লর্ড হেনরি স্ট্যানলি: ভিক্টোরিয়ান অভিজাত থেকে ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম লর্ড
হাউস অব লর্ডসের প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছিলেন এক ব্রিটিশ অভিজাত, নাম তার লর্ড হেনরি স্ট্যানলি। জন্মের প্রায় ২০০ বছর হতে চললেও তার নাম আজও খুব বেশি পরিচিত নয়। ইতিহাসবিদ জেমি গিলহ্যামের মতে, ১৮৫৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে তিনি পরিবার ও সমাজের প্রচলিত প্রথা ভেঙেছিলেন।
স্ট্যানলির চিঠি বা ডায়েরি খুব বেশি পাওয়া যায় না। এতে ধারণা করা হয়, তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। মধ্যযুগের পর বিদেশ ভ্রমণের সময় অল্প কিছু ব্রিটিশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তবে গিলহ্যাম বলেন, স্ট্যানলি ছিলেন উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। রাজনীতিতে এবং চেশায়ার ও অ্যাঙ্গেলসিতে তার নিজস্ব ভূসম্পত্তিতে তার যথেষ্ট প্রভাব ছিল।
১৮২৭ সালে জন্ম নেওয়া স্ট্যানলি ছিলেন ১০ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। তাদের পরিবারে মুক্তচিন্তার চর্চা ছিল। পূর্বপুরুষরা ছিলেন অভিজাত। ভিক্টোরিয়ান যুগে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন খ্রিষ্টান মতবাদের অনুসারী ছিলেন। এমনকি ইহুদি ধর্মাবলম্বীও ছিলেন।
বর্তমান লর্ড স্ট্যানলির স্ত্রী ও পারিবারিক ইতিহাসবিদ লেডি কার্লা স্ট্যানলি বলেন, তারা ছিলেন 'মুক্তচিন্তার অধিকারী' এবং তাদের মায়েরা ছিলেন শিক্ষিত ও ভ্রমণপিপাসু।
তিনি আরও বলেন, 'তারা ছিলেন কাজের মানুষ। সেখানে তর্ক-বিতর্ক করাটা গ্রহণযোগ্য ছিল।'
শৈশবে অনেক শিক্ষিত ভিক্টোরিয়ানদের মতো স্ট্যানলিও ভ্রমণকাহিনি ও 'আরব্য রজনী'র গল্পে মুগ্ধ ছিলেন। তার শ্রবণশক্তির সমস্যা ছিল, যা পড়াশোনায় প্রভাব ফেলেছিল। এক বছর পর তিনি ইটন স্কুল ছেড়ে ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেন।
গিলহ্যাম জানান, তার বাবা ছিলেন একজন এমপি এবং মা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রথম সন্তান হিসেবে স্ট্যানলিকে ঘিরে পরিবারের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কেমব্রিজে গিয়ে আরবি শেখার পর তিনি সত্যিকার অর্থে বিকশিত হতে শুরু করেন।
১৮৪৭ সালে ২০ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড পামারস্টনের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী এক দশকে কূটনৈতিক দায়িত্বে তিনি তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য, গ্রিস ও বুলগেরিয়ায় কর্মরত ছিলেন। গিলহ্যামের ভাষায়, অটোমান সমাজে ইসলামের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
চিঠিপত্র থেকে জানা যায়, স্ট্যানলি রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারাননি, তবে বাইবেলের আক্ষরিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ভিক্টোরিয়ান যুগের মাঝামাঝি সময়ে এটি ছিল অস্বাভাবিক। এরপর তিনি ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৮৪৯–৫০ সালের দিকে মদ্যপান ছেড়ে দেন।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রসারে হতাশ হয়ে ১৮৫৮ সালে তিনি কূটনৈতিক চাকরি ছাড়েন। কয়েক মাস পর আরবে ভ্রমণের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৮৫৯ সালে শ্রীলঙ্কা সফরের সময় তার ধর্মান্তরের খবর সংবাদমাধ্যমে আসে।
শোনা যায়, তিনি মক্কায় গিয়ে হজ পালন করেছিলেন এবং নিজের নাম রেখেছিলেন আব্দুল রহমান । যদিও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। তার ইসলাম গ্রহণের খবরে বাবা-মা ক্ষুব্ধ হন। জনসমক্ষে তারা বিষয়টি অস্বীকার করলেও স্ট্যানলি এক ভাইকে চিঠিতে লিখেছিলেন, 'আমি মনেপ্রাণে সবসময়ই একজন মুসলমান।'
গোপন বিয়ে
১৮৬২ সালে আলজেরিয়ায় এক স্প্যানিশ ক্যাথলিক নারীকে ইসলামি রীতিতে বিয়ে করেন স্ট্যানলি। কিন্তু সাত বছর পর বাবার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাদের এই সম্পর্কের কথা গোপন রাখেন।
গিলহ্যাম জানান, পরবর্তীতে জানা যায় যে বিয়ের সময় ওই নারী আইনত এক স্প্যানিশ ব্যক্তির বিবাহিত স্ত্রী ছিলেন। অবশ্য স্ট্যানলি এ বিষয়ে জানতেন কি না, তা অস্পষ্ট।
১৮৬৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি তৃতীয় লর্ড স্ট্যানলি অব অ্যালডারলি এবং দ্বিতীয় ব্যারন এডিসবেরি হন। এরপর এই দম্পতি ইংলিশ আইন অনুযায়ী তাদের বিয়ে নিবন্ধন করেন।
গিলহ্যাম বলেন, 'ওই নারীর স্প্যানিশ স্বামী ১৮৭০ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, তাই তখনও তাদের বিয়েটি আসলে বৈধ ছিল না।'
তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'তবে ১৮৭৪ সালে তারা যখন পুনরায় বিয়ে করেন, তখন এটি শেষ পর্যন্ত বৈধতা পায়। আর সেটি ছিল রোমান ক্যাথলিক রীতিতে হওয়া এক অনুষ্ঠান, যা অনেকের মধ্যেই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল। আমার মনে হয়, তিনি তার সঙ্গিনী তথা স্ত্রীর ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।'
পাব বন্ধ করা
বাবার জমিজমা ও উপাধি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর, ১৮৬৯ সালে তিনি হাউস অফ লর্ডসে একজন নির্দলীয় সদস্য হিসেবে নিজের আসন গ্রহণ করেন এবং এর প্রথম মুসলিম সদস্য হন।
গিলহ্যাম বলেন, 'আমি জানি না তার কতজন সহকর্মী জানতেন যে তিনি একজন মুসলিম ছিলেন। তবে আমার ধারণা তারা জানতেন, কারণ তারা খবরের কাগজ পড়তেন এবং জানতেন যে তিনি ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদ্যা বিষয়ক সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত ছিলেন।'
লর্ড স্ট্যানলি উত্তর চেশায়ারে জমির মালিকানা পান, যার মধ্যে অ্যালডারলি এজ গ্রামটিও ছিল। ম্যানচেস্টারের কাছে অবস্থিত এই বিত্তশালী এলাকাটি বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগের ফুটবলারদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
গিলহ্যাম আরও বলেন, 'আলোচিত বা সমালোচিত যা-ই হোক, তিনি অ্যালডারলি পার্ক এস্টেটের কিছু মদের দোকান বা পাব বন্ধ করে দিয়েছিলেন।'
১৮৮৪ সালে চাচার মৃত্যুর পর লর্ড স্ট্যানলি উত্তর ওয়েলসের অ্যাঙ্গেলসিতে পেনরোজ এস্টেটের মালিক হন। সেখানে তিনি স্থানীয় গির্জাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে অবদান রাখেন।
তিনি প্রথাগত প্রাণীর ছবি বা মূর্তির পরিবর্তে জানালায় জ্যামিতিক নকশা ব্যবহারের জন্য অর্থ প্রদান করতেন, যা প্রাণীর ছবি আঁকার বিরুদ্ধে ইসলামি বিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
ইভ হাওয়া ইকবাল-খোখার নামের এক ইংরেজ নারী, যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং ম্যানচেস্টার মুসলিম কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন, তিনি জানান যে অ্যাঙ্গেলসিতে পারিবারিক ছুটিতে যাওয়ার ঠিক আগে লর্ড স্ট্যানলির জীবন সম্পর্কে জানার পর তিনি ওই গির্জাগুলো পরিদর্শনের "তাগিদ অনুভব করেছিলেন'।
তিনি বলেন, 'ইতিহাস আমাকে সত্যিই আলোড়িত করে। ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনে প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের সম্পর্কে জানাটা খুবই রোমাঞ্চকর—বিশেষ করে লর্ড স্ট্যানলির মতো একজন স্থানীয় অভিজাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে।'
তিনি গির্জার নকশাগুলোকে 'নয়নভিরাম' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে এগুলো 'আমাদের অতীতের সমৃদ্ধ ইতিহাসের' অংশ।
তবে যুক্তরাজ্যের জাতিগুলোর রাজনৈতিক ঐক্যের সমর্থক হিসেবে লর্ড স্ট্যানলি স্থানীয় স্কুলগুলোতে ওয়েলশ ভাষা শেখানোর বিপক্ষে ছিলেন।
গিলহ্যাম বলেন, 'তিনি ভাষাকে সত্যিই সম্মান করতেন। কিন্তু আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ঐক্যের এবং ওই ঐক্য বা ইউনিয়ন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।'
তিনি লর্ড স্ট্যানলিকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন যিনি 'সাম্রাজ্যের বিস্তারে বিশ্বাসী ছিলেন না।' তিনি যোগ করেন, 'তিনি বিদ্যমান সাম্রাজ্যকে সংহত রাখার পক্ষে ছিলেন। তাই তিনি লর্ডসে সাম্রাজ্য রক্ষা করার বিষয়ে কথা বলতেন, পাশাপাশি এর জনগণের দেখাশোনা করার কথাও বলতেন।'
গিলহ্যাম আরও বলেন, 'তিনি একজন রক্ষণশীল মানুষ ছিলেন, আবার একই সঙ্গে ভিক্টোরিয়ানও ছিলেন। তিনি অনেক ক্ষেত্রেই প্রথা ভেঙেছিলেন—বিশেষ করে ধর্মের ক্ষেত্রে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি তা করেননি।'
লর্ড স্ট্যানলি ১৯০৩ সালে পবিত্র রমজান মাসে ৭৬ বছর বয়সে মারা যান। লন্ডনের অটোমান দূতাবাসের এক ইমামের পরিচালনায় জানাজা শেষে তাকে তার অ্যালডারলি এস্টেটের একটি সাধারণ জমিতে (গির্জার পবিত্র করা জমি নয়) দাফন করা হয়।
গিলহ্যাম বলেন, 'কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন এবং ধীরে ধীরে তিনি স্বীকৃতি পাচ্ছেন ও তাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তিনি নিজেকে জাহির করতেন না এবং হয়তো এটি তার ইতিহাসের জন্য ক্ষতিকর ছিল। তবে আমি আশা করি, এতদিন মানুষ তাকে যতটুকু চিনেছে, এখন তার চেয়ে একটু বেশি চিনতে শুরু করবে।'
মূল ইংরেজী থেকে অনুবাদ: তাসবিবুল গনি নিলয়
