্ছিল ব্রিটিশ শাসকদের। ফকির-সন্ন্যাসীর বেশ ধরে ব্রিটিশবিরোধীরা বয়ে আনছিল রুটিগুলো। সঙ্গে জানিয়ে দিচ্ছিল, যে একটি রুটি পাবে, সে যেন আরও পাঁচটি রুটি তৈরি করে আরও পাঁচ গ্রামে পৌঁছে দেয়।
ইতিহাসবিদ হাসেম সূফী বললেন, 'এ রুটিগুলোই বিপ্লবের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ভারতীয় সিপাহিদের প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিল। বাংলায় রুটিগুলোর আঞ্চলিক সংস্করণ ছিল অধিক আঁচে কালচে হয়ে যাওয়া পোড়া রুটি। বার্তা কিন্তু একই—অত্যাচারী ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দাও, নিজের দেশের শাসন নাও নিজের হাতে।'
হাসেম সূফীর ভাষায়, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ হলো ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ। এর বীজ রোপিত হয়েছিল পলাশীতে বাংলার সূর্য ডোবার পরপরই।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্যাতন-নিষ্পেষণে বাংলায় দেখা দিয়েছিল একের পর এক দুর্ভিক্ষ। সইতে না পেরে কৃষকেরাও সশস্ত্র বিদ্রোহে জড়িয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল ফকির-সন্ন্যাস বিদ্রোহ, রংপুর বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন ইত্যাদি।
তারপর আসে ১৮৫৭। কোম্পানি শাসনের ১০০ বছর পূর্ণ হয় তখন। সিপাহি বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতে।
ভয় পেয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশরা
মার্চ মাসে বিদ্রোহের সূচনা হয় পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরে। তবে বড় ঢেউ ওঠে মে মাসে মিরাটে। দিল্লি থেকে মিরাটের দূরত্ব মাত্র ৪০ মাইল।
মিরাটে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ার অল্পকালের মধ্যেই সিপাহিরা দিল্লিতে পৌঁছে যান। তাদের লক্ষ্য ছিল মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে হিন্দুস্তানের বাদশাহ ঘোষণা করা।
বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র থেকে ঢাকা অনেক দূরে। তবু ব্রিটিশ সাহেবরা মার্চ মাস থেকেই সংঘর্ষের আশঙ্কা করছিলেন। আতঙ্কে ভুগছিলেন তারা। অনেকে সবকিছু ফেলে শহর ছাড়ার পরিকল্পনাও করছিলেন।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার 'ঢাকা ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ দলিলপত্র' বইতে লিখছেন, 'দেশি সিপাহিরা তখন থাকতেন লালবাগে, পরিচিত ছিলেন কালা সিপাহি নামে। ইংরেজ সিপাহিদের বলা হতো গোরা সিপাহি। কালা সিপাহিরা ছিলেন শক্ত সমর্থ, অমায়িক।'
হাসেম সূফী বললেন, 'সিপাহিরা শহরবাসীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। সক্রিয় কোনো ভূমিকা না রাখতে পারলেও সমর্থন ঠিকই ছিল সিপাহিদের প্রতি। ব্রিটিশদের অধিক ভয়ের কারণ ছিল এটাই।'
অন্ধকারে বসে ছিল ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে
মিরাটে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকা হয়ে ওঠে গুজবের রাজ্য। ১২ জুন মিলব্যারাকের এক ব্যক্তিই গোটা শহরে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি জনে জনে বলে বেড়িয়েছিলেন, জলপাইগুড়ির দুই পদাতিক নেটিভ কোম্পানি ব্যারাকপুর থেকে ছাঁটাই হওয়া সিপাহিদের সঙ্গে একত্র হয়ে লালবাগে এসে জড়ো হয়েছে। তারা বাজার লুটপাট করছে এবং জেল থেকে বন্দীদের মুক্ত করেছে।
আতঙ্কগ্রস্ত ওই ব্যক্তি ম্যাজিস্ট্রেট কিনসের বাসায় এসে আশ্রয় নিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট কাছারির পুলিশরা যে যেদিকে পারল পালাল। ছাত্ররা ভয়ে কলেজ ছাড়ল। খালি হয়ে গেল অফিস-আদালত।
