‘আদাবর’ যেভাবে সবার অগোচরে ঢাকার ভেতরে নতুন আরেক শহর হয়ে উঠলো!
২০২৩ সালের কথা। ঈদুল আজহার তখন আর হাতেগোনা কয়েকটা দিন বাকি। ঠিক তার কিছুদিন আগেই ঢাকায় পরিবারসহ নতুন এক ঠিকানায় পা রাখেন তাসফিয়া। হাতে কম সময় থাকায় ঈদের কেনাকাটা নিয়ে তখন তাদের মনে একটা হালকা উদ্বেগ তো ছিলই।
পুরোনো পাড়া উত্তর বাড্ডায় যখন থাকতেন, তখন ঈদের কেনাকাটা মানেই ছিল এক বড় ঝক্কি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, কোন শপিং মল 'যাওয়ার মতো' তা নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি আর এক চিরচেনা ক্লান্তি, যা উৎসবের আগে সব আনন্দই মাটি করে দিত।
কিন্তু আদাবরে এসে সবকিছুই যেন ভিন্ন রূপে ধরা দিল।
নতুন ফ্ল্যাটে আসার পর, পরদিন সকালে মা বললেন, 'চলো, আজই ঈদের বাজারটা সেরে ফেলি।' মনে মনে ঢাকার সেই দীর্ঘ যাতায়াতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন তাসফিয়া। এর মধ্যে তার বাবা হুট করে বলে উঠলেন, 'চলো, হেঁটেই চলে যাই!'
'হেঁটে যাব মানে! ঈদের শপিং করতে হেঁটে যাব?'
প্রশ্নটা মুখ ফুটে বলার আগেই তারা চলে আসলেন রিং রোডে। কিন্তু এই রিং রোড তাসফিয়ার শৈশবে দেখা সেই রিং রোড ছিল না। জায়গাটি এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে—আরও চওড়া, ঝলমলে কাঁচের শো-রুম আর বড় বড় বাণিজ্যিক এলাকার নামিদামি ব্র্যান্ডের সাইনবোর্ডে সাজানো। অ্যাপেক্স, ইনফিনিটি, আর্টিজান, ইয়েলো—মাঝারি ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্র্যান্ডের অসংখ্য দোকান, সব যেন হাতের নাগালেই, মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটার পথ।
এক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো পরিবারের ঈদের কেনাকেটা শেষ! কোনো যানজট নেই। অপেক্ষা নেই। ক্লান্তির সেই দীর্ঘশ্বাসও নেই।
যখন তারা হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন, ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চাকার ওপর ছোট ছোট রেস্তোরাঁর মতো খাবারের গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ফুচকার চেনা গন্ধ গ্রিলড কাবাবের সুবাসের সঙ্গে মিশে বাতাসে ভাসছে। কেউ একজন ওয়াফেল নিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছে। আর অন্যদিকে তরুণ-তরুনীরা রঙ-বেরঙের বরফ দেওয়া পানীয়ের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে।
পরে নিজের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, শহরের আলোয় আদাবরের পুরো এলাকাটাকে ঝলমল করতে দেখে তাসফিয়া একটা সহজ সত্যি উপলব্ধি করলেন: তিনি শুধু বাড়ি বদলাননি, তিনি এমন একটা এলাকায় চলে এসেছেন যা তার চোখের সামনেই নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলছে।
ঢাকার চিরচেনা বিশৃঙ্খলা থেকে আলাদা, আদাবরের এই যে এগিয়ে চলা, তা রাজধানীর পরিবর্তনের স্পষ্ট উদাহরণ। একসময়কার সরু গলি আর নিচু বাড়ির একটি এলাকা কীভাবে একটা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়, যেখানে পরিবারগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে, ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্যবসার জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে রেস্তোরাঁগুলো।
তবে এই পরিবর্তনটা কিন্তু হুট করে ঘটেনি। পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, নতুন নতুন হাউজিং সোসাইটি আর উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা—বিশেষ করে রিং রোড এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। এসব মিলিয়েই মানুষের বসবাসের আকাঙ্ক্ষা আর ব্যবসায়িক সুযোগগুলো নতুনভাবে সেজেছে।
প্রশাসনিকভাবে আদাবরকে বেশ নতুন এলাকা বলা যায়। ২০০৭ সালে যখন ঢাকা তার নগর ব্যবস্থাপনা নতুন করে সাজিয়েছিল, তখনই আদাবর একটি স্বতন্ত্র থানা হিসেবে পরিচিতি পায়। ভৌগোলিকভাবে ছোট্ট হলেও এলাকাটা বেশ জনবসতিপূর্ণ। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ২.৪৪৮ বর্গকিলোমিটার জুড়ে প্রায় ২ লক্ষ ১৫ হাজার মানুষ এখানে বসবাস করে। এত বেশি জনসংখ্যার কারণেই হাঁটার দূরত্বে অসংখ্য দোকানপাট, ব্যাংক, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন পরিষেবা ব্যবসা টিকে আছে, বরং বাড়ছে।
