শীশমহল, বাদশাহী মসজিদ, আনারকলি বাজার— লাহোরের দুই দিন
'জিন্নে লাহোর নাই দেখয়া, ও জাম্মেয়া নাই'—পাকিস্তানের লাহোরে গিয়ে এই প্রবাদটি শুনেছি একাধিকবার। পাঞ্জাবি ভাষার এর অর্থ অনেকটা এরকম, 'যে লাহোর দেখেনি, সে যেন এখনো জন্মই নেয়নি।' (Those who haven't seen Lahore, haven't been born yet)।
লাহোরে এমন কী আছে, যার জন্য এ কথা বলা হয়? স্বাভাবিকভাবেই মনে কৌতূহল জাগল। বেড়ে গেল শহরটিকে নতুন করে জানার আগ্রহও।
বাঙালিদের কাছে লাহোর কেবল পাকিস্তানের এক ঐতিহাসিক শহর নয়, এই শহরের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও খানিকটা জড়িয়ে আছে। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই 'বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ'খ্যাত ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে এই প্রস্তাবের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই থেকেই লাহোর বাঙালিদের কাছে বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে আসছে।
শুধু তাই নয়, উপমহাদেশে মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসেও লাহোরের তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ তৎকালীন বেঙ্গল প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোরের মিন্টো পার্কে (বর্তমানে ইকবাল পার্ক) ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। সেই প্রস্তাব পরবর্তীতে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছিল। আর পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়েই পরে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।
এ তো গেল ইতিহাস, এবার স্বশরীরে লাহোর ঘুরে দেখার পালা। সফরের দিনগুলোয় আমরা ছুটে বেড়ালাম ইতিহাসের পথ ধরে। যেসব নাম এতদিন বইয়ে পড়েছি, তা চোখের সামনে দেখার সুযোগ হলো। শালিমার গার্ডেন, ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টস, লাহোর জাদুঘর, লাহোর দুর্গ, বাদশাহী মসজিদ, উপমহাদেশের বিখ্যাত কবি ও চিন্তাবিদ আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের মাজার—সবই ঘুরে দেখা হলো। আরও গিয়েছিলাম লাহোরের ব্যস্ত শপিং মল আর কোলাহলমুখর বাজারঘাটে।
ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টস
লাহোর ভ্রমণের প্রথম দিনেই গেলাম বিখ্যাত ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টসে। সেখানে গিয়ে পাকিস্তান সম্পর্কে বহুদিনের গৎবাঁধা ধারণায় খানিকটা ছেদ পড়ল।
১৮৭৫ সালে ব্রিটিশদের হাতে গড়া এ কলেজজুড়ে রয়েছে নানা আঙ্গিকের ভাস্কর্য। শিক্ষার্থীদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা, কথাবার্তায় ধরা পড়ল প্রগতিশীলতার ছাপ। কারও হাতে গিটার, কেউ বাজাচ্ছেন অন্য বাদ্যযন্ত্র, বসেছে গানের আসর। আবার অন্যদিকে একদল মজেছিলেন কফির আড্ডায়।
সবমিলে পাকিস্তানের নাম শুনলেই চোখের সামনে যেরকম কঠিন এক ইসলামি রাষ্ট্র, কিংবা নিরাপত্তাহীনতার ছবি ভেসে উঠত—সে ধারণা অনেকটাই বদলে গেল লাহোরে পা রাখার প্রথম দিনে।
