নির্জন কারাবাস: ফাঁসির আগেই বন্দিদের 'সামাজিক মৃত্যু'
মৃত্যুদণ্ড বাতিল হওয়ার আগে ইসমাঈল হোসেনকে ১৪ বছর নির্জন কারাবাসে কাটাতে হয়েছিল।
'ফাঁসির সেলে ওই বছরগুলোতে আমার মনে হতো যেন আমি প্রতিদিনই মারা যাচ্ছি। আমি প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকতাম যে তারা যেকোনও মুহূর্তে এসে আমাকে শেষ গোসল সেরে নিতে বলবে, বলবে যে আমার সময় ফুরিয়ে গেছে,' স্মরণ করেন তিনি।
ইসমাইলের এই বর্ণনা বাংলাদেশের মৃত্যুদণ্ড কার্যক্রমের মানবিক প্রভাব তুলে ধরা এমন অনেক কাহিনীর মধ্যে অন্যতম। এই কাহিনীগুলো নথিভুক্ত করেছেন নৃতত্ত্ববিদ ও ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার মোশফিকুর রহমান জোহান তার 'লিভিং অন ডেথ রো' প্রকল্পে।
দেশের কারাগারগুলোতে হাজার হাজার মানুষ ফাঁসির দড়ির ছায়াতলে নিজেদের জীবন কাটাচ্ছেন। এদের বেশিরভাগেরই শেষ পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর হয় না। তবুও তারা 'ডেথ সেলে' বন্দি। ছয় বাই আট ফুটের সরু কুঠুরিগুলোতে প্রতিদিনই যেন তারা মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
গত বছর তিন কয়েদির এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত এক রায়ে জানিয়েছিল যে, আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের নির্জন কারাবাসে রাখা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে, ফলে বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের আপিল বা ক্ষমার আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আলাদা সেলে রাখা হয়। এই ধরনের কারাবাস কয়েক মাস, বছর, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত চলতে পারে। কর্তৃপক্ষ এটিকে পালিয়ে যাওয়া, সহিংসতা বা আত্মহত্যা প্রতিরোধের একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তি দেয়। তবে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এটিকে নিষ্ঠুর, মানসিকভাবে ক্ষতিকারক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানায়।
এই প্রথাটির শুরু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে, যখন আপিলের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হতো। জোহানের গবেষণা থেকে জানা যায়, নির্জন কারাবাস মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের জন্য ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা না হয়ে উল্টো এখন কারাবাসের একটি নিয়মিত শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে গুম এবং 'আয়নাঘর' নামে গোপন কারাগারের ডকুমেন্টেশনের অভিজ্ঞতা থেকে জোহান মৃত্যুদণ্ডকে 'রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত হত্যাকাণ্ড, একধরণের প্রতিশোধভিত্তিক ব্যবস্থা যা আধুনিক বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে অসঙ্গত' বলে অভিহিত করেন।
বাংলাদেশ-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার'-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে ৩ হাজার ৭৩৯ জন মানুষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় আছেন।
শেষ বিদায়ের আগে 'সামাজিক মৃত্যু'
জোহানের ডকুমেন্টারি এই প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার দৈনন্দিন বাস্তবতার সরাসরি দৃশ্য তুলে ধরে।
তিনি বলেন, 'ফাঁসির সেলের একজন কয়েদি তার নিজস্ব এক জগতে বাস করে। একটি ছয় বাই আট ফুটের সেল তাদের পুরো অস্তিত্ব হয়ে ওঠে। টয়লেট, খাবারের জায়গা আর একটি পাতলা ম্যাট এই শ্বাসরুদ্ধকর বাক্সের মধ্যে ঠাসা থাকে। '২২/২ কারাবাস নিয়ম' অনুযায়ী, কয়েদিরা প্রতিদিন বাইশ ঘণ্টা এই সেলের ভেতরে তালাবদ্ধ থাকেন। তাদের দিনে মাত্র দুবার বাইরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়—একবার গোসলের জন্য এবং আরেকবার ছোট একটি উঠানে অল্প কিচছুক্ষণ হাঁটার জন্য, সেটিও প্রায়শই একা।'
জোহান আরও বলেন, 'যারা দীর্ঘদিন নির্জন কারাবাসে থাকেন, তাদের অনেকেই মুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যান। বছরের পর বছর দিনের আলো এবং চলাফেরার অভাবের কারণে তাদের শরীর দুর্বল হয়ে যায়, মানসিকভাবেও তারা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।'
