ঘুরে ঘুরে তিনি মানুষ খোঁজেন, মানুষের মাঝেই বাঁচার স্বাদ পান
ইউনিয়নের নাম ৬ নং পাটারীরহাট। লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর থানার এ ইউনিয়ন উপকূলঘেষা। এর যে গ্রামটির নাম চর ফলকন, সেখানকার দোলন নামের এক ছেলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ত পনেরো বছর আগে। ক্লাসের আরো সহপাঠীর মতো তারও সব বই কিনে পড়ার সুযোগ ছিল না। তাই কয়েকজন মিলে একটি সমিতি করে চাঁদা দিয়ে বই কিনত আর সমবেতভাবে পড়ত। এভাবে তারা একটি পাঠাগারও গড়ে তোলে যেখানে ছিল কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকদের বই। এরপর দলটি এলাকায় সবুজায়নের উদ্যোগ নেয়। তাদের যেহেতু চারা কেনার সামর্থ্য ছিল না তাই নিজেরাই বীজ থেকে চারা ফোটাত আর এজন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও করত। কৃষ্ণচূড়া, মেহগনিসহ আরো সব সৌন্দর্যবর্ধক গাছ দিয়ে তারা গ্রামটিকে সবুজ করে তুলেছিল।
গ্রামে দোলনরা সেবামূলক কাজও করত। ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মেম্বারদের অসাধুতায় গরীব, অসহায় ও বৃদ্ধরা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ভাতা, গরু, ঘর ঠিকমতো পেত না। চেয়ারম্যান তখন দোলনদের দায়িত্ব দেন যেন উপযুক্ত লোক ঠিকমতো প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পান। সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন দোলন ও তার বন্ধুরা।
বার বছর বয়সী লাইজু বেগমের বাল্যবিবাহ ঠেকানোকে দোলন তাদের ওই সময়কার একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বলে মনে করেন। এ কাজে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ওসির সহায়তা পেয়েছিলেন তারা। পরে লাইজু একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয় এবং ভালোভাবে পড়াশোনা করতে থাকে।
দোলনের ভালো নাম মো. মেহেদী হাসান। এসএসসির পর হাজীরহাট উপকূল কলেজে ভর্তি হন দোলন। উপকূলীয় অঞ্চলটির সত্তর ভাগ মানুষের জীবন অনিশ্চিত। তাই সেখানে মানবিক কাজের সুযোগও বেশি। যদিও দোলন নিজের এলাকায় বেশিদিন থাকার সুযোগ পাননি। এইচএসসি পাশ করে তিনি লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হন ইংরেজীতে স্নাতক হওয়ার জন্য। প্রথম বর্ষে পড়াকালেই পুলিশে কনস্টেবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। দোলন পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিয়ে আবেদন করে বসেন। পরীক্ষা এত ভালো হয়েছিল যে জেলায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। যোগ দেওয়ার পরে চট্টগ্রামে তাদের প্রশিক্ষণ হয়। ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি কাজে যোগদান করেন বান্দরবান সদরে।
যেহেতু কম্পিউটার চালনায় তার দক্ষতা ছিল এবং তিনি এইচএসসি পাশ তাই পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে তার পোস্টিং হয়। অফিশিয়াল কাজের সুবিধা হলো এখানে সময় ধরাবাঁধা মানে নয়টা থেকে পাঁচটা। তাই মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দোলনের বেশি অসুবিধা হয়নি। যোগদানের পর দুই মাস কেবল নতুন জায়গার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিরতি নিয়েছিলেন। এর মধ্যে অবশ্য একটা কাজ করলেন- ফাহিম, আফসার, রাফি, পারভেজসহ আরো জনাকয়েক তরুণ নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী দল গড়ে তুললেন। তাদের নিয়ে মাঝে মধ্যেই পাড়া বেড়াতে বের হন। সহায়হীন মানুষদের একটি তালিকা তৈরি করা ছিল উদ্দেশ্য। সাধ্য সীমিত বলে খুব ধীরে সুস্থে তালিকা তৈরির কাজ এগিয়ে নিতে হয়। প্রথমে বালাঘাট মুসলিম পাড়ার ভুলু বেগমকে দোলন সহযোগিতা দিতে চাইলেন। খবর নিয়ে জানলেন