ছোট্ট একটি গ্যালারিতে বসিয়ে আমাদের দেখানো হলো কলেজটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ডকুমেন্টারি। সেখান থেকে জানা গেল, ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মায়োর নামে ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল 'মায়ো স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টস'; পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫৮ সালে যার নাম হয় ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টস।
এই কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্যের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। সময়ের পরিক্রমায় এখন এটি পাকিস্তানের শিল্পশিক্ষার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কলেজজুড়ে চোখে পড়ল নানা শৈল্পিক ভাস্কর্য ও দেয়ালচিত্র। বেশ পুরোনো এসব ভাস্কর্যের নির্মাতা বা নির্মাণকাল কেউ নিশ্চিত জানাতে পারলেন না। এগুলোর আশপাশে কোথাও কোনো তথ্যফলকও চোখে পড়ল না। তবু শিক্ষার্থীরা এগুলোকে কলেজের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেদের করে নিয়েছেন।
এছাড়া কলেজের ব্রিটিশ আমলের ভবনগুলোও দারুণ নজরকাড়া। লাল ইটের দেওয়াল, বিশাল খিলান, খোলা আঙিনা—সব মিলিয়ে মোগল-স্যারাসেনিক ও ইউরোপীয় শিল্পশৈলীর এক অনন্য মিশ্রণ। পরে ইন্টারনেটে ঘেঁটে জানলাম, এসব ভবনের সূক্ষ্ম লাল ইটের কারুকাজে বিশেষ অবদান রেখেছেন স্থপতি ভাই রাম সিংহ। ইউরোপীয় ধারা আর আঞ্চলিক অলংকরণ মিশিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য নকশা।
ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টসের ইতিহাসে আরেকটি বড় নাম হলো ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের বাবা জন লকউড কিপলিং। তিনিই ছিলেন তৎকালীন মায়ো স্কুল অব আর্টসের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল।
তখন কিপলিং পরিবার থাকত কলেজ প্রাঙ্গণের আশেপাশেই। ফলে ছোটবেলা থেকেই রুডইয়ার্ড পরিচিত ছিলেন এই পরিবেশের সঙ্গে। তার উপন্যাস কিম (১৯০১)-এ লাহোর শহরের বর্ণনা এসেছে একাধিকবার। সাহিত্য সমালোচকেরা মনে করেন, লাহোরে কাটানো সেই শৈশব-অভিজ্ঞতাই গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল তার লেখনীতে।
লাহোর জাদুঘর
ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টসের পাশেই লাহোর জাদুঘর। পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে মাত্র এক মিনিট। কলেজ ক্যাম্পাস দেখা শেষ করেই আমরা ঢুকে পড়লাম সেখানে। উপমহাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অসংখ্য নিদর্শন স্তরে স্তরে সাজানো এ জাদুঘরে।
সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে গান্ধার, হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন, ইসলামি ও শিখ ঐতিহ্য—এবং মোগল থেকে ব্রিটিশ আমলের শিল্পকলার বিস্তৃত ধারা একসঙ্গে ধরা দিয়েছে এখানে।
ট্যুর গাইড জানালেন, বিভিন্ন গ্যালারিতে প্রায় ৬০ হাজার নিদর্শনের স্থায়ী সংগ্রহ রয়েছে।
১৮৬৪ সালে ছোট্ট একটি প্রদর্শনীকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই সংগ্রহশালার। পরে ১৮৯৪ সালে উদ্বোধন হয় আজকের লাহোর জাদুঘরের নতুন ভবন। ইন্দো-স্যারাসেনিক শৈলীতে নির্মিত লাল ইটের এই ভবনেরও নকশা করেছিলেন শিখ স্থপতি ভাই রাম সিংহ। উপমহাদেশীয় স্থাপত্য আর ব্রিটিশ শিল্পশৈলীর এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায় ভবনটিতে।