তিনি এবং এই অভিজ্ঞতা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষজন এটিকে বলেন 'সামাজিক মৃত্যু'। যখন কোনও প্রহরী খাবার খাওয়ার জন্য বা গোসলের জন্য ডাক দেন, তখন কয়েদিরা ভাবেন, তাদের কি ফাঁসি কার্যকরের জন্য ডাকা হচ্ছে? প্রতিটি গোসলকে মনে হয় শেষ গোসল; প্রতিটি খাবারকে শেষ ভোজন বলে মনে হয়।
জোহান বলেন, এই অবিরাম ভয়, এই অস্তিত্ব ও মৃত্যুর মাঝে ঝুলে থাকা জীবনই হলো 'ডেথ রো'-এর আসল চেহারা।
বিচার ব্যবস্থার ত্রুটি
জোহানের বিশ্লেষণ কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে নির্জন কারাবাস এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার গভীর ত্রুটিগুলো উন্মোচন করেছে। তিনি এই ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক বলে মনে করেন।
তিনি বলেন, 'মৃত্যুদণ্ডের প্রধান শিকার ধনী বা প্রভাবশালীরা নন, বরং গরিব, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং সামাজিকভাবে অসহায় মানুষজন। এই ব্যক্তিরা প্রায়শই আইনজীবীর খরচ বহন করতে পারেন না বা জটিল আদালত প্রক্রিয়া সামলাতে পারে না। একজন যোগ্য আইনজীবীর সহায়তা এবং ন্যায্য বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার তাদের জন্য কার্যত অস্বীকার করা হয়।"
জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, বিচারব্যবস্থা প্রায়শই বিচারের পরিবর্তে আবেগ ও রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত হয়ে 'প্রতিশোধভিত্তিক' হয়ে ওঠে।
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার উদাহরণ টেনে তিনি সমালোচনা করে বলেন, 'এই মামলায় ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, এটি একটি মিডিয়া ট্রায়াল এবং ন্যায়ের নামে অন্যায়। কারণ সবার অপরাধের মাত্রা সমান ছিল না।'
রাজনৈতিক সদিচ্ছাও একটি বড় ভূমিকা রাখে। ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা প্রশাসনের ১৫ বছরের সময়কালে ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও, এই সময়ে প্রাথমিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৫০০-এরও বেশি মানুষকে।
দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি লড়াই
জোহানের ডকুমেন্টারি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি প্রক্রিয়া তুলে ধরেছে। এর মধ্যে আনোয়ার হোসেনের মামলাটি উল্লেখযোগ্য। ২০০৫ সালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে 'অজানা হত্যাকাণ্ড'র অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যে খুন তিনি করেননি।
রিমান্ডে থাকার সময় তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়—মারধর, ইলেকট্রিক শক এবং ওয়াটারবোর্ডিংয়ের মাধ্যমে জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়, এ সময় কর্মকর্তারা তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছিল। সেই জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তিনি টানা ১৭ বছর নির্জন কারাবাসে কাটান।
তার পরিবারের কাছেও এই পুরো প্রক্রিয়াটি আরেক ধরনের শাস্তি হয়ে ওঠে। বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও, দূরবর্তী আদালতে যাতায়াত, কেরানিদের ছোটখাটো ঘুষ দেওয়াসহ অন্যান্য অপ্রকাশিত খরচগুলো তাদের সামান্য সঞ্চয়ও শেষ করে দেয়। প্রতিবেশীদের দ্বারা একঘরে হয়ে একসময় তারা নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে দেন এবং পরে আনোয়ারের সঙ্গে দেখা করাও বন্ধ করে দেন।
অন্তহীন শুনানির পর অবশেষে ২০২২ সালে আনোয়ারের সাজা বাতিল হয়। মুক্তি পাওয়ার পর তার আইনজীবীরা যাত্রাবাড়ীর একটি কাপড়ের দোকানে কাজ দিয়ে তাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে সাহায্য করেন। পরে তিনি মোহাম্মদপুরে চলে যান, যেখানে কেউ জানত না তিনি জীবনের মূল্যবান এতগুলো বছর হারিয়ে এসেছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্দোষ ভুক্তভোগীদের বয়ান
২০১৩ সালের ঠিক পর থেকে জোহান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ও তাদের পরিবারের জীবন নথিভুক্ত করা শুরু করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল—অবৈধ কারাবন্দি এবং দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় কারাবাসের সঙ্গে যুক্ত ত্রুটিপূর্ণ আইনগত ব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন করা।