শহরের ধনী ব্যক্তিরা যে যতটা পারলেন চাল-ডাল কিনে নিল। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে অন্ধকারে বসে থাকল। যার যা আছে, মাটিতে পুঁতে রাখতে শুরু করল।
পরে জানা গেল, পুরো খবরটিই ভিত্তিহীন। লে. ম্যাকমোহন লালবাগ গিয়ে দেখে এলেন, সিপাহিরা শান্ত। তারা স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যস্ত।
তবে যা রটে, তা বটেও। বিদ্রোহী সিপাহিরা ইতিমধ্যেই প্রচারকার্যে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ফকির-সন্ন্যাসীর বেশে যেখানে যাচ্ছিলেন, সেখানেই বিদ্রোহের বীজ বুনছিলেন। সুতরাং ঢাকায় তারা আসেননি, সে কথাও নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না।
পরের দিনই ইউরোপীয়রা কমিটি অব সেফটি গঠন করেন। জুন মাসের মাঝামাঝিতে দেড় শ নৌসেনা নিয়ে লে. লুইস ঢাকায় পৌঁছান ইউরোপীয়দের রক্ষা করার জন্য। তাঁরা আস্তানা গেড়েছিলেন আজকের বাহাদুর শাহ পার্কের কাছের এক বাড়িতে।
উত্তেজনা চরমে ওঠে নভেম্বরের ২১ তারিখে
কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় ঢাকার সিপাহিদের নিজ থেকে কিছু করা সম্ভব হচ্ছিল না। তা ছাড়া বিশ্বস্ত ভেবে ঢাকার সিপাহিরা নবাব আব্দুল গণি খানের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনাও করতেন।
তবে তারা যে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, সে খবর অজানা রইল না ব্রিটিশদের কাছে। অক্টোবর মাসেই সিপাহিদের ভেতরকার অবস্থার কিছুটা আভাস পাওয়া গেল।
এই আশঙ্কা থেকেই ৩০ জুলাই ঢাকার ইউরোপীয়রা বর্তমান ঢাকা কলেজের [জজকোর্ট ভবন] সামনে একটি সভার আয়োজন করেন। আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেখানে পদাতিক ও ঘোড়সওয়ার বাহিনী নামে দুটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়।
পদাতিক বাহিনীর নেতৃত্বে মেজর স্মিথ এবং ঘোড়সওয়ার বাহিনীর নেতৃত্বে লেফটেন্যান্ট হিচিনসনকে নিয়োগ করা হয়। ইংরেজ সৈন্যদেরও দুই ভাগে ভাগ করা হয়। রাতেও লালবাগ দুর্গের বাইরে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়।
আগস্ট মাস থেকেই লেফটেন্যান্ট টি ই লুইসের নেতৃত্বে গুর্খা সৈন্য দিয়ে লালবাগ অবরোধ করে রাখা হয়েছিল। জলপাইগুড়ি থেকে কোনো নির্দেশ না আসা পর্যন্ত লালবাগের সিপাহিরা অবশ্য চুপচাপই ছিলেন।
কিন্তু ভয় বিরাজ করছিল গোটা শহরে। সে বছর বকরি ঈদ, গির্জার উপাসনা (আগস্ট মাস), মহররমের মতো দিনেও স্বেচ্ছাসেবক দল ও ঘোড়সওয়ার বাহিনী সারা রাত টহল দিয়েছিল। ভয়ে অনেক আর্মেনিয়ান শহর ছেড়ে কলকাতায় চলেও যান।
সেপ্টেম্বর মাসটাও কেটেছিল উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। তবে উত্তেজনা চরমে ওঠে নভেম্বরের ২১ তারিখে। সেদিন চট্টগ্রামে সিপাহিদের বিদ্রোহের খবর ঢাকায় পৌঁছায়।
কারণ, এবার আর ঢাকার সিপাহিদের আটকে রাখা যাবে না।
সেই দিনই লেফটেন্যান্ট লুইস ঢাকার সামরিক ও বেসামরিক লোকদের নিয়ে একটি বৈঠক ডাকেন। সিদ্ধান্ত হয়, দেশি সিপাহিদের নিরস্ত্র করা হবে। ২২ নভেম্বর ভোর পাঁচটায় স্বেচ্ছাসেবকদের জড়ো হতে বলা হয়।
নির্দিষ্ট সময়ে কমিশনার, জজ, কিছু বেসামরিক ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবকেরা নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হন। দলটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