গ্যালারিগুলো সাজানো হয়েছে বিষয়ভিত্তিকভাবে। দর্শনার্থীরা যেন ক্রমান্বয়ে সময়ের প্রবাহে হাঁটতে হাঁটতে ইতিহাসকে অনুভব করতে পারেন—এমনভাবেই সাজানো হয়েছে নিদর্শনগুলো। শুরুতে প্রাগৈতিহাসিক যুগ ও সিন্ধু সভ্যতা, এরপর একে একে হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন, গান্ধার, ইসলামী, শিখ, সমকালীন চিত্রকলা, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা, ডাকটিকিট ও পাকিস্তান আন্দোলনের সংগ্রহশালা।
জাদুঘরের সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শনগুলোর একটি হলো গান্ধার যুগের 'ফাস্টিং বুদ্ধ/ফাস্টিং সিদ্ধার্থ'—অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করা এক শিলামূর্তি—যেখানে তপস্যার সময় সিদ্ধার্থের অস্থি-পেশির নিখুঁত মূর্তায়ন দেখানো হয়েছে। এটি গান্ধার শিল্পকলার বিশ্বখ্যাত নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত এবং লাহোর জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ।
হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন কাঠের দরজাগুলো। মোগল ও শিখ আমলের স্থাপত্যকলা আর কাঠশিল্পের দুর্লভ নিদর্শন এগুলো। সূক্ষ্ম খোদাই, জ্যামিতিক নকশা আর ফুলেল অলংকরণে প্রতিটি দরজাই যেন একেকটি শিল্পকর্ম।
এছাড়া রয়েছে পেশোয়ার অঞ্চল থেকে উৎখনিত গ্রেকো-বৌদ্ধ ভাস্কর্য, শিখরির স্তূপ-ড্রামের অংশ, মোগল ও পাহাড়ি (কাংড়া) ধারার ক্ষুদ্রচিত্র, প্রাচীন মুদ্রা, কোরআনের দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি, কাঠখোদাই, বস্ত্র, বাদ্যযন্ত্র ও অস্ত্রশস্ত্র। প্রতিটি গ্যালারি যেন নতুন এক জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টসের মতো লাহোর জাদুঘরের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে কিপলিং পরিবারের নাম। রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের বাবা জন লকউড কিপলিং ছিলেন এই জাদুঘরের প্রথম দিককার কিউরেটর। আর রুডইয়ার্ডের বিখ্যাত কিম উপন্যাসের শুরুতে যে 'দ্য ওয়ান্ডার হাউজ' বা 'আযায়েব ঘর'-এর উল্লেখ আছে, সেটিই আসলে এই লাহোর জাদুঘর।
শালিমার উদ্যান
লাহোরে মোগলদের একটি বিখ্যাত নিদর্শন হলো শালিমার উদ্যান বা শালমার বাগ। চোখ যতদূর যায়, শুধু সারি সারি গাছ, রঙিন ফুল-ফল, জলাশয়, ফোয়ারা আর ঝরনায় ভরপুর বিশাল এই উদ্যান।
পারস্য শৈলীর 'চারবাগ' বা 'স্বর্গ উদ্যান' ধারণা থেকে তৈরি এই বাগান ছিল মূলত মোগল রাজপরিবারের অবকাশযাপন কেন্দ্র এবং কূটনৈতিক অতিথিশালা। তবে এর বড় একটি অংশ সাধারণ মানুষের জন্যও উন্মুক্ত ছিল।
আমাদের ট্যুর গাইড সায়মা (ছদ্মনাম) জানালেন, পার্থিব ইউটোপিয়ার ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ১৬৪১ সালে মোগল সম্রাট শাহজাহান এই উদ্যান নির্মাণের আদেশ দেন। কাজ শেষ হয় ১৬৪২ সালে।
পার্থিব ইউটোপিয়ার স্বর্গ উদ্যান বলতে এমন এক জায়গাকে বোঝায়—যেখানে মানুষ প্রকৃতির সমস্ত উপাদানগুলো নিয়ে একইসঙ্গে সহাবস্থানে থাকতে পারে; স্বর্গ এবং পৃথিবীর মধ্যে যেখানে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। মূলত এমন ধারণাকেই বাস্তবে রূপ দিতে শাহজাহান নির্মাণ করেছেন এ উদ্যান।