তার ২ ছেলে ১ মেয়ে। স্বামী লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত যার প্রতিদিন তিন থেকে চারশ টাকার ওষুধ দরকার হয়। অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে ভুলু বেগমের আয় ১০০ টাকা। ওষুধের খরচ জোগাতে তার খাবার খরচ ফুরিয়ে যায়। এ অবস্থায় তাঁর জন্য ৬০০০ টাকায় ২ গণ্ডা জমি বর্গা নেওয়া হলো। আরো ২০০০ টাকা লাগল বীজ, সার ইত্যাদি কিনতে। এসব নিয়ে ভুলু বেগম জমিতে নামলেন। পুঁই, লাল, ডাটা শাক ইত্যাদি আবাদ করলেন। ফলন এত ভালো হয়েছিল যে বান্দরবানের উপ সহ-কৃষি কর্মকর্তা জমি পরিদর্শন করে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ভুলু বেগম এক মৌসুমে প্রায় ৪৫ হাজার টাকার ফসল বিক্রি করেছিলেন। তৈরি করেছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ। দোলন পেয়েছিলেন নতুন কাজের উৎসাহ।
'কৃষিতেই শান্তি, কৃষিতেই উন্নতি' স্লোগান দিয়ে মুসলিম পাড়ায় একটি সমিতি গড়ে তোলা হয়েছিল যেখানে চক্রাকারে প্রতি ১০ জন নারী এক জনকে সহযোগিতা দিত। শর্ত ছিল প্রতি ঘর থেকে অন্তত একজনকে পড়াশোনা করতে পাঠাতে হবে। ফাহিম ও বন্ধুরা সপ্তাহে তিন দিন সান্ধ্য স্কুল চালাত। স্কুলটি গড়ে তোলা হয়েছিল টিন আর বাঁশ দিয়ে। প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষ্য ছিল সবাইকে স্বাক্ষর করতে শেখানো। ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল আরো ভালো- অনেকে পড়তে ও লিখতে শিখে গিয়েছিল।
মুসলিম পাড়া ছাড়াও কৈক্ষ্যংঝিরি আর মিনঝিরি পাড়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন দোলন ও তার স্বেচ্ছাসেবী দল। ছাব্বিশ বছর বয়সী মরিয়ম বেগমের স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। তবে মরিয়ম ছিলেন কর্মউদ্যোগী। বাবার পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাইছিলেন না। তাকে প্রথমে সেলাইয়ের কাজ শিখতে সহায়তা দেওয়া হলো। তাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পর পাড়ার লোকদের নিয়ে সভা করেন দোলন। বলেন, 'সেলাইয়ের কাজগুলো এখন থেকে যদি আপনারা মরিয়মকে দেন তবে সে স্বনির্ভর হতে পারে, আশাকরি সবাই মিলে আমরা তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারব।' সে থেকে পাড়ার অনেক লোকই বাজারের টেইলার্সে না গিয়ে মরিয়মকে দিয়ে জামা-কাপড় বানাতে থাকে এবং মরিয়মের কষ্ট দূর হয়।
এরপর দোলন বলেন ফাতেমার গল্প। ফাতেমার স্বামী আলাদা সংসার পেতেছিল। ছোট ছোট তিন ছেলে এবং প্রতিবন্ধী এক মেয়ে নিয়ে ফাতেমার দুঃখের শেষ ছিল না। ফসল ফলানোর কাজ জানতেন ফাতেমা। তার জন্য এক চিলতে জমির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি মরিচ ফলাতে থাকেন এবং ফুলের চাষও করেন। প্রতিবন্ধী মেয়েটির জন্য সমাজকল্যাণ দপ্তর থেকে কিছু অর্থ সহায়তা জোগাড় করে দেওয়া হয়। এতে ফাতেমা কিছুটা আলোর মুখ দেখেন।
এরপর আসে করোনাকাল। প্রথমে দোলনরা জনসচেতনতামূলক কাজ করলেন কিছু। লোকদের জানালেন- মাস্ক কেন পড়তে হয়, কীভাবে পড়তে হয়, দূরত্ব রক্ষা করার উপায় ইত্যাদি। এরপর পরিষ্কার কাপড় জোগাড় করে নিজেরা মাস্ক তৈরি বিতরণ করতে থাকলেন। দিন যত যেতে থাকল শ্রমজীবী মানুষের জীবন আরো কঠিন হয়ে পড়ল। রিকশাওয়ালা বা মজুর যারা দিন আনে দিন খায় তাদের আর ধার করারও সুযোগ থাকল না। একবেলা খায় তো আরেকবেলা উপোস যায়। দোলন পুলিশ লাইনে তার সহকর্মীদের কাছে রেশনের চাল-ডাল প্রদানের অনুরোধ জানালেন। অনেকেই মুক্ত হস্তে দান করলেন। কিন্তু লাইনে তখন খুব কড়াকড়ি, বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর বিধি-নিষেধ। ওদিকে দোলনের তো মন মানে না। অভুক্ত মানুষগুলোর চেহারা মনে পড়ে আর বুকের ভিতরে কান্নার