একটি দল লালবাগের দিকে রওনা হয়ে নৌসেনাদের সঙ্গে মিলিত হয়। অন্য দলটি প্রহরীদের নিরস্ত্র করতে যায় সরকারি তোষাখানার দিকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে নিরস্ত্র করা হয় তোষাখানার সিপাহিদের। পরে প্রধান কার্যালয়রক্ষক সিপাহিদের। তারপর মালগুদামের সিপাহিদের পালা।
কোনো জায়গাতেই বাধা পাওয়া যায়নি। বাধা এল লালবাগ দুর্গ থেকে।
ঢাকার সিপাহিদের বহু বিলম্বিত বিদ্রোহ এবার সশস্ত্র রূপ নিল। কেল্লার ভেতরে শুরু হয় ইংরেজ নৌসেনাদের সঙ্গে দেশীয় সৈন্যদের সংঘর্ষ।
আত্মসমর্পণ না করে, মাথা না নত করে, অস্ত্র না তুলে দিয়ে সিপাহিরা সেদিন লালবাগ দুর্গে প্রাণপণ যুদ্ধ করেন। পৌনে এক ঘণ্টার সেই যুদ্ধে ৪১ জন সিপাহি নিহত হন।
অনেকে গুরুতর জখম হন। কেউ কেউ প্রাণে বাঁচতে জলপাইগুড়ির দিকে রওনা হন। পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের মধ্যে তিনজন নদীতে ডুবে মারাও যান। ইংরেজদের মধ্যে নৌসেনা নিহত হন তিনজন।
অবশ্য এ সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে ভিন্নমতও আছে। ১৮৫৭ সালে ব্রেনান্ড ছিলেন ঢাকা কলেজের গণিতের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ। তার রোজনামচায় তিনি লিখেছেন, নৌসেনারা লালবাগ পৌঁছে সিপাহিদের প্রস্তুত দেখেছিলেন। সম্ভবত তারা আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিলেন। নৌসেনারা ভেতরে প্রবেশ করামাত্র উড়ে এসেছিল একঝাঁক গুলি।
আবার 'দ্য রেমিনিসেন্সেস অব ঢাকা' বইয়ের লেখক ও ইতিহাসবিদ হৃদয়নাথ মজুমদার লিখছেন, ২২ নভেম্বর সিপাহিরা কোনো আক্রমণ আশা করেননি। নিরুদ্বেগে তাঁরা ঘুমিয়েছিলেন।
গুলিবর্ষণের শব্দে বিমূঢ় হয়ে গেলেও বিপদ দেখে দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সুবেদার চাবি দিতে অস্বীকার করলে অস্ত্রের অভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল সিপাহিদের।
প্রহসনমূলক বিচার
ঢাকা জেলা গেজেটিয়ারের বর্ণনা থেকেও জানা যায়, সিপাহিরা ২২ নভেম্বর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। আকস্মিক আক্রমণে হতভম্ব সিপাহিরা স্বল্পসংখ্যক অস্ত্র ও সামান্য গোলাবারুদ নিয়ে ইংরেজদের বিপুল অস্ত্রের বিরুদ্ধে সারা দিন যুদ্ধ করে যান।
কিন্তু এরপর একে একে ধরা পড়তে থাকেন তারা। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন আহত। যারা পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ ধরা পড়তে থাকেন।
তাদের এবং দুর্গে বন্দী সিপাহিদের নিয়ে ২৩ নভেম্বর বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের অদূরে জজের কাছারিতে এক প্রহসনমূলক বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বিচারকার্য চলে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
তবে প্রাথমিকভাবে ২৪ নভেম্বর জেলা জজ তিনজনকে ফাঁসির নির্দেশ দেন। শহরে ছড়িয়ে পড়ে, আগামী ২৮ নভেম্বর গির্জার সামনের ময়দানে বিদ্রোহীদের ফাঁসিতে ঝোলানো হবে।
'অনুরোধ মঞ্জুর'
২৮ নভেম্বর তাদের বাহাদুর শাহ পার্কে গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কফুর খাঁ ছিলেন একজন। তার বাড়ি ছিল ফয়েজাবাদে। বয়স ছিল আটাশ।
কফুর খাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও যুদ্ধ করা, পলায়ন করা এবং সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা। অভিযোগের উত্তরে কফুর খাঁ বলেছিলেন, 'যখন সিপাহিদের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছিল, তখন আমি লাইনের বাইরে ইছা মিয়ার বাড়ির নিকট লাইন থেকে প্রায় দেড় শ কদম দূরে এক বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। এর কারণ এই যে আমি অসুস্থ ছিলাম, হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিয়ে খেতাম এবং সেখানে থাকতাম। আমি কখনো সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিনি।'