চারদিকে প্রাচীরঘেরা আয়তাকার এই বাগান তিনটি সোপানে (টেরেস) বিভক্ত। উপরের স্তর 'বাগ-ই-ফারাহ-বকশ'—অর্থাৎ 'আনন্দদাতা'। মাঝেরটি 'বাগ-ই-ফয়েজ-বকশ'—মানে 'কল্যাণদাতা'। আর সবচেয়ে নিচের স্তর 'বাগ-ই-হায়াত-বকশ'—অর্থাৎ 'জীবনদাতা'। প্রতিটি সোপানের মধ্যে উচ্চতার পার্থক্য প্রায় ৪–৫ মিটার। এই উচ্চতা বিন্যাস শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, জলস্রোতের চলাচলও সহজ করেছে।
উদ্যানের স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়েছে লাল বেলেপাথর, সাদা মার্বেল আর সূক্ষ্ম টেরাকোটা টাইলসে। খোলা প্যাভিলিয়ন, খোদাই করা কলাম, বারান্দা আর ছায়াঘেরা বসার জায়গা উদ্যানটির সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সায়মা জানালেন, এখানে মোট ৪১০টি ফোয়ারা আছে। এরমধ্যে উপরের সোপানে ১০৫টি, মাঝখানে ১৫২টি এবং নিচে ১৫৩টি। তবে আজকের দিনে ঠিক কতগুলো ফোয়ারা সচল আছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা গেল না।
শালিমার উদ্যান শুধু অবকাশযাপনেরই স্থান ছিল না; মোগলরা বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের অভ্যর্থনা জানতেন এখানেই। রাজকীয় অনুষ্ঠানও আয়োজিত হতো। সবুজ বাগান, ফোয়ারা আর প্যাভিলিয়নের সমাহার ছিল মোগলদের শৌখিনতা ও ক্ষমতার প্রতীক।
১৯৮১ সালে ইউনেসকো শালিমার গার্ডেনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। আজও এটি লাহোরের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র এবং মোগল উদ্যানকলার জীবন্ত নিদর্শন।
লাহোর ঘুরতে গেলে এই তিন জায়গা—ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টস, লাহোর জাদুঘর আর শালিমার গার্ডেন—এক দিনেই ঘুরে দেখা সম্ভব। সকাল থেকে শুরু করলে বিকেল পর্যন্ত সময় নিয়ে ভালোভাবেই ঘুরে ফেলা যায়। কারণ জায়গাগুলোর মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়।
লাহোর দুর্গ
লাহোরে মোগলদের আরেকটি শক্তশালী নিদর্শন হলো লাহোর দুর্গ। এই দুর্গের প্রথম ও প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া না গেলেও একে মোগলদের নিদর্শন হিসেবেই ধরা হয়। কারণ দুর্গের বর্তমান রূপ মোগলদেরই দেওয়া।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই দুর্গ স্থানীয়ভাবে 'শাহী কিলা' নামে পরিচিত।
প্রায় ২০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত দুর্গের ভেতরে রয়েছে একের পর এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। মোট ২১টি উল্লেখযোগ্য স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে পাওয়া যায় এখানে। এর মধ্যে আছে ইতিহাসখ্যাত শীশমহল বা আয়না প্রাসাদ, আলমগিরি গেট, নওলাখা প্যাভিলিয়ন, মোতি মসজিদ, দেওয়ান-ই-আম ও দেওয়ান-ই-খাস। সব মিলিয়ে যেন মোগল আমলের সমৃদ্ধির এক জীবন্ত দলিল।
ধারণা করা হয়, ১১শ শতকে সুলতান মাহমুদ গজনভি এখানে প্রথম একটি মাটির দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এটি বারবার ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমান রূপের ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৫৬৬ সালে, এসময় মোগল সম্রাট আকবর দুর্গটিকে আধুনিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াও আকবর এটিকে গড়ে তোলেন প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে। পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেব নিজেদের শাসনামলে এখানে নতুন প্রাসাদ, মসজিদ ও দরবার সংযোজন করে দুর্গটিকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