প্রাক্তন কয়েদিদের সম্পর্কে কোনো সরকারি তথ্য না থাকা, কঠোর গোপনীয়তা এবং সামাজিক কলঙ্কের কারণে এই কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। বিষয়বস্তু খুঁজে বের করার জন্য জোহানকে পুঙ্খানুপুঙ্খ নৃতত্ত্বীয় অনুসন্ধান করতে হয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ব্যক্তিগত অর্থায়নে জোহানের এই নিবেদিত প্রচেষ্টায় স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে গ্রামগুলোতে বহু খোঁজাখুঁজির পরই ইসমাঈল হোসেন এবং আরেক ভুক্তভোগী মাজেদা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যায়। মাজেদার পরিবারকে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে তাদের সন্ধান মেলে।
রংপুরের এক দরিদ্র গৃহিণী মাজেদা বেগম সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার হন। কারাগারে তাকে নির্যাতন করা হয় যতক্ষণ না তিনি একটি শিশু হত্যার কথা স্বীকার করেন। দোষ স্বীকার না করলে কর্মকর্তারা তাকে ধর্ষণ এবং তার ১৩ মাস বয়সী ছেলে মারুফকে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার হুমকি দেন।
সেই জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ২০১৫ সালে একটি আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি তার শিশুপুত্রকে নিয়েই ডেথ সেলে প্রবেশ করেন। জেলের ভেতরেই তার ছেলে হাঁটতে শেখে, কথা বলতে শেখে। ২০২১ সালে হাইকোর্ট তার মামলায় গুরুতর অসঙ্গতি খুঁজে পেলে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। যদিও এর আগে তিনি জীবনের ছয় বছর এবং তার ছেলে নিজের শৈশব হারিয়ে ফেলে।
জোহানের ডকুমেন্টারিতে আরেক ভুক্তভোগী শেখ জাহিদ একটি ছোট, বিবর্ণ ছবি ধরে আছেন। নির্জন কারাবাসে ২০ বছর কাটানোর পর তিনি বলেন, 'এই ছবিটি আমাকে জেলে পাঠানোর দিন তোলা হয়েছিল।' ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় জাহিদ তার বাবা-মায়ের শেষকৃত্যেও অংশ নিতে পারেননি; তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।
একই ধরনের যন্ত্রণা ভোগ করেছেন মোহাম্মদ নাসিরও। একটি মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে তিনি আট বছর ডেথ সেলে কাটান। তিনি বলেন, 'শরীরের প্রতিটা অংশ ভেঙে না যাওয়া পর্যন্ত পুলিশ আমাদের পিটিয়েছে, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছে, ১৬৪ ধারায় জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নিয়েছে। অনেক কয়েদি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। আমরা প্রতি রাতে ভয়ে থাকতাম, হয়তো আমরাই পরের শিকার।"
শাস্তি ভোগ করেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পরিবারও
রাষ্ট্রের এই শাস্তি কয়েদির সেলের দরজায় থেমে থাকে না; বাইরের দিকে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে তাদের নির্দোষ পরিবারের সদস্যদের ওপরও। জোহান বলেন, 'এই মানসিক ক্ষত ব্যক্তিগত ও সামাজিক—দুই ধরনেরই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পরিবারকে প্রায়শই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা করে দেয়া হয়।'
তার ডকুমেন্টারি ইসমাঈল হোসেনের গল্পও তুলে ধরেছে, যার সন্তানেরা সমাজে একঘরে হয়ে গেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির সন্তান হওয়ায় অন্যরা তার সাথে মিশতো না, খেলাধুলায় নিত না। অন্যদিকে, আবদুল হাইয়ের মেয়েদের বিয়ে বাতিল হয়ে যায়, কারণ তার বাবা একইভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। মাজেদার মতো কারও ক্ষেত্রে পরে নির্দোষ প্রমাণ হলেও, সমাজ তাদের অপরাধী হিসেবেই গণ্য করতে থাকে।
জোহান অন্য দেশের সঙ্গে এর তুলনা করে বলেন, 'ভারতে সংস্কারের ফলে এখন কারাগারে সাক্ষাতের সময় স্বামী-স্ত্রীকে একান্তে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়। এই নির্দোষ পরিবারের সদস্যদের সমর্থন করা, তাদের দুর্ভোগকে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের কর্তব্য। কিন্তু বাংলাদেশে, এ ধরণের সামাজিক কলঙ্ক এক গৌণ, সম্মিলিত শাস্তি হয়ে ওঠে, যা অবিচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।'