এরপরও কফুর খাঁকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল। সঙ্গে আরও দুজন। তাদের মধ্যে একজন দীন দয়াল মিশ্র। আরেকজন হোসেন বক্স। তিনিও ছিলেন আহত সিপাহি।
২৮ নভেম্বর এল। সবকিছু একদম সাজানো-গোছানো, শৃঙ্খলিত। নির্ধারিত সময়ে নাবিক ও স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে মাঠটি সুরক্ষিত রাখা হলো।
'আসামি' তিন সিপাহিকে নিয়ে আসা হলো একদল দেশীয় পুলিশের পাহারায়। সময়মতো দলে দলে লোক এসে ভিড় জমাতে থাকল ময়দানের সামনে। যারা জায়গা পাচ্ছিলেন না, তারা শহরের অন্যান্য স্থান থেকে, যেখান থেকে ফাঁসির মঞ্চটি দেখা সম্ভব, সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়তে লাগলেন।
আহত দুজন কফুর খাঁ ও হোসেন বক্স এতই দুর্বল ছিলেন যে ফাঁসিকাষ্ঠে ওঠার ব্যাপারে তাঁদের সাহায্য করতে হলো। বাকি জন দীন দয়াল মিশ্র নিজেই উঠে গেলেন।
মৃত্যুর আগে শুধু একটি অনুরোধ করেছিলেন তিনি। ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছিলেন, তাঁর চিতাভস্ম যেন নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। 'অনুরোধ মঞ্জুর'—এ কথাটি জেনেই ফাঁসির কাষ্ঠে উঠেছিলেন তিনি। এরপর লিভারটি ধরে টান দেওয়ার পালা।
২৮ নভেম্বরের সেই হিম সকালে যখন ফাঁসির লিভারটি টানা হলো, চারপাশের জনতার ঢেউ থেকে ভেসে এসেছিল একটি দীর্ঘ চাপা আর্তনাদ...যেন এমন সাহস ভবিষ্যতে আর কেউ না করে
তাদের ফাঁসির খবর পাওয়া যায় আলেকজান্ডার ফর্বেস সম্পাদিত 'ঢাকা নিউজ' থেকে, 'গত বৃহস্পতিবার সকালে, ঠিক সাতটার সময় চারজন বিদ্রোহী, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, রোববার অপরাহ্নে তাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল গির্জার উল্টো দিকে ফাঁকা জায়গায় তৈরি ফাঁসিকাষ্ঠে। ফাঁসির মঞ্চে ডান দিকে ছিল স্বেচ্ছাসেবী, পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী। তিনজন বিদ্রোহী নিজেরাই গলায় দড়ি ঝুলিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন সাহসের সঙ্গে। তাদের আহত বন্ধুদের হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এ দৃশ্য দেখার জন্য।'
সব মিলিয়ে ১১ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল আন্টাঘর ময়দানে। সৎকারের জন্য লাশ আত্মীয়স্বজনের কাছে না দিয়ে গাছেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যাকে কথা দেওয়া হয়েছিল—মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হবে, তাকেও হয়তো ঝুলিয়েই রাখা হয়েছিল।
একসময় সেগুলো শকুনের খাবারে পরিণত হলো। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। মাংসও খসে পড়তে শুরু করল। শেষে ঝুলতে থাকল শুধু কঙ্কাল।
হৃদয়নাথ লিখেছেন, 'আন্টাঘরের ময়দানে এই শোচনীয় হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার পর থেকে ঢাকার লোক জায়গাটিকে ভয়ের চোখে দেখত। বাংলাবাজার, শাঁখারীরবাজার, কলতাবাজার এবং চারদিককার অন্যান্য মহল্লার লোকদের মধ্যে এ নিয়ে নানা রকম গল্প চলতি ছিল। রাত্রিবেলা নিহতদের প্রেতাত্মারা নাকি ময়দানে ঘুরে বেড়াত এবং সেখান থেকে নাকি আর্তনাদ ও নানা রকম বিকট শব্দ শোনা যেত। সন্ধ্যার পর ভয়ে ওদিক কেউ মাড়াত না।'
আন্টাঘর ময়দানকে কেন ফাঁসির মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হলো? কেন সিপাহিদের গাছে ঝুলিয়ে রাখা হলো দিনের পর দিন?