আমাদের ট্যুর গাইড আহমদ (ছদ্মনাম) জানান, দুর্গে বিশেষত পাঁচটি ফোয়ারা নির্মাণ করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। পার্শ্ববর্তী রাভি নদী থেকে এগুলোতে সরবরাহ করা হতো স্বচ্ছ-বিশুদ্ধ পানি। সেই পানিতে মেশানো হতো গোলাপজল ও সুগন্ধি। ফলে ফোয়ারাগুলো থেকে যখন পানি ছিটানো হতো, তখন দুর্গজুড়ে জলধারার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ত সুগন্ধ, তৈরি হতো মোহনীয় পরিবেশ।
দুর্গের এক স্থাপনা দেখিয়ে আহমদ জানালেন, এটি পার্সিয়ান ও টার্কিশ স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখানে কোনো সিমেন্ট বা কংক্রিট ব্যবহার করা হয়নি। বরং উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে পাট, ঘাস, প্রাণীদেহের শক্ত খোলস, পশুর হাড়ের গুঁড়া, লবণ, মাটি, চুন-সুরকি আর পানি। ঐতিহ্যবাহী ও প্রাকৃতিক উপাদানগুলো দিয়েই দাঁড় করানো হয়েছে এ স্থাপনা।
কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল একটি মন্দির। আহমদ জানালেন, এটি 'নাগ টেম্পল' বা নাগ মন্দির। তিনি বললেন, "তখনকার সময়ে মোগলরা শুধু মুসলিম নয়, হিন্দুসহ ভিন্ন ধর্মের নারীদেরও বিয়ে করতেন। আর বিয়ের পর তারা নিজেদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতাও পেতেন। সেই কারণেই দুর্গের ভেতরে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন মোগলরা।"
তবে দুর্গের ভেতরে মন্দির থাকার ব্যাপারে আরেকটি মতবাদও রয়েছে। সেটি হলো, ১৭৯৯ সালের দিকে শিখ শাসক মহারাজা রণজিৎ সিং শিখ লাহোর দুর্গ দখল নিয়ে নেন এবং সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তিনি দুর্গকে নিজের রাজধানী বানান। অনেকেই মনে করেন দুর্গের ভেতরে নাগ মন্দির তিনিই বানিয়েছিলেন।
এরপর হাঁটতে হাঁটতে এগোলাম লাহোর দুর্গের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শীশমহলের দিকে। প্রবেশপথের ডান পাশে ছিল একটি প্যাভিলিয়ন ও বিশাল খোলা প্রাঙ্গণ। আহমদ বললেন, "এটি হলো 'আট দরওয়া' (আট খিলানওয়ালা হল বা ভবন)। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে নির্মিত মোগলদের পাবলিক ও ভিআইপি কোর্ট এটি। কোনো শাসক অসুস্থ অবস্থায় ভেতরে থাকলে সাধারণ মানুষ হোক বা ভিআইপি অতিথি—সবাইকে এখানেই অপেক্ষা করতে হতো।"
শীশমহলে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল এক অন্য জগতের দৃশ্য। দেওয়ালজুড়ে নানা রঙের পাথর আর ঝলমলে আয়নার কারুকাজ। সাদা মার্বেল, কালো মার্বেল, লাল-নীল-সবুজ রঙের মূল্যবান পাথরের পিয়েত্রা দুরা, আর স্বচ্ছ স্ফটিক আয়নায় তৈরি নকশাগুলোর ওপর আলো পড়লেই ঝলমলিয়ে ওঠে। মুহূর্তেই যেন ডুবে যেতে হয় জাদুময় এক পরিবেশে। আয়নার এই করুকাজকে সেখানকার স্থানীয় ভাষায় বলে 'আয়নাকারি'।
আহমদ জানালেন, শীশমহলের সব আয়না আনা হয়েছে সিরিয়া থেকে। ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ২৪ লাখেরও বেশি ছোট ছোট আয়নার টুকরা। সে সময় মহলের চারপাশে ছিল স্বচ্ছ পানির জলাশয়। রাতের বেলা আলো পড়লে মহলের ভেতরের আয়না আর বাইরের জলাশয়ে তা প্রতিফলিত হয়ে ঝলমলিয়ে উঠত—সৃষ্টি করত এক মোহনীয় পরিবেশ।