স্রোত বয়ে যায়। সন্ধ্যা নামলে পরে তিনি দেয়ালের ওপারে অপেক্ষায় থাকা ফাহিমদের কাছে চাল-ডালের বস্তা তুলে দেন, পরে নিজেও দেয়াল টপকে রাস্তায় নেমে পড়েন। তারপর দুই দলে ভাগ হয়ে যান। একদল রাস্তার পাগল, ভবঘুরেদের খুঁজে বের করে রান্না করা খাবার খাওয়ান এবং অন্যদল পাড়ায় পাড়ায় দিনমজুরদের কাছে চাল-ডাল পৌছে দেন। এই সময়ে ত্রিপুরা আবাসিক হলের এতিম ছেলে-মেয়েদেরকে ব্রাশ, টুথপেস্ট এবং হ্যান্ডওয়াশ কিনে দিয়েছিলেন। করোনাকালের প্রয়োজন মেটাতে দোলন দুই দফায় ব্যাংক থেকে চল্লিশ হাজার করে আশি হাজার টাকা কর্মজীবী লোন নিয়েছিলেন, যা পরে পাঁচ হাজার টাকা করে প্রতিমাসে তার বেতন থেকে কেটে পরিশোধ করা হয়েছিল।
২০২১ সালে দোলন চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে পোস্টেড হন। চট্টগ্রাম এসে তিনি আগের মতোই কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সময় ব্যয় করেন। কিছুকাল পরে দুই বোন ইয়াসমিন বেগম ও পুতুল বেগমকে খুঁজে পান যারা স্বামী পরিত্যক্তা। ভিক্ষাবৃত্তি তাদের পেশা। ইয়াসমিনের দুই মেয়ে লিলি ও মিলি একসময় গার্মেন্টে কাজ করত। দোলন তাদের সেলাই মেশিন কিনে দেন। গার্মেন্ট থেকে কিছু কাজও জোগাড় করে দেন। দিনে দিনে তাদের কাজের চাহিদা বাড়ে। বস্তির লোকেরা তো বটেই আশপাশের ফ্লাটবাড়ির গৃহিনীরাও তাদেরকে কাজ দিতে শুরু করেন। ফলশ্রুতিতে এখন তারা ভালো একটি ঘর ভাড়া করে থাকে, ঘরে টেলিভিশন ও ফ্রিজ আছে।
এর মধ্যে দোলন টাইগার পাসে বন্দনা রানী দাশকে খুঁজে পান। তার স্বামী একজন মানসিক রোগী। ছোট একটি বাচ্চা আছে তার আর শাশুড়িও সঙ্গে থাকেন। বন্দনাকে সেলাই কাজ শেখালে তাঁর রোজগারের ব্যবস্থা হয়। স্বামীর চিকিৎসাও করান কিছু। স্বামী এখন দিন চুক্তিতে একটি হোটেলে কাজ করেন। সদরঘাটের মিজানুর রহমানের গল্পও শোনালেন দোলন। মিজানুরের কোমড়ের নীচ থেকে অবশ। বাইশ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি তার পেশা। দোলন তাকে একটি হুইল চেয়ার কিনে দেন এবং আইস ফ্যাক্টরি মোড়ে তিন ফুট বাই দুই ফুটের একটি চায়ের দোকান তৈরি করে দেন। তার স্ত্রী ও মেয়েকে কিনে দিয়েছেন সেলাই মেশিন।
দোলন ঢাকার লালবাগ থানায় পোস্টিং পান ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে। বাসা ভাড়া নেন কামরাঙ্গীরচরে। সেখানে তিনি নূরজাহান বেগমের দেখা পান যার বয়স নব্বই। এই বয়সেও ১২০ টাকা মজুরিতে ইট ভাঙার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার ছেলেটি নেশাগ্রস্ত। দোলনের ফেসবুকে এই বিষয়ক পোস্ট দেখে আখতার নামে এক সৌদি প্রবাসী তাকে একটি ভ্যান কিনে দেন। সে ভ্যান ভাড়া দিয়ে নূরজাহান বেগম এখন দৈনিক ১৫০ টাকা পান।
যেখানেই পোস্টিং হয় সেখানেই দোলন প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। ঢাকায় আসার পর তিনি নতুন একটি স্লোগান নিয়ে কাজ করছেন, তা হলো-আমরা ঢাকায় বাস করি, কিন্তু ঢাকার জন্য কী করি? তিনি ইতোমধ্যে বিভিন্ন সড়কের ধারে বা রোড ডিভাইডারে গাছের চারা লাগানো শুরু করেছেন। দোলনের সঙ্গে তার বান্দরবান বা চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবী দলগুলোর যোগাযোগ অব্যাহত আছে। বান্দরবানের মিনঝিরি পাড়া বা চট্টগ্রামের টাইগার পাসের অভাবী মানুষগুলো তাদের যোগাযোগের মধ্যে থাকে। দোলনের কাজের সঙ্গে কয়েকজন সামর্থ্যবান ও দরদী ব্যক্তি যুক্ত আছেন যারা সেলাই মেশিন বা ভ্যান কিনে দিয়ে মানবসেবায় ভূমিকা রাখেন।
মানবসেবা মেহেদী হাসান দোলনের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলছিলেন, 'মানবসেবার মধ্যে আমি জীবন ধারণের কারণ খুঁজে পাই। এজন্য যদি আমি নিঃস্বও হয়ে যাই তবু আফসোস করব না।'
ছবি সৌজন্য: মেহেদী হাসান দোলন