এই আদাবরের আজকের চেহারাটা বুঝতে হলে মোহাম্মদপুরের ইতিহাস জানাটা খুব জরুরি। কারণ মোহাম্মদপুরই আদাবরের বড় কাঠামোটা তৈরি করেছে। ১৯৫০-এর দশকে মোহাম্মদপুর ঢাকার প্রথম দিকের পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে গড়ে ওঠে।
চওড়া রাস্তা, সরকারি কোয়ার্টার ও মধ্যবিত্তদের থাকার জন্য বরাদ্দ জমি ছিল এই এলাকায়। কয়েক দশক ধরে মোহাম্মদপুর তার আবাসিক বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে, একই সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রসার, নতুন অ্যাপার্টমেন্ট ভবন আর অপ্রাতিষ্ঠানিক গলিগুলোর সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।
অনেক পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে এই পরিবর্তনটা বেশ অবাক করার মতো।
'আমি ১৯৮০-এর দশকে আমার শহর দিনাজপুর থেকে আদাবরে চলে আসি, তখন এখানে বেশিরভাগই ফাঁকা ছিল,' বলছিলেন আবদুস সামাদ। তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানেই আছেন। 'আমার বাড়ি এলাকার প্রথম ছয়তলা ভবনগুলোর মধ্যে একটা ছিল। সেখান থেকে বেরিবাঁধ আর বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত দেখা যেত। আমাদের চারপাশে প্রায় সব প্লটই খালি পড়ে ছিল, ঠিক যেমনটা এখন আমরা পূর্বাচল বা অন্য কোনো নতুন উন্নয়ন এলাকায় দেখি। রিং রোড ছিল শুধু একটা সরু দুই লেনের রাস্তা। আর জাপান গার্ডেন সিটি যেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ছিল ইটের ভাটা।'
তবে সেই চিত্র দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক আর ২০০০ সালের গোড়ার দিকে, যখন এই এলাকায় বড় বড় আবাসন প্রকল্পগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে।
আদাবরের পাশেই গড়ে ওঠা জাপান গার্ডেন সিটি সেই পরিবর্তনের এক দারুণ উদাহরণ হয়ে আছে। অভ্যন্তরীণ রাস্তা, দোকানপাট আর খেলার মাঠসহ একটা সুরক্ষিত, স্বয়ংসম্পূর্ণ আবাসনের ধারণা তখন পশ্চিম ঢাকায় ছিল একদম নতুন। হাজার হাজার মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার এখানে চলে আসে, আর এতে এলাকার অর্থনীতির মোড় ঘুরে যায়।
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটির চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন তাহের বলেন, 'জাপান গার্ডেন সিটি পুরোপুরি চালু হওয়ার পর এবং মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ঢল নামার পরই আসল উন্নয়ন শুরু হয়।'
তাহের বলেন, 'তখন শিয়া মসজিদের কাছে দাঁড়ালে শুধু বিশাল জলাভূমি দেখা যেত। আজ রিং রোড যেখানে, সেখানে তখন পানি আর বিচ্ছিন্ন নিচু জমি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এমনকি যে এলাকাগুলো এখন মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটি আর মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড দখল করে আছে, সেগুলোকে একসময় উন্নয়নের অযোগ্যই মনে করা হতো। মানুষ বিশ্বাসই করত না যে এই জায়গাগুলো কখনো আবাসিক এলাকায় পরিণত হতে পারে। আজ যা দেখছেন, তা কয়েক দশকের একটানা ভূমি ভরাট, পরিকল্পনা আর আদাবরে ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক পরিবারগুলোর আস্থার ফল।'
একই সময়ে, বাইতুল আমান হাউজিংয়ের মতো আরও অনেক হাউজিং সোসাইটি নিয়মিতভাবে বাসিন্দাদের আকর্ষণ করতে শুরু করে। ডেভেলপাররা বাইতুল আমান জুড়ে ডজনখানেক মাঝারি ও উঁচু ভবন তৈরি করে, আর এখন ফ্ল্যাট কেনা বা ভাড়ার জন্য রিয়েল এস্টেট প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মিত তাদের তালিকা দেখা যায়।
বাইতুল আমানে বিটিআর-এর 'রেজোনেন্স' প্রকল্পটি ব্র্যান্ডেড উন্নয়নের মধ্যে অন্যতম।