শাহজাহানের প্রিয় রানী মমতাজের জন্যই শীশমহল নির্মিত হয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল—এমন একটি প্রাসাদ, যেখানে ঢুকলেই মনে হবে আকাশের তারাদের দেশে পা রেখেছেন। শাহজাহান তার সম্রাজ্ঞীর সেই স্বপ্ন পূরণের উদ্যোগ নিলেন ঠিকই, কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো মমতাজের কখনোই শীশমহলে প্রবেশ করা হয়নি। ১৬৩১ সালে ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। ফলে আয়নার এই স্বর্গীয় প্রাসাদ থেকে তিনি চিরতরে বঞ্চিত হন।
পরবর্তীতে শীশমহল হয়ে ওঠে মোগল নারীদের বিলাসবহুল প্রাসাদ। এখানে বসত রাজকীয় বিনোদন, নৃত্য-সঙ্গীতের আসর। রানীরা এখানে অবসর সময় কাটাতেন, আর উপভোগ করতেন দুর্গের বাগান ও চত্বরের দৃশ্য।
এছাড়া, শীশমহলের ঠিক নিচে বানানো হয়েছিল পরী মহল। এটি ছিল মোগল নারীদের গ্রীষ্মকালীন প্রসাদ (সামার প্যালেস)। এই মহলে চারদিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া ঢোকানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, মহলটির মেঝে ছিল দ্বিস্তরবিশিষ্ট—যেখানে দুইস্তরের মাঝখান দিয়ে রাভি নদীর ঠান্ডা পানি প্রবাহিত হতো। ফলে বাইরে তীব্র রোদ থাকলেও প্রাসাদের ভেতরটা থাকত শীতল ও আরামদায়ক।
সবচেয়ে মুগ্ধকর বিষয় ছিল, মেঝের নিচ দিয়ে যে পানি প্রবাহিত হত, তাতে মেশানো হত গোলাপজল ও সুগন্ধি। এই সুগন্ধিযুক্ত পানি আবার মহলের ভেতরের ৪২টি ঝরনা ও জলপ্রপাতের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হত। ফলে গরমে শীতলতার পাশপাশি মহলের ভেতরের পরিবেশ থাকত সতেজ ও মোহনীয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটির জন্য সেই প্রায় ৪০০ বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল এক জটিল হাইড্রো-ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেম।
আর এই প্রাসাদগুলো পুরুষ দরবার থেকে আলাদা করে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে রাজপরিবারের নারীরা গোপনীয়তা বজায় রেখেও রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারেন।
লাহোর দুর্গের ভেতরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো নওলাখা প্যাভিলিয়ন। এটিও সম্রাট শাহজাহানের আমলে (১৬৩১–৩৩ সালে) এটি নির্মিত হয়। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল সেই সময়ের প্রায় নয় লাখ মোহর (রুপার মুদ্রা)—এই বিপুল ব্যয়ের কারণেই এর নামকরণ করা হয় 'নওলাখা', যার অর্থ নয় লাখ।
সাদা মার্বেলের তৈরি ছোট্ট এই রাজকীয় প্যাভিলিয়নের ছাদটি নৌকার মতো বাঁকানো। ছাদের ধরণটি কাশ্মীরি স্থাপত্যের প্রভাব বলে মনে করা হয়। এটি অনেকটা বাংলা-দোচালা ছাদের মতো। প্যাভিলিয়নের দেওয়ালে মূল্যবান পাথর দিয়ে ফুল ও লতাপাতার নকশা করা। এখানেও তাজমহল ও শীশমহলের মতো পিয়েত্রা দুরা বা ইনলের কাজ করা হয়েছে।
মোগল সভ্যতার সৌন্দর্য ও কারুকার্যের সর্বোচ্চ নিদর্শন হিসেবে ১৯৮১ সালে শালিমার উদ্যানের সঙ্গে লাহোর দুর্গকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ইউনেসকো। আজও লাহোর দুর্গ দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস, রাজকীয়তা আর শিল্পকলার এক অনন্য প্রতীক হয়ে।
বাদশাহী মসজিদ