উত্তরে হাসেম সূফী বললেন, 'আন্টাঘর ময়দান তখন ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। কাজেই শহরবাসীকে জানান দেওয়ার জন্য এটিই ভালো জায়গা। অনেকে যে গোপনে গোপনে সিপাহিদের সমর্থন দিচ্ছিল, তা ইংরেজদের অজানা ছিল না। তাই আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সিপাহিদের গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল যেন এমন সাহস ভবিষ্যতে আর কেউ না করে।'
আন্টাঘর ময়দান থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক
অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ঢাকায় আর্মেনীয়রা ছিলেন বিত্তবান। তাদের নেতৃত্বে প্রথম ইউরোপীয় স্টাইলের ক্লাব গড়ে ওঠে। নাম আর্মেনীয় ক্লাব। ঘরটি ছিল ওভাল শেপের। মাঝখানে ছিল বিলিয়ার্ড বোর্ড। বিলিয়ার্ড বলগুলো হতো চিনামাটি বা পাথরের তৈরি। দেখতে ছিল আন্ডা বা ডিমের মতো।
ঢাকাইয়ারা ছিল রসিক। আন্ডা খেলার ঘরকে তারা বলত আন্টাঘর। হাসেম সূফীর পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, আন্টাঘরে তাস খেলারও জমজমাট আসর বসত। মদ্যপানের ব্যবস্থা থাকার কথা। খাবার পরিবেশনের জন্য ছিল বেয়ারা।
বিকেল পাঁচটা থেকে রাত ১২টা অবধি খোলা থাকত আর্মেনীয় ক্লাব। হ্যাজাক বাতি ও মশাল দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হতো।
হাসেম সূফীর মতে, আন্টাঘর ছিল হোম অ্যাওয়ে ফ্রম হোম। দূর দেশে ইউরোপীয়দের নিজেদের মতো একটি জায়গা। ছুটির দিনে এখানে ১০০-১৫০ জন মানুষের উপস্থিত হওয়াটা বিচিত্র নয়। শুধু বিনোদনকেন্দ্র ছিল না এটি। ব্যবসায়িক লেনদেন এবং সালিস-মীমাংসাও হতো এখানে।
১৮৫৭ সালে আন্টাঘর ময়দানে সিপাহিদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। জনমনে তৈরি হয় ভীতি। বন্ধ হয়ে যায় আন্টাঘর। ঢাকায় আর্মেনীয়দের প্রভাব কমে যাওয়াও এই বন্ধের পেছনের একটি কারণ।
এরপর ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে এক ডিক্রি বলে ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার নিয়ে নেন। রানির হাতে ভারতবর্ষের শাসনভার হস্তান্তরের ঘোষণা এই পার্কেই সমবেত জনতার সামনে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পার্কটির নাম রাখা হয় 'ভিক্টোরিয়া পার্ক'।
রানি ভিক্টোরিয়ার স্মরণে পার্কের মধ্যেই আছে একটি ওবেলিস্ক। মীজানুর রহমান 'ঢাকা পুরাণে' বলেছেন, 'পার্কের পুব দিকে রেলিংঘেরা শ্বেত পাথরে তৈরি উঁচু বেদিকার ওপর মহারানি ভিক্টোরিয়ার সম্মানে ঢাকার নবাববাড়ির সৌজন্যে প্রতিষ্ঠিত একটি দশ-বারো ফুট উঁচু প্রস্তরস্তম্ভ—ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল ধাঁচে মাথা উঁচু করে আছে।'
এর কিছু কাল পরে ইংরেজরাই আন্টাঘর ময়দান তথা ভিক্টোরিয়া পার্কে প্রতিষ্ঠা করে ইউরোপীয় ক্লাব। আন্টাঘরের মতো এখানেও বিলিয়ার্ড ও তাস খেলা চলত। লন টেনিস ও ব্যাডমিন্টন খেলাও হওয়ার কথা।
খাবারের তালিকায় থাকত চপ, কাটলেট, মিটবল, ফিশ ফ্রাই ইত্যাদি। ক্লাবে প্রবেশাধিকার ছিল না বলে স্থানীয় অভিজাতরা ক্ষুব্ধ ছিলেন।
নোটিশ পাঠিয়েও উত্তর না পেয়ে তারা ক্লাবে হানা দেন। পরে ইউরোপীয়রা বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনে। শর্তসাপেক্ষে স্থানীয় অভিজাতদের ক্লাবে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।
পার্কের মধ্যেই আছে ঢাকার নবাব খাজা আহসান উল্লাহর বড় ছেলে হাফিজুল্লাহর স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। খাজা হাফিজুল্লাহর অকালমৃত্যু ঘটে ১৮৮৪ সালে। আন্টাঘর বা ক্লাবঘরটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহ। সুতরাং, তাদের সঙ্গে তরুণ হাফিজুল্লাহও এখানে আসতেন টেনিস-ব্যান্ডমিন্টন খেলতে—এটাই স্বাভাবিক।
তার স্মৃতি ধরে রাখতেই পার্কের মধ্যে তার বন্ধুরা গ্রানাইট পাথরের একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। পাথরটি কলকাতা থেকে জাহাজে করে আনা হয়। ছোটলাট আড়ম্বরের সঙ্গে এর উদ্বোধনও করেন। ১০-১২ ফুট উঁচু স্তম্ভটি এখনো বর্তমান।
১৮৮৮ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ক্লাব ভিক্টোরিয়া পার্কে ছিল। এরপর ঢাকা ক্লাব নাম নিয়ে আরও দক্ষিণে, আরও বেশি জায়গা নিয়ে সরে যায়। ১৯১০ সালে ঢাকা ক্লাব স্থানান্তরিত হয় শাহবাগ-রমনায়।
১৯২০-এর দশকে ভিক্টোরিয়া পার্ক ঢাকায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এখানে সভা-সমাবেশের আয়োজন করতেন।
বিলাতি পণ্য বর্জন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পার্কটি। এখানে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সমাবেশও আয়োজিত হয়েছে একাধিকবার।
দেশভাগের পরে ১৯৫৮ সালে সিপাহি বিদ্রোহের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্কে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের (ডিআইটি) উদ্যোগে নির্মাণ করা হয় একটি চার কোণাকৃতির স্মৃতিসৌধ।
শহীদ সিপাহিদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত এ সৌধের ওপরের অংশ দেখতে গম্বুজের মতো। একই সঙ্গে পার্কটির নাম পরিবর্তন করে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে রাখা হয় 'বাহাদুর শাহ পার্ক'।
পার্কটি সব সময়ই ঢাকাবাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পৌর করপোরেশন একটি টেলিভিশন সেট স্থাপন করেছিল পার্কটিতে। যাদের ঘরে টিভি নেই, তারা এখানে এসে ভিড় জমাতেন সন্ধ্যার পরে।
২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখানে হাঁটার পথ, গণশৌচাগার, বেঞ্চ, সবুজ উদ্যান, অ্যাম্ফিথিয়েটার গ্যালারি ও পার্কিং নির্মাণ করে। ফলে পার্কে লোকসমাগম আরও বেড়ে গেছে।
সংস্কারের পর ৮৫ দশমিক ৩ কাঠা আয়তনের পার্কটি আরও দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। বর্তমানে পার্কটিতে আছে ঝলমলে আলোর ব্যবস্থা। মেঝেতে বিছানো হয়েছে নুড়িপাথর।
পার্কের চারপাশে চার ফুট গভীর ড্রেনের ব্যবস্থাও আছে। ফলে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয় না।
টিকে থাকলে আন্টাঘরের বয়স দাঁড়াত সোয়া দুই শ বছর। ঘরটি নেই। কিন্তু বিভিন্ন নাম নিয়ে পার্কটি আছে। কত ঘটনার সূতিকাগার এই পার্ক, কত ঘটনার সাক্ষী! তবে এর বড় গৌরব তো ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতার যোদ্ধাদের শেষ আশ্রয় দিয়েছিল জায়গাটি। এ কারণে এর গৌরব ভবিষ্যতেও বাড়বে বৈ কমবে না।