পাশাপাশি, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি আরেকটা জনপ্রিয় আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। অনেক পরিবার এর আধা-সুরক্ষিত পরিবেশ, হাঁটার সুবিধা এবং রিং রোড ও প্রধান বাস রুটের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে একে পছন্দ করে। মনসুরবাদ, ছোট ছোট আবাসিক প্রকল্পের পকেট নিয়ে, আদাবরের ক্রমবর্ধমান ঘনত্ব এবং আর্থ-সামাজিক বৈচিত্র্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এইসব আবাসন প্রকল্প আদাবরকে একটা কাঙ্ক্ষিত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত করে তুলতে সাহায্য করেছে, তবে এর রূপান্তরের আসল চালিকাশক্তি, যা এখানকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন দুটোকেই বদলে দিয়েছে—তা হলো রিং রোড।
শ্যামলী থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাস্তা, মিরপুর, তেজগাঁও ও আগারগাঁওয়ের মতো প্রধান কর্মস্থলের কেন্দ্রগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপন করে যেন একটা মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। গত এক দশকে, যান চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন আর চলমান রাস্তা সংস্কারের কারণে যাতায়াত আরও মসৃণ হয়েছে, যা আরও বেশি যাত্রী ও ব্যবসাকে আকর্ষণ করছে।
তবে উন্নত রাস্তা সাথে নিয়ে আসে কিছু জটিলতাও।
একজন স্থানীয় ট্র্যাফিক সমন্বয়ক বলেন, 'নির্দিষ্ট কিছু রাস্তা ট্র্যাফিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আমাদের বন্ধ রাখতে হয়েছে। যদিও বিকল্প পথগুলো কিছুটা দীর্ঘ হয়, তবে সব মিলিয়ে যান চলাচলের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে। যদিও মানুষ তখনও অভিযোগ করে। আর যখন একটা রাস্তা কিছুদিন বন্ধ থাকে, তখন বিক্রেতারা দ্রুত এসে তাদের দোকান বসিয়ে ফেলে। একবার তারা গেড়ে বসলে, তাদের সরানোটা খুব কঠিন হয়ে যায়।'
এই চ্যালেঞ্জগুলো থাকা সত্ত্বেও, রিং রোডের সুবিধা এখানকার দৈনন্দিন জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। ডেলিভারি পরিষেবাগুলো আরও দক্ষতার সাথে কাজ করছে। মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় ও পরিচিতি বাড়ার কারণে ছোট ব্যবসাগুলো রমরমা হয়ে উঠছে। ব্যাংক, রেস্তোরাঁ এবং নামিদামি ব্র্যান্ডের দোকানগুলো এখন রাস্তার দু'পাশে একসাথে জড়ো হচ্ছে। এমন একটা বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে এখানে যা আজ থেকে ১৫ বছর আগেও ছিল না।
এর প্রভাব সবখানেই চোখে পড়ছে। ছোট মুদির দোকানগুলো এখন বড় সুপারমার্কেটে পরিণত হয়েছে। কাপড় ধোয়ার দোকান, সেলুন, মেরামতের দোকান এবং ওষুধের দোকান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যে রাস্তাগুলোতে একসময় হাতেগোনা কয়েকটি চায়ের দোকান ছিল, সেখানে এখন ক্যাফে এবং বাহারি খাবারের দোকান রয়েছে। ফ্ল্যাট বা বাড়ির তালিকাগুলো ক্রমবর্ধমান ভাড়া, ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ঘনত্বের চিত্র দেখাচ্ছে।
এর সাথে এসেছে জীবনযাত্রার পরিবর্তনও।
আগের বছরগুলোতে, অনেক তরুণ বাসিন্দাদের শরীরচর্চার জন্য জিমে, বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ক্যাফেতে কিংবা বিনোদনের জন্য ধানমন্ডি বা গুলশানে ছুটতে হতো। এখন সেই সুবিধাগুলো আদাবরের দোরগোড়াতেই এসে গেছে।
এখানকার এক তরুণ বাসিন্দা, রেজনান শুভ নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। তিনি বলেন, 'আগে শুধু শরীরচর্চার জন্য ধানমন্ডি যেতাম। এখন এখানে বেশ কিছু ভালো বিকল্প আছে। আমি রিং রোডের 'মাল্টি জিম প্রিমিয়াম'-এ যাই। এটি পুরোপুরি আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো এবং নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য উন্মুক্ত। আরও কয়েকটি জিম আছে – কিছু হয়তো দামে কম, তবে মান বেশ ভালো। আমাকে আর দূরে কোথাও যেতে হয় না।'
বাজারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। মোহাম্মদপুর কৃষি বাজার এখনো ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত কাঁচাবাজার হিসেবে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, যেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, মসলা এবং গৃহস্থালির অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া যায়। তবে যারা আরও দ্রুত বা সুবিধাজনক কেনাকাটা পছন্দ করেন, তাদের জন্য আদাবরে এখন স্বপ্ন, আগোরা এবং প্রিন্স বাজারের মতো চেইন শপগুলোর একাধিক শাখাও রয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলো এলাকার জীবনযাত্রার মান উন্নত করলেও, নতুন কিছু চাপও তৈরি করেছে।