লাহোর দুর্গের ঠিক সামনেই, আলমগিরি গেটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত বাদশাহী মসজিদ। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম 'মোগল স্থাপত্যের চূড়ান্ত নিদর্শন' নামে পরিচিত এই স্থাপনায়।
মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন শাহজাহানের পুত্র, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। ১৬৭১ সালের মে মাসে শুরু হয় এর নির্মাণকাজ, এবং মাত্র দুই বছরের মাথায়—১৬৭৩ সালের এপ্রিলেই শেষ হয়। পুরো কাজের তত্ত্বাবধান করেছিলেন সম্রাটের পালিত ভাই ও তৎকালীন লাহোর সুবাদার ফিদাই খান কোকা।
সাদা মার্বেলের তিনটি বিশাল গম্বুজ, চারটি প্রধান ও চারটি ছোট মিনার মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই মসজিদ। এর অবয়ব এক নজরেই বোঝায় মোগল সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য ও গৌরব।
ট্যুর গাইড জানালেন, মসজিদের বিস্তৃতি প্রায় ২,৭৬,০০০ বর্গফুট। এর প্রাঙ্গণে একসঙ্গে প্রায় এক লাখ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। শুধু মসজিদের ভেতরেই স্থান পাওয়া যায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, কতটা বিশাল এলাকাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এ মসজিদ প্রাঙ্গণ।
মসজিদের বাইরের অংশ তৈরি হয়েছে লাল বেলেপাথর খোদাই করে, যার ওপর বসানো হয়েছে সাদা মার্বেলের ইনলে। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সূক্ষ্ম ফুলেল নকশা আর কুরআনিক অলংকরণ। প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি শিল্পকর্ম।
গাইড আমাদের জানালেন, লাল বেলেপাথরগুলো আনা হয়েছিল ভারত থেকে—বিশেষ করে ফতেহপুর সিক্রি ও জয়পুর অঞ্চল থেকে। আর সাদা মার্বেল এসেছে রাজপুতানার মাকরানা থেকে, সেই একই মার্বেল যা ব্যবহার হয়েছে আগ্রার তাজমহল, শীশমহলসহ মোগলদের বহু বিখ্যাত স্থাপনায়।
ভেতরে ঢুকে এক আশ্চর্য বিষয় টের পেলাম। মসজিদের কোণায় দাঁড়িয়ে কেউ স্বাভাবিক স্বরে কথা বললেও মনে হচ্ছিল সেই আওয়াজ পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রশ্ন করতেই গাইড ব্যাখ্যা করলেন—বাদশাহী মসজিদে কোনোদিনই মাইক ছিল না, আজও নেই। অথচ ইমামের কণ্ঠ সহজেই পৌঁছে যায় পুরো প্রাঙ্গণে। এর রহস্য ধ্বনিবিদ্যার অসাধারণ প্রয়োগে। স্থপতিরা এমনভাবে মসজিদের গম্বুজ, খিলান ও দেওয়ালের নকশা করেছেন যে স্বাভাবিক শব্দও প্রতিধ্বনিত হয়ে বহুগুণে বেড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
"নামাজঘরের দেওয়াল ও গম্বুজগুলো বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে যেন শব্দ প্রতিফলিত হয়ে সমানভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মসজিদের তিনটি বিশাল মার্বেল গম্বুজ শব্দকে বাড়িয়ে পুরো প্রাঙ্গণে পৌঁছে দেয়। ফলে প্রার্থনাকক্ষের ভেতরে কেউ কোণায় দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক স্বরে কথা বললেও প্রতিধ্বনি এমনভাবে প্রতিফলিত হয় যে তা দূরের লোকদের কাছেও স্পষ্ট শোনা যায়," বললেন গাইড।
এছাড়া, লাল বেলেপাথর ও মার্বেল উভয়ই মসৃণ এবং শক্ত উপাদান হওয়ায় তা শব্দ প্রতিফলনের ক্ষমতা বাড়ায় বলেও জানালেন তিনি।
আর সেই ৪০০ বছর আগে নিশ্চয়ই লাহোরের রাস্তাঘাট আজকের মতো এমন কোলাহলপূর্ণ ছিল না। ফলে মাইক ছাড়া মসজিদের আজানের ধ্বনি সহজেই যে পুরো এলাকায় শোনা যেত তা অনুমেয়।