বেসরকারি নির্মাণকাজের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে অবকাঠামো। ভেতরের রাস্তাগুলো প্রায়ই সরু এবং যানজটে ভরা থাকে। বর্ষার সময় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও আটকে যায়, যার ফলে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। পানির চাপ ওঠানামা করে, বিশেষ করে পুরোনো ভবনগুলোতে।
তাছাড়া, আর আদাবর আরও ঘনবসতিপূর্ণ, উঁচু এবং বাণিজ্যিকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে উঠলেও, একটি জিনিস এর সাথে বাড়েনি: উন্মুক্ত সবুজ স্থান।
দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের জন্য, আদাবরের রূপান্তরের এই অংশটিই সবচেয়ে অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়। আবদুস সামাদ বলেন, 'চারিদিকে নতুন নতুন ভবন উঠেছে—কিন্তু এখানে বসবাসকারী মানুষের জন্য একটি উপযুক্ত পার্কও তৈরি হয়নি। যখন আমি প্রথম আদাবরে আসি, তখন খোলা মাঠ, সবুজের বিস্তৃতি, এমনকি ছোট রাস্তাগুলোর পাশে গাছও ছিল। এখন আপনি কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটলেও একটি খেলার মাঠ বা শিশুদের দৌড়ানোর মতো জায়গা খুঁজে পাবেন না। সবকিছুই কংক্রিটের।'
তিনি বিশ্বাস করেন, সবুজের অনুপস্থিতি দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। 'এখন আদাবরে হাজার হাজার পরিবার বাস করে, কিন্তু বেশিরভাগ শিশুই তাজা বাতাস বা খোলা জায়গা ছাড়াই বড় হয়। এমনকি ছোট খালি জায়গাগুলোও, যেখানে আমরা একটু শ্বাস নিতে পারতাম, সেগুলোও নির্মাণকাজে বিলীন হয়ে গেছে। উন্নয়ন অবশ্যই একটি ভালো দিক, কিন্তু গাছপালা ছাড়া একটি এলাকা প্রকৃত অর্থে বসবাসের উপযোগী তো হতে পারে না।'
তবে মোহাম্মদপুর ও আদাবরের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায়, বিশেষ করে জেনেভা ক্যাম্পের আশেপাশে জননিরাপত্তা নিয়ে একটা দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ রয়েছে।
রেজওয়ান শুভ বলেন, 'মোহাম্মদপুর ও আদাবরের কিছু কোণে, বিশেষ করে জেনেভা ক্যাম্প এলাকার আশেপাশে নিরাপত্তা নিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ রয়েছে। যদি আপনি পুলিশের নথি বা সংবাদ প্রতিবেদন দেখেন, তাহলে প্রায়শই যৌথ অভিযান, আকস্মিক তল্লাশি, ছিনতাই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বা মাদকচক্রের কথা দেখতে পাবেন।
এই ঘটনাগুলোর অনেকগুলোই আদাবরের প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে পড়ে—আর যদিও এসব ঘটনা অধিকাংশ বাসিন্দাকে সরাসরি প্রভাবিত করে না, তবুও এলাকার বাইরের মানুষের কাছে আদাবরের সামগ্রিক চিত্র কেমন হবে, তা শেষ পর্যন্ত এসব ঘটনা দ্বারাই প্রভাবিত হয়।'
নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ কিছু পরিবারকে সুরক্ষিত আবাসন প্রকল্প এবং নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেয়। পুরোনো গলিতে বসবাসকারীদের জন্য বিকল্পগুলো আরও সীমিত। তাদের স্থানীয় পুলিশি ব্যবস্থা এবং এলাকার মানুষের সতর্কতার ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয়।
তবে সবকিছুই একপাশে রেখে, দিনদিন এলাকাটি বেশ রমরমা হয়ে উঠছে। জাপান গার্ডেন সিটি, পিসি কালচার, বাইতুল আমান এবং মনসুরবাদের মতো আবাসিক সোসাইটিগুলো নতুন নতুন পরিবারকে আকর্ষণ করে চলেছে। রিং রোডের মাধ্যমে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধা এবং বাণিজ্য নিয়ে আসে। ব্যাংক, রেস্তোরাঁ এবং নামিদামি ব্র্যান্ডের দোকানগুলো জনসমাগম দেখে এখানে আসছে। সন্ধ্যার খাবারের দোকানগুলো একটি জমজমাট রাস্তার সংস্কৃতি তৈরি করছে। সুপারমার্কেট, বুটিক দোকান এবং শরীরচর্চার কেন্দ্রগুলোর কারণে এলাকাটি যেন শহরের মধ্যে আরেকটি ছোট্ট এক শহরে পরিণত হচ্ছে।