বাদশাহী মসজিদের স্থাপত্য নকশা, উপকরণের নিখুঁত ব্যবহার এবং ধ্বনিবিদ্যার প্রয়োগ সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতো। এটি শুধু মসজিদই নয়, বরং মোগল স্থাপত্য ও প্রকৌশল নৈপুণ্যের এক অনন্য নিদর্শন।
ইতিহাস ও স্থাপত্যের এই মহৎ সৃষ্টি বর্তমানে ইউনেস্কোর 'টেন্টেটিভ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' (সম্ভাব্য বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
কবি মুহাম্মদ ইকবালের মাজার
বাদশাহী মসজিদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাতনামা দার্শনিক, কবি ও রাজনীতিবিদ আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের মাজার। সমগ্র উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় কবি। তাকে 'শাইরে-মাশরিক' বলা হয়, যার অর্থাৎ 'প্রাচ্যের কবি'।
১৯৩০ সালে আল্লাহাবাদে দেওয়া এক ঐতিহাসিক বক্তৃতায় তিনি প্রথমবারের মতো উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরেন। সেই ভাবনাই পরে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হয়ে ওঠে।
১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল লাহোরে মৃত্যু হয় কবি ইকবালের। তার ইচ্ছানুযায়ী বাদশাহী মসজিদের ঠিক পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। এ সমাধিসৌধই আজ পরিচিত 'মাজার-এ-ইকবাল' নামে।
মাজারের স্থাপত্যে মোগল নির্মাণশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। পুরো সমাধিসৌধ নির্মিত হয়েছে লাল বেলেপাথর আর সাদা মার্বেল দিয়ে। কাঠামোতে ধরা পড়ে ঐতিহ্য আর মর্যাদার ছাপ।
ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে সমাধিসৌধে ফার্সিতে লেখা কিছু লাইন। ইকবালের নিজের কবিতা থেকেই নেওয়া হয়েছে এসব পঙক্তি। পাথরে খোদাই করা সেই কবিতার লাইনগুলো যেন মৃত্যুর পরও কবিকে জীবন্ত করে রেখেছে।
মাজারের চারপাশ ঘিরে আছে ছোট একটি বাগান। সবুজ ঘাস, নানা রঙের ফুলের গাছপালাঘেরা পরিবেশ মাজারটিকে দিয়েছে শান্ত, গম্ভীর এক আবহ। এই বাগানের ভেতর দিয়েই সমাধিস্থলের মূল প্রবেশপথ।
লাহোর ভ্রমণে গেলে পরের তিনটি জায়গা—লাহোর দুর্গ, বাদশাহী মসজিদ ও কবি ইকবালের মাজার—ঘুরে দেখা সম্ভব একদিনেই। অর্থাৎ কেবল দুই দিনে লাহোরের এই জায়গাগুলো খুব ভালোভাবে ঘুরে দেখতে পারবেন। আর সন্ধ্যার পরের সময়টুকু দিতে পারবেন কেনাকাটায়।
আমরা গিয়েছিলাম লাহোরের লিবার্টি মার্কেট ও আনারকলি বাজারে। লিবার্টি মার্কেটে তুলনামূলক দেশীয় নামকরা ব্র্যান্ডেড দোকান থেকে কেনাকাটা করতে পারবেন। আর আনারকলি বাজার হলো অনেকটা আমাদের নিউমার্কেটের মতো লোকাল বাজার। এখানে দামদর করে জিনিস কেনার সুযোগ রয়েছে।
লাহোর ভ্রমণের এই দিনগুলো ছিল যথেষ্ট রোমাঞ্চকর। পুরনো স্থাপনাগুলোয় গিয়ে মনে হলো যেন, ইতিহাসের ভেতর দিয়েই হেঁটে যাচ্ছি। মোগলদের আভিজাত্যে ভরা শালিমার উদ্যান, শীশমহল, বাদশাহী মসজিদের শাণ-সৌন্দর্য স্মৃতিতে থাকবে বহুদিন।
লাহোরে ঢুকেই যে প্রবাদটি শুনেছিলাম, 'যে লাহোর দেখেনি, সে যেন জন্মই নেয়নি'— ফিরে আসার সময় তা বলার কারণ কিছুটা হলেও উপলব্ধি হলো। লাহোর সত্যিই দেখার মতো, জানার মতো, আর সবচেয়ে বড় কথা—মনে গেঁথে রাখার মতো এক শহর।
ছবি: জান্নাতুল তাজরী তৃষা/দